কয়েক পলক দৃশ্যটা দেখল নূরজাহান, দেখে বুকটা মোচড় দিয়া উঠল তার। আহা রে, আল্লায় যে ক্যান মাইষেরে পাগল বানাইয়া দুইন্নাইতে পাঠায়!
.
চশমার ভিতর দেলোয়ারার চোখ দেখা যাচ্ছে গোরুর চোখের মতন।
সেই চোখে পলক পড়ছে না, একটুও কাঁপছে না চোখ। মুখটা একটুখানি হা হয়েছে। তিনি তাকিয়ে আছেন দবিরের দিকে। হাতে চায়ের কাপ। দবিরের হাতেও চায়ের কাপ। দবির তার কাপে কয়েকটা চুমুক দিয়েছে। দেলোয়ারাও দিয়েছেন, তবে দবিরের চেয়ে কম। তিনি চা খান খুবই ধীর ভঙ্গিতে।
দবির কথা শুরু করেছিল একটু আগ থেকে। ল্যাংড়া বসির কেমন করে তার বাড়িতে এল, কেমন করে তাকে নিয়া গেল মাওয়ার বাজারে তারপর রসগোল্লা চা সিগ্রেট খাওয়াল, নানারকম কথার প্যাঁচ খেলাতে খেলাতে নূরজাহানের জন্য বিয়ার পাত্রের কথা বলল। পাত্রের নাম শুনে দবির যেমন কাইপা উঠছিল দেলরা বুজিও প্রায় তেমন করেই কাপলেন। হাতে চায়ের কাপ না থাকলে অভ্যাস মতন চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতেন। হাতে চায়ের কাপ থাকায়, হাতের কাছে কাপ নামিয়ে রাখার জায়গা না থাকায় কাজটা তিনি। করতে পারলেন না। স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
দবির তখন চক সাঁতরাইয়া কেমন কইরা বাড়িতে ফিরছে সেই কথা বলছিল।
রাবি আর এই দিকটায় আসে নাই। রানঘরে বইসাই বাদলার ধরা শিংমাছ কুটছে, ঘরের কোনায় রাখা থানইটার উপর রাইখা কোটা মাছ ঘষছে। চুলার ভাতে বলক আসছে, শো শো একখান আওয়াজ হচ্ছিল। মশলা আগেই বাটা হয়ে গেছে। পিয়াজ বাটা, কাঁচা মরিচ বাটা এইসব কাজও শেষ। এখন অন্য চুলায় তরকারি চড়াবে। তেলের বোতলও হাতের কাছেই।
এইসব কাজের ফাঁকে দুই-একবার ঘর থেকে বের হয় রাবি। আইজ হয় নাই দবিরের জন্য। মান্নান মাওলানার লগে ওই কারবারটা করার পর নূরজাহান দবির এদেরকে দুই চোক্ষে দেখতে পারে না সে। দেলরা বুজির কথায় দবিরের জন্যও চা বানাইতে হইছে, এই রাগে মুখ থমথমা হইয়া আছে তার। রান্ধনঘর থেকে আর বাইরই হয় নাই। রান্ধনঘরের ওটায় বসে অনেকক্ষণ ধইরা পোকাশিংয়ের কাতা খাওয়া জায়গায় বিষকাটালির ডাটা ছাট ছাট কইরা পিটাইছে। তাতে বেদনা কমছে কি কমে নাই কে কইবো। বাদলা চলে গেছে মোতালেবদের সীমানায়। সেখানে গিয়া কবুতর দেখতাছে।
বাদলা চলে যাওয়ার পর দেলরা বুজির চেয়ারের সামনে, ফিরিতে বইসা চায়ে চুমুক দিয়া কথা শুরু করার আগে একবার বাদলার ফেলে যাওয়া বিষকাটালির দিকে তাকায়া ভিতরে ভিতরে একটু ধাক্কা মতন খাইছে দবির। আরে, এইডি তো বিষকাডালি না! বিষকাডালির মতন দেখতে অন্য একপদের আগাছা। হেইডাঐত্তো কই, এই দিনে গিরস্তবাড়ির নামায় বিষকাডালি আইবো কই থিকা। বিষকাডালি হয় বাইষ্যাকাল শেষ অওনের পর, যহন চকমাঠ থিকা পানি নাইম্মা যায়। খাল পুকইর পার জাইগা ওঠে, তখন ভিজা নরম মাডিতে নানান পদের আগাছা কুগাছার লগে বিষকাডালি জন্মায়। অন্য সময় বিষকাডালি বিচড়াইয়া পাওন মুশকিল। বাইষ্যাকালে তো বিরাট মুশকিল।
তয় দবির ক্যান বিষকাড়ালির কথা কইছিল বাদলারে? রাবিরে খুশি করার লেইগা। রাবিরে খুশি করনের কাম কী দবিরের? রাবি হইল দেলরা বুজির বাড়িতে থাকে। কামের বেটি। অরে এত খাতির কীর লেইগা করতে হইব?
আসলে দবির চায় দেশগ্রামের বেবাক মানুষ তারে আর নূরজাহানরে ভাল জানুক। হুজুরের লগে নূরজাহান যে অন্যায় করছে সেইটা পোলাপানের নাদানি মনে করুক বেবাকতে! রাবি হইল হুজুরের বিরাট ভক্ত। রাবিও যদি নূরজাহানের কারবারটারে নাদানি মনে করে সেইটাও দবিরের এক রকম শান্তি!
তয় বাদলার কারবারটা আজব। কোন আগাছা কুগাছা দিয়া পোকাশিংয়ের কাতা খাওয়া জায়গা ছাটাছাট পিটাইয়া ব্যথা বেদনা দূর কইরা অহন কইতর দেখতে গেছে মোতালেবগো সীমানায়!
নিমতলা থেকে বড়ঘরের বারান্দা অনেকখানি দূর। সেখানে চৌকিতে কাঁথা মুড়া দিয়া পইড়া আছে মতলা। দবিরের কথা শুইনা দেলরা বুজি যখন মাটির মতন থির হইয়া আছেন তখন মতলার গলা শোনা গেল। বাদলার মা, ও বাদলার মা। এই মিহি ইট্টু আহো! আমার জ্বরডা ইট্টু দেইক্কা দে। মনে অয় বেদম জ্বর আইছে।
রাবি রান্নঘর থেকে চিৎকার করে বলল, আমি অহন আইতে পারুম না। আমার কাম আছে।
মতলা নিয়ারার (অনুনয়ের) গলায় বলল, ইট্টু আহো। ইট্টু জ্বরডা দেহো আমার।
রাবি আগের মতনই তেজি গলায় বলল, কইলাম যে পারুম না। তর ওই ঘোড়ার আন্ডার জ্বর দেহনের কিছু নাই। গোলামের পোয় আমার জানডা খাইয়া হালাইলো।
এবার চায়ে চুমুক দিলেন দেলোয়ারা। পর পর দুই তিন চুমুকে চা শেষ করে কাপটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে গেলেন, হাত বাড়িয়ে দবির কাপটা নিল। আমারে দেন বুজি। আমি রানঘরে দিয়াহি।
দেলোয়ারা কথা বললেন না, চিন্তিত ভঙ্গিতে কাপটা দবিরের হাতে দিলেন। চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে লাগলেন। দবির তার আর দেলরা বুজির কাপ নিয়া রানঘরের দিকে চলে গেল। যেরকম দৌড় দিয়া গেল তেমন দৌড় দিয়াই ফিরত আসল। আইসা দেখে দেলরা বুজি আগের মতনই চিন্তিত চোখে চশমার কাঁচ মুচছেন। দবির এক পলক দেলরা বুজিকে দেখে বলল, আমি ইট্টু হাফেজ দাদার ঘর থিকা আহি বুজি।
চোখে চশমা পরে দেলরা বললেন, ক্যা?
তামুক খামু।
তামুকের লেইগা ওই ঘরে যাবি ক্যা? মতলারঐত্তো উক্কা তামুক আছে। রাবিরে ক, দিবো নে।
