.
১.২২
শিশুর মতো শুয়ে আছে নূরজাহান। শাড়ি উঠে আছে ডানপায়ের গুড়মুরা ছাড়িয়ে একটুখানি উপরে। বিকালের বেণী করা চুল ঘুমাবার আগে আলগা করে দিয়েছে। খোলা চুল তেল চিটচিটা বালিশের পিছন দিকে লুটাচ্ছে। গভীর ঘুমে ডুবে থাকার ফলে শ্বাস পড়ছে ভারী হয়ে। মা বাবা কেউ তা খেয়াল করতাছে না। তারা আছে যে যার কাজে।
ঘরে জ্বলছে হারিকেন। চিমনির মাজার কাছটায় চিকন সাদা সুতার মতন ফাটল। রঙ চটে যাওয়া কাটার একপাশে ‘বায়েজিদ’ ছাপ মারা। বহুদিনের পুরানা হওয়ার পরও কোম্পানির ছাপ গা থেকে মুছে যায়নি হারিকেনের।
সন্ধ্যাবেলা হারিকেন আজ খুবই যত্নে পরিষ্কার করেছিল হামিদা। ফাটা কাঁচ সাবধানে মুছে, কেরোসিন ঢালার মুখে ছোট্ট চোঙা বসিয়ে, বোতল থেকে পরিমাণ মতো কেরোসিন ঢেলে হারিকেন যখন জ্বেলেছে, লগে লগে উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল তাদের গরিব ঘর। নূরজাহান তখনও ফিরেনি। দবির ফিরেছিল। ফিরে হামিদাকে হারিকেন জ্বালাতে দেখে অবাক হয়েছিল।
এই বাড়িতে বিশেষ কোনও দরকার না হলে হারিকেন জ্বালান হয় না। অন্ধকারে জ্বলে শুধু কুপি। বাড়িতে মেজবান মেহমান (অতিথি) এলে রাতের বেলায় সেই মেজবানরা যদি থাকে, মেজবানদের সামনে তো আর টিন পিতলের কুপি দেওয়া যায় না! গরিব হলেই বা কী, মানইজ্জ কি গরিব মানুষদের থাকবে না! তাও না হয় বাড়িতে যদি হারিকেন না থাকত! না থাকা ভিন্নকথা। থাকবার পরও মেজবানের সামনে দিবে না এত কিরপিন (কৃপণ) কি কোনও গিরস্ত হতে পারে! নাকি হওয়া উচিত। তবে বান তুফানের (ঝড় বাদলার) রাতে, বৈশাখ যষ্ঠি মাসে, আষাঢ় শাওন মাসে হারিকেন জিনিসটা দরকারী। দমকা হাওয়ায় টিকতে পারে না কুপি। সলতা (সলিতা) যতই বাড়ানো থাকুক সো সো করা বাতাস ছাড়লে লগে লগে ঘরবাড়ি আন্ধার। দবির গাছির তুলনায় গরিব গিরস্ত ঘরেও তখন জ্বলতে দেখা যায় হারিকেন। একবেলা ভাত না খেয়ে থাকতে পারে মানুষ বান তুফানের রাতে আন্ধারে থাকতে পারে না। ভয় পায়। মনে হয় আন্ধারে যখন তখন সামনে এসে দাঁড়াবে মৃত্যু। মানুষ দেখতে পাবে না কিন্তু তার ঢের (টুটি) টিপে ধরবে আজরাইল। জান কবচ করবে।
সন্ধ্যাবেলা হামিদাকে আজ হারিকেন জ্বালাতে দেখে দবির অবাক হয়ে ভেবেছিল, বাড়িতে কোনও মেজবান আসেনি, দিনও বান তুফানের না তাহলে হারিকেনের দরকার কী!
হামিদা বলেছিল, কাম আছে। কী কাম তা বলেনি। দবির জানতে চায়নি। খাওয়া দাওয়ার পর, নূরজাহান শুয়ে পড়ার পর, তামাক সাজিয়ে স্বামীর হাতে হুঁকা ধরিয়ে দেওয়ার পর হামিদা তার কাম নিয়ে বসেছে। ঘরের মেঝেতে হোগলা একখান বিছানোই থাকে। এই হোগলায় বসে খাওয়া দাওয়া করে তিনজন মানুষ। রাতেরবেলা তিনজন মানুষের দুইজন, মা মেয়ে উঠে যায় চকিতে আর দবির একখান বালিশ মাথায় দিয়া এই হোগলায়ই টান টান।
আজকের ব্যাপারটা হয়েছে অন্যরকম। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে মেয়ে একা উঠে গেছে চকিতে আর পুরানা মোটা একখান কথা বের করে, সুই সুতা নিয়া, হাতের কাছে হারিকেন, হামিদা বসেছে কাঁথা সিলাই করতে, তালি দিতে। হুঁকা হাতে দবির গিয়ে বসেছে দুয়ারের সামনে। বসে হুঁকায় প্রথম টান দিয়েই বলল, ও তাইলে এই কাম! এই কামের লেইগা হারিকেন আঙ্গান (জ্বালান) লাগে!
পুরানা, ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে এমন সুতি শাড়ির পাইড় (পাড়) থেকে টেনে টেনে বের করা সুতা ফেলে দেওয়া ম্যাচের বাক্সে সযতনে প্যাচিয়ে রাখে গিরস্ত বাড়ির বউঝিরা। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করে এই সুতা দিয়ে। সে কাঁথা ছেলে বুড়া যারই হোক না কেন। হামিদাও তেমন করে কাঠিম (ম্যাচ বাক্সে সুতা প্যাচিয়ে রাখার পদ্ধতি) বানিয়ে রেখেছ হলুদ রঙের সুতা। এখন সুতা দুই ঠোঁটের ভিতর কায়দা করে নিয়ে, ঠোঁটে লেগে থাকা আঠাল ছাপে শক্ত করে কাঁথা সিলাবার জংধরা একখান সুইয়ের পিছনে ঢুকাবার চেষ্টা করতাছে। জ্যোতি কমে আসা চোখে এই কাজ করা কঠিন। সুতা ঢুকলো কী ঢুকলো না বুঝাই যায় না। আসল জায়গায় না ঢুকে পাশ দিয়ে চলে যায় সুতা। লোকে মনে করে ঠিক জায়গায়ই ঢুকেছে। খুশি মনে সুতার আগায় টান দিতে গিয়ে বেকুব হয়ে যায়। হামিদাও দুই তিনবার হল। ফলে মেজাজটা খারাপ, ঠিক তখনই দবিরের কথা।
রুক্ষ গলায় হামিদা বলল, হারিকেন না আঙ্গাইয়া কেতা সিলাইতে বহন যায়নি!
দবির অবাক হল। ক্যা, বহন যাইবো না ক্যা?
জায়গা মতন সুতার অগা ঠিক তখনই ঢুকাল হামিদা। কাজটা করতে পেরে মেজাজ ভাল হল। কাঠিম থেকে অনেকখানি সুতা বের করে দাঁতে সেই সুতা কেটে হারিকেনের পাশে কাঁথা ফেলে মন দিয়ে তালি দিতে লাগল। স্বামীর দিকে তাকাল না। সরল গলায় বলল, কুপি আঙ্গাইয়া কেতা সিলাইতে বইলে কুনসুম না কুনসুম কেতায় আগুন লাইগ্যা যায়। কেতা সিলানের সময় অন্যমিহি খ্যাল থাকে না মাইনষের।
তামাক টানতে টানতে মাথা নাড়ল দবির। হ ঠিক কথা।
তারপরই যেন চকিতে শোয়া মেয়েটার কথা মনে পড়ল দবিরের। শুয়ে পড়ার পর থেকেই সাড়া নাই। এত তাড়াতাড়ি ঘুমাইয়া গেল!
গলা উঁচু করে নূরজাহানের দিকে একবার তাকাল দবির। তাকিয়েই বুঝে গেল ঘুমে কাদা হয়ে গেছে মেয়ে। দুনিয়াদারির খবর নাই।
দবিরের গলা উঁচু করাটা হঠাৎ করেই দেখতে পেল হামিদা। কথায় আর একটা ফোর (উঁচ ঢুকিয়ে টেনে বের করা) দিতে গেছে, না দিয়ে বলল, কী দেখলা?
