দবির আমতা গলায় বলল, রাবিরে কইতে ভাল্লাগে না বুজি। রাবি আমারে দেকলেই জানি কেমুন করে!
হ হেইডা আমি দেকতাছি। রাবি অইলো মান্নান মাওলানার বিরাট ভক্ত। তর মাইয়ায় ওই কামডা করনের পর থিকা তরে আর তর মাইয়ারে দেকতে পারে না রাবি। ছেমড়ির সবাবই এমুন। একবার কেঐর উপরে চেতলে সহজে ঠান্ডা অয় না। মোতালেইব্বার উপরে বাদলার লেইগা চেতছিল, বাদলার লগে মোতালেইব্বার ঠিকঐ খাতির অইছে, ছেমড়া হারাদিন আছে মোতালেইব্বার পিছে পিছে, রাবি মোতালেইব্বারে দেকতে পারে না। এনামুল অরে মজজিদ বাড়ির মাডি উড়ানের কাম দিছে এইডাও রাবি পছন্দ করে নাই। ছেমড়িডা কেমুন জানি। দেকতাছস না, মতলা ডাক পাড়তাছে আর ও কেমুন করতাছে। জামাইরে বইক্কা আন্দার করতাছে।
হ। এই ডরেঐত্তো উক্কা তামুক চাইতে পারতাছি না।
খাড়া আমি ব্যবস্থা করতাছি।
দেলোয়ারা গম্ভীর গলায় ডাকলেন, রাবি।
রাবি লগে লগে জব দিল। কন বুজি।
এই মিহি আয়।
আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বাইর হইয়া আসল রাবি। চুলার পারে বইসা আছিল দেইখা মুখে গলায় চিকচিক করছে ঘাম। থমথমা মুখে দুনিয়ার বিরক্তি। একবার দবিরের দিকে তাকায়া দেলোয়ারাকে বলল, কীর লেইগা ডাক পাড়েন?
দেলোয়ারা শীতল গলায় বললেন, তর কথাবার্তায় আমি বহুত বিরক্ত হইতাছি।
ক্যা কী করছি আমি?
গলা একটু চইড়া গেছিল রাবির। দেলোয়ারা গম্ভীর মুখে রাবির চোখের দিকে তাকালেন। গলা নিচা কইরা কথা ক।
রাবি থতমত খেল। জে।
দবির এই বাইত্তে আহনের পর থিকা আমি কইলাম তর বেক কিছু খ্যাল করছি। তুই আমার চের আইন্না দেচ নাই, চা বানাইতে কইছি হের লেইগা নানান পদের তাল করছস। মতলা ডাক পাড়ে তুই ত্যাজ দেহাইয়া বকাবাজ্জি করলি, আমি কইলাম বেক কিছু বুজতাছি। তুই জানচ আমি বহুত নরম মানুষ। তয় চেতলে খবর আছে। তর পোলার লেইগা মোতালেইব্বারে কেমুন বকা বকছিলাম হেইডা কইলাম ভুইল্লা যাই না। আমারে চেতাইস না। গেরামের বেবাক মানুষ আমগো কাছে আহে। আমরা মানুষ পছন্দ করি দেইক্কা আহে। দবির আমগো বহুত পুরানা মানুষ। তুই তো হেদিন আইছস আমগো বাইত্তে, দবিররা আহে ছোডকাল থিকা। নূরজাহানের লগে মাওলানা সাবের কী অইছে না অইছে ওইডা আমরা বুজুম, ওইডা কইলাম তর বোজনের ব্যাপার না। আইজ আমি তরে খুবই নরম কইরা এই হগল কথা কইলাম। আর য্যান কোনওদিন কইতে না অয়। ত্যাজ দেহাবি, বাইত থিকা বাইর কইরা দিমু। দেশগেরামে চউরাগো আকাল নাই। অহন কইলে বিয়ালের মইদ্যে বউ পোলাপান লইয়া অন্য চউরা আইবো আমগো বাইত্তে।
দেলরা বুজি ওইভাবে কথা বলবেন এতটা আশা করে নাই রাবি। সে একদম নিভা গেল। যেন নাড়ার আগুনে আথকা ঠিলা ভরা পানি ঢাইলা দিছে কেঐ। রাবি একটা ঢোক গিলল। কোনওরকমে বলল, আমি, আমি কী করছি বুজি? আপনে খালি খালি আমারে বকতাছেন।
দেলোয়ারা আগের মতনই গম্ভীর গলায় বললেন, আমারে দিয়া আর প্যাচাইল পারাইচ। দুইন্নাহিদারি তর থিকা আমি কম বুজি না। যা কইলাম হেইডা করবি। অহন যা দবিরের লেইগা তামুক সাজাইয়া আন। আর দবির আইজ দোফরে আমগো বাইত্তে ভাত খাইবো ব্যবস্থা কর। যা।
এমন ভয় অনেকদিন পায় নাই রাবি, সে প্রায় দৌড়াইয়া চইলা গেল। আর দবির কোনওরকমে বলল, ভাত খাওনের কাম নাই বুজি। আপনে খালি আমার মাইয়াডারে রক্ষা করেন। আমার মাইয়াডারে দয়া করেন।
তুই চুপচাপ বয়। তামুক খা। আমি কথাবার্তা কই। দেহি কী করন যায়।
বিশাল এক আশায় দবিরের তখন বুক ভরে গেছে। আল্লাহ আল্লাহ! আল্লাহয় রহম করতাছে। দেলরা বুজিরের দিয়া আল্লায়ই নূরজাহানরে ওই জালেমের হাত থিকা বাঁচাইবো।
চারদিককার মেঘলা দিন তখন যেন একটুখানি আলোকিত হয়েছে।
.
গাওয়াল বাড়িতে ঢুকে নূরজাহানের মনে হল, এইটা সেই বাড়ি না। এইটা য্যান অন্য বাড়ি। আজিজ গাওয়ালের বাড়ি মনে কইরা সে বুঝি অন্য কোনও বাড়িতে ঢুইকা গেছে। যেই বাড়ি এলাগেন্দা পোলাপানের চিল্লাচিল্লিতে ভরা আছিলো সেই বাড়িতে কোনও আওয়াজই নাই। হামেদ যে আথকা আথকা গলা ছাইড়া গান গাইয়া উঠতো, আব্বাসউদ্দিনের গান, আবদুল আলিমের গান, খালেক দেওয়ান মালেক দেওয়ানের গান, কই গেল সেইসব গান! হামেদের গলার একটা গান বহুত ভাল লাগত নূরজাহানের। আব্বাসউদ্দিনের গান।
আমায় এত রাইতে ক্যানে ডাক দিলি
প্রাণ কোকিলারে!
কই গেছে সেইসব গান! এতডি পোলাপান থাকনের পরও বাড়ি এমুন নিটাল অইয়া রইছে ক্যা?
হাজামবাড়ি থেকে বাইর হইয়া, হাজামবাড়ি আর গাওয়ালবাড়ির মাঝখানকার পুকুর পাড়ি দিয়া বাড়ির পুবদিক দিয়া গাওয়াল বাড়িতে উঠছে নূরজাহান। এই দিকটায় হাতের বাঁয়ে এনামুলদের ছাড়া বাড়ির জোড়া হিজলগাছ। তারপর গাওয়াল বাড়ির বেঁকা আমগাছটা। ওই আমগাছের লগে কোষা ভিড়াইছে নূরজাহান। তখনও বাড়ির কারও কোনও আওয়াজ নাই। পুরা বাড়ি নিটাল। নূরজাহানের প্রথমে মনে হইছে বাড়িতে বুঝি লোকজনই নাই। আত্মীয় বাড়ি বেড়াইতে গেছে। ভাইবা মনটা একটু খারাপও হইছে। আহা এতদিন পর বাড়িত থিকা বাইর হইছে, এত উৎসাহ নিয়া এই বাড়ি ওই বাড়ি যাইবো, বেবাকতের লগে দেখা সাক্ষাৎ করবো, গাওয়াল বাড়িতে আইসা সেই আশাটা পূরণ হইলো না।
উঠানের দিকে আসতে আসতে সেই চিন্তা বদলাইয়া গেল। আরে, বাড়িতে তো দেখি বেবাকতেই আছে। ওই যে বানেছা আম্মায় রান্ধনঘরে রানতে বইছে, ছোট বইনটারে কোলে লইয়া বাড়ির পশ্চিম দিককার জামগাছতলায় দাঁড়াইয়া রইছে পরি। নাদের আর হামেদ বড়ঘর থেকে মাত্র বাইর হইল, দুইজনেরই পরনে লুঙ্গি আর লম্বা সাদা পাঞ্জাবি। মাথায় সাদা গোল টুপি। দুই ভাইয়ের বুকের কাছে ধরা রেহালের কায়দা সিপারা (আরবি বর্ণমালার বই)। বাড়ির ঘাটে বান্দা ডিঙ্গি নৌকার দিকে যাচ্ছে দুই ভাই, নূরজাহানকে দেখে যতটা অবাক হওয়ার কথা ততটা অবাক তারা হল না। নাদের কোনও কথাই বলল না, নৌকায় উইঠা বইঠা নিয়া বসল পাছার চারটে। হামেদ নৌকায় চড়তে চড়তে হাসিমুখে বলল, এতদিন বাদে কই থিকা আইলা নূরজাহান ফুবু? তোমারে বলে বাইত থনে বাইর অইতে দেয় না?
