নূরজাহান হাসল। আইজ দিছে। না দিলে তগো বাইত্তে আইলাম কেমতে?
হ হেইডা তো ঠিকই।
তয় তরা যাচ কই?
মাদরাসায় যাই।
নূরজাহান অবাক। মাদরাসায়?
হ।
কোন মাদরাসায়?
আমগো গেরামে কয়ডা মাদরাসা? একটাঐ। আমিন মুনশির মাদরাসা।
নাদের একটা ধাক্কা দিল হামেদরে। খালি আমিন মুনশি কচ ক্যা হামেদ? ক, আমিন মুনশি সাবের মাদরাসা।
হ আমিন মুনশি সাবের মাদরাসা।
নূরজাহান বলল, তরা অহন মাদরাসায় পড়চনি?
হ।
কবে থিকা?
বাইষ্যাকালের আগে থিকাঐ।
নাদের তাড়া দিল হামেদরে। এত প্যাচাইল পারিচ না হামেদ। তাড়াতাড়ি উট। আইজ কইলাম বাইত থনে বাইর অইতে দেরি অইয়া গেছে।
হামেদ আর কথা বলল না, লাফ দিয়া নৌকায় উঠল। আগার চারটে বইসা রেহাল যত্ন কইরা রাখল নাওয়ের পাটাতনে তারপর ছোট বইঠা হাতে নিল। পাছার চারট থেকে সোজা পুবমুখী নৌকা চালালো নাদের, আগার চারটে বইসা সামনের দিকে বইঠা বাইতে লাগল হামেদ। দুই ভাইয়ের বইঠার টানে ডিঙ্গি নৌকা তরতর কইরা আমিন মুনশির মাদরাসার দিকে আগাতে লাগল।
নূরজাহান তখনও বাড়ির ঘাটে দাঁড়ায়া আছে। দৃশ্যটা তার বিশ্বাসই হইতাছে না। নাদের হামেদ পড়তে যায় মাদরাসায়! কয় কী! এই বাড়ির মানুষ এমুন বদলাইয়া গেছে কবে?
উঠান পার হইয়া জামতলায় দাঁড়ানো পরির পিছনে আইসা দাঁড়াইল নূরজাহান। মাত্র ডাক দিবে পরিকে, নূরজাহানের পায়ের শব্দে তার দিকে মুখ ফিরাল পরি। নূরজাহানকে দেখে অতিকায় অবাক হল। আনন্দে ফেটে পড়া গলায় বলল, নূরজাহান ফুপু, তুমি আইলা কুনসুম? কার লগে আইলা?
নূরজাহান রহস্যের গলায় বলল, কেঐর লগে আহি নাই।
তয়?
তয় আবার কী? একলাঐ আইছি।
যাহ্।
হ। বিশ্বাস না অইলে ওই যে দেক আমতলায় আমগো কোষানাও।
তুমি একলা একলা বাইত থিকা নাও বাইয়া আইছো?
হ।
যাহ্।
সত্যঐ।
গাছিদাদায় আর দাদি তোমারে একলা একলা বাইর অইতে দিল?
নূরজাহান আবার সেই রহস্যের হাসিটা হাসল। হ দিল। আর কতদিন বাইত্তে আটকাইয়া রাখবো, ক।
তারপরও নূরজাহানের কথা বিশ্বাস করল না পরি। হাসল। না, তুমি আমার লগে মিছাকথা কইতাছো। গাছিদাদায় মনে হয় এই মিহি কোনও বাইত্তে আইছে, তার লগে তুমিও আইছো। গাছিদাদায় গেছে কোনও বাইত্তে আর তুমি আইছো আমগো বাইত্তে।
পরির বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হল নূরজাহান। তুই বহুত চালাক রে পরি। একদম ঠিক কথাডা কইছস। আমি বাবার লগেই আইছি। বাবায় গেছে মেন্দাবাড়ি, আমি হাজামবাড়ি ঘুইরা তগো বাইত্তে আইলাম।
তারপরই যেন পরিকে খেয়াল করে দেখল নূরজাহান। নাদের হামেদের মতন পরিও অনেক বদলাইয়া গেছে। লম্বা কামিজ আর সেলোয়ার পরছে। বুক এখনও ভাল কইরা ওঠে নাই, তাও ওড়না পরছে। কীরকম একটা পরহেজগার পরহেজগার ভাব। এই বাড়িটা এমুন হইয়া গেছে কবে? গাওয়াল দাদায় কই জানি গেছিল গা। অনেকদিন বাদে ফিরত আইয়া বাড়িঘর আর সংসারের মানুষজন বদলাইয়া ফালাইছে। নাদের-হামেদ মাদরাসায় পড়ে, পরির ভাব অন্যরকম, বাড়িতে কোনও চিল্লাচিল্লি নাই। বানেছা আম্মায় চুপচাপ রানঘরে বইয়া রানতাছে। গাওয়াল দাদায় কো? হেয় কি গাওয়ালি ছাইড়া দিছেনি?
এইসব কথা কীভাবে জানবে নূরজাহান?
তারপরই আর একটা কথা মনে হল নূরজাহানের। সে নাইলে বাইত থিকা বাইর অয় নাই আইজ সাত-আষ্ট মাস, বাবায় তো বাইর অইছে। তার লগে তো গাওয়াল দাদার দেহা। অইছে। গাওয়াল দাদার বাড়িঘর সংসার মানুষজন বেবাক যে বদলাইয়া গেছে এইডা কি বাবায় জানে না? জানলে নূরজাহানরে কয় নাই ক্যা?
নাকি নূরজাহানের মতন দবিরও জানে না গাওয়ালবাড়ির খবর?
পরির দিকে তাকায়া এইসব কথা ভাবছে নূরজাহান, পরির কোলে জরি ঘ্যানঘ্যানা গলায় বলল, মা’র কাছে যামু বুজি। আমারে মা’র কাছে দিয়াহো।
পরি বলল, মায় রানতাছে। অহন মার কাছে যাইতে পারবি না।
তয় তুমি আমারে নামায় দেও। আমি রান্দনবাড়ন খেলুম।
আইচ্ছা যা খেল গা। তয় পানিপুনির মিহি (পানিটানির দিকে) যাইতে পারবি না। উডানে বইয়া খেলবি। আমার চোকের সামনে।
আইচ্ছা।
পরির কোল থেকে নাইমা বড়ঘরে গিয়া ঢুকল জরি। নিজের মাটির টোফাটাফি নিয়া ঘরের ছেমায় বসে চুপচাপ খেলতে লাগল। এই ফাঁকে কী কাজে একবার বড়ঘরে আসল বানেছা। নূরজাহানকে দেখে হাসল। নরম শান্তগলায় বলল, কী লো নূরজাহান, তুই আইলি কুনসুম? কার লগে আইলি?
বলল নূরজাহান।
শুনে বানেছা বলল, বহুতদিন বাদে তরে দেকলাম। তুই অনেক ডাঙ্গর অইয়া গেছস। তয় অহন ইট্টু সাইমজা সুইমজা (বুঝেশুনে) চলিস বইন। নমজ পরিছ, আল্লাহ খোদার নাম লইছ।
নূরজাহান কথা বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল কইরা বানেছার মুখের দিকে তাকায়া রইল। মনে মনে বলল, ভাবিছাবে কয় কী! খাড়েদজ্জাল বইলা দেশগেরামে যে পরিচিত সে এমুন মুলাম কইরা কথা কয়! নমজ পড়তে কয়, আল্লাহ খোদার নাম লইতে কয়! কবে কেমতে এমুন বদলান বদলাইছে ভাবিছাবে! ছনুফুবুরে একওক্ত খাইতে দেয় নাই, দুর দুর কইরা বাড়িত থিকা বাইর কইরা দিত, মুখে যা আসে তাই কইয়া বকাবাজি করতো, মাইর। ধইরও দিত, হেই বানেছা এমুন অইয়া গেছে কেমতে, আঁ!
বড়ঘরের কাজ সাইরা রান্নঘরের দিকে যাইতে যাইতে বানেছা বলল, এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আইছস, দুফইরা ভাত খাইয়া যাইচ। তর গাওয়াল দাদায়ও বাইত্তে আছে। আমরা বেবাকতে একলগে বইয়া খামুনে। ইলশামাছ রানছি। অহন কিছু খাবি? উরুম (মুড়ি) দিমু?
