আবদুলের পোলাপানদের দেখে এইটারে প্যাচাইয়া ধরে নূরজাহান, ওইটারে প্যাচাইয়া ধরে। শরীরে কাদা মাটি লেগে থাকা আসুরাকে একটু কোলে নিল। আবদুল তাকায়া তাকায়া নূরজাহানরে দেখছে। যেন কতদিন পর মেয়েটাকে সে দেখছে। যেন কতদিন খাঁচায় আটকে থাকা মেয়েটি খাঁচার দরজা খোলা পাইয়া আইজ ফুড়ুত কইরা উড়াল দিয়া আসছে নিজের দুনিয়ায়। একদিকে সংসার চালাবার দুশ্চিন্তা কাইটা যাওয়া, ঘরের বউ দিছে এতগুলি টাকা, আইজ থিকা শুরু করবো দান বাওয়ার কাম, নতুন স্বপ্ন যখন চোখে মাত্র লাগছে তখনই বিরাট এক আনন্দ নিয়া যেন আসলো নূরজাহান। আবদুলের মনটা খুবই ভাল হয়ে গেল। বলল, তুই একলা একলা নাও বাইয়া কেমতে আইলি বইন?
ছটফটা গলায় ঘটনা বলল নূরজাহান। এই বাড়ি থেকে গাওয়াল বাড়ি যাবে, সেই বাড়ি থেকে যাবে মিয়াবাড়ি। সবার লগে দেখা করে যাবে মেন্দাবাড়ি। সেই বাড়ি থেকে বাবারে লইয়া যাইবো নিজেগো বাইত্তে।
খুশি আনন্দে ফেটে পড়া গলায় নূরজাহান যখন কথা বলছিল, এত সুন্দর লাগছিল মেয়েটাকে। যেন শ্রাবণ মাসের মেঘলা সকালবেলাটা হঠাৎ করেই রোদে ভরে গেছে। টাকা হাতে নিয়া ঘরে ঢুকল সে। পিরনের জেবে টাকা ভরে, সেই পিরন কান্দে ফালাইয়া ঘর থিকা বাইর হইল। মাজায় বানলো গামছা। আলালদ্দিকে বলল, ল বাজান। আমার লগে বাজারে ল। কাম আছে। একলা এত কাম আমি পারুম না।
বাজারে যাওয়ার কথা শুইনা আলালদ্দি বেদম খুশি। বাজারে গেলেই দুই-চাইর আনার লেবেনচুষ (লজেন্স) বিসকুট এইসব কিন্না দেয় বাবায়। ওইসব জিনিস খাইতে যে কী মজা! বাড়িতে আইসা ভাইবইনের কাছে গল্প করে। সেই গল্প শুইনা বারেক আর আসুরা বড়ভাইয়ের সৌভাগ্যে ভিতরে ভিতরে হিংসায় জ্বলে। আসুরা এতকিছু বোঝে না, বারেক কিছুটা বোঝে। সে একটু বড় হয়েছে। আজ বাবার মনমেজাজ ভাল দেখে তার একটা হাত ধরল বারেক। ঘ্যানঘ্যানা গলায় বলল, ও বাবা, আমিও বাজারে যামু। তুমি খালি দাদারে বাজারে লইয়া যাও। আইজ আমিও যামু।
আবদুল কিছুই ভাবল না। সরল গলায় বলল, আইচ্ছা ল।
শুনে এমন একটা লাফ দিল বারেক। যেন আজকের আগে এত খুশি জীবনে কোনওদিন সে হয় নাই। দুই ভাইয়ের আনন্দ দেখে আসুরাও তখন ঘ্যানঘ্যান করছে। বাবা, ও বাবা বাজারে যামু।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আবদুল বলল, মাইয়ারা বাজারে যায় না মা।
ক্যা যায় না, বাবা?
হেইডা তুমি ডাঙ্গর অইলে বুজবা।
আমি কবে ডাঙ্গর অমু?
আর বেশিদিন না মা। এইত্তো দুই-চাইর বচ্ছর পরই অইয়া যাইবা।
তয় আমার লেইগা আইজ লেবেনচুষ আর বিসকুট লইয়াইয়ো বাবা।
আইচ্ছা মা, আনুম নে।
দুই পোলা নিয়া নৌকায় উঠতে উঠতে মাজেদাকে আবদুল বলল, এতদিন বাদে নূরজাহান বইনে আইছে আমগো বাইত্তে, আলালদ্দির মা, আমার বইনরে ভাল কইরা খাতিনদারি (আপ্যায়ন) করো। মুড়ি মিডাই দেও অরে, খাউক।
আবদুলের নৌকা সড়কপার ধরে মাওয়ার দিকে যায়, একবার সেই দিকে তাকিয়ে নূরজাহান ছটফটা গলায় বলল, তছি বুজি কো? অরে দিহি দেহি না? ফুবু আম্মায় কো? তারা কেঐ বাইত্তে নাই?
টিনের থালে একথাল মুড়ি আর একটুকরা খাজুরা মিঠাই এনে নূরজাহানের হাতে দিল মাজেদা। নে খা।
অহন আবার কী খামু? বাইত থনে খাইয়াঐত্তো বাইর অইছি।
তাও খা। তর দাদায় কইয়া গেল খাতিনদারি করতো। আমি তরে খাতিনদারি করলাম।
একমুঠ মুড়ি মুখে দিল নূরজাহান। এক কামড় মিঠাই খেল। ও ভাবিছাব, কইলা না?
মাজেদা বলল, দুইজনেঐ বাইত্তে আছে।
কো?
রোয়াইলতলার ছাপরা ঘরটা দেখাল মাজেদা। ওই ঘরে।
অহনতরি ওইঘরে কী করে? ঘুম থিকা ওডে নাই?
আসুরা আবার তার টোফাটোফি (মাটির খেলনা হাঁড়ি পাতিল) লইয়া আগের জায়গায় খেলতে বসে গেছে। একবার সেইদিকে তাকিয়ে মাজেদা বলল, আমার হরি উটছে। পাগলনি ওডে নাই।
আবদুলের পাশে ওটার উপর যেখানে বসেছিল মাজেদা আবার সেই জায়গাটায় বসল। তার দেখাদেখি নূরজাহানও বসল। পাগলনি যহন ওডে নাই তয় ওই ঘরে ফুবু করে কী?
ও তুই তো ঘটনা কিছু জানচ না।
নূরজাহান অবাক হল। কী অইছে?
পাগলনি তো অহন অন্যপদের পাগলামি ধরছে।
কোন পদের?
হারাদিন কেঁতার তলে হুইয়া থাকে। ঘরেতথন বাইর অয় না। বাইর অয় রাইত্রে। অর দিন অইয়া গেছে রাইত, রাইত অইয়া গেছে দিন। দিনের বেক (বেবাক) কাম করে রাইত্রে আর রাইত্রের কাম করে দিনে।
কও কী?
হ। আমার হরি হারাদিন বইয়া থাকে পাগলনির শিথানে।
তয় ফুবুর খানদাওন আর অন্য কাম কাইজ?
ফাঁকে ফাঁকে করে।
এইডা তো দেহি আজব কারবার।
হ। এইপদের পাগল জিন্দেগিতে দেহি নাই। ও আরেকখান কারবারও তো অইছে।
কী?
কয়দিন পর পর পাগলনি খালি নাইড়া অয়।
হায় হায় কও কী?
হ। পাগলনির মাথায় অহন চুল নাই। মাথা নাইড়া।
নূরজাহান উঠে দাঁড়াল। থালের মুড়ি অর্ধেকের মতন খাওয়া হয়েছে, মিঠাইও প্রায় শেষ। একমুঠ মুড়ি মুখে দিয়া সে বলল, ভাবি, আমি ইট্টু ওই ঘর মিহি যাই। ইট্টু দেইক্কাহি ফুবু কেমতে বইয়া রইছে, পাগলনি কেমতে ঘুমাইতাছে।
মাজেদাও উঠল। আইচ্ছা যা। তয় চুপ্নে চুল্পে যাইস। পাগলনি য্যান উদিস না পায়।
আইচ্ছা।
বিলাইয়ের মতন নরম পায়ে রোয়াইলতলার ছাপরা ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল নূরজাহান। একমুঠ মুড়ি মুখে দিল, একটুখানি মিঠাই মুখে দিল। ঘরের ঝাঁপ আলগা করে রাখা। রোদ আজ উঠেই নাই। পদ্মার ঘোলা পানির মতন আলো চারদিকে। সেই আলোয় ঝাঁপের ফাঁক দিয়া ঘরের ভিতর উঁকি দিল নূরজাহান। মুখে মুড়ি আছে, একটা-দুইটা চাবান দিয়া মুড়ি মাত্র গিলতে যাবে, দেখে রোয়াইলতলার ছাপরা ঘরের মেঝেতে লাশের মতন সিধা হইয়া শুইয়া রইছে তছি পাগলনি। পাও থিকা মাথা তরি ছিড়াভিড়া কাঁথা দিয়া ঢাকা। তার মুখ বরাবর আঁপের দিকে মুখ দিয়া বইসা আছে তছির মা। কাঁথার ভিতর থেকে একখান হাত বাইর কইরা মা’র একখান হাত ধইরা রাখছে তছি। ধরার ভঙ্গি দেইখা বুঝা যায়, সে ঘুমাইয়া আছে দেইখা মায় যে তারে ফাঁকি দিয়া ঘর থিকা বাইর হইব সেই পথ নাই। তছি উদিস পাইয়া যাইবো।
