তাও চেষ্টা কইরা দেহি।
আবদুল উঠল। আবদুলকে উঠতে দেখে মাজেদাও উঠে দাঁড়াল। আথকা বলল, আমি যুদি তোমারে তিনশো টেকা দেই?
কথাটা যেন বুঝতে পারল না আবদুল। কী কইলা?
মাজেদা হাসল। কইলাম, আমি যুদি তোমারে তিনশো টেকা দেই?
মাজেদাকে হাসতে দেখে আবদুলও হাসল। বিপদের দিনে ঠাট্টা মশকরা করো?
না হেইডা করি না।
তয় কী করো?
কইলাম তো ঠাট্টা মশকরা করি না। হাচা কইতাছি। আমি তোমারে তিনশো টেকা দিতে পারি। তুমি আমার টেকা নিবা?
আলালদ্দির মা, ফাইজলামি কইরো না। ইহ জিন্দেগিতে একটা টেকা তোমার হাতে কোনওদিন দিতে পারি নাই। কোনওদিন একটা টেকা দিয়া কই নাই, তোমার যা মন চায় তুমি কিন্নো। হেই মানুষ আমারে দিবো তিনশো টেকা? এইডা ফাইজলামি না? পাঁচ-দশ টেকা হয় হেইডা এক কথা। তিনশো টেকা তুমি পাইবা কই?
মাজেদা আবার হাসল। কই পামু হেইডা তোমার জাননের কাম নাই। আমি তিনশো টেকা দিলে তুমি নিবা কিনা হেইডা কও।
নিমু না ক্যা? অতি অবশ্যই নিমু।
তয় টেকাডা কইলাম উধার। তোমারে আমি এমতেঐ দিতাছি না। দেলরা আম্মার কাছ থিকা উধার আনলে একমাস বাদে ফিরত দিতা না, আমার টেকাও একমাস বাদে ফিরত দেওন লাগবো। লগে লাব দেওন লাগবো পোনরো টেকা।
হাসিমুখে ভুরু কুঁচকে মাজেদার দিকে তাকাল আবদুল। তোমার কথাবার্তা কিছুই আমি বুজতাছি না। কীয়ের লাভ দেওন লাগবো?
হোনো, আমার মাজারো ভাইয়ে বাইষ্যাকালে সুদের কারবার করে। অভাবি মানুষরে সুদে টেকা উধার দেয়। একশো টেকায় এক মাসে দশ টেকা। একশো টেকা উধার নিবা, তোমারে দিবো নব্বই টেকা। সুদের দশটেকা আগেঐ কাইট্টা রাখবো। আমি হেই ভাইয়ের বইন। কেঐরে একশো টেকা উধার দিলে সুদের দশ টেকা আগেঐ আমার কাইট্টা রাখন উচিত। তয় তুমি আমার স্বামী, তোমার লগে ঐরকম কারবার আমি করতে পারি না। শতকরা দশ টেকা সুদ নেওনও ঠিক অইবো না। এইটেকা দিয়া তো তুমি আমারে আর আমার পোলাপানরেঐ খাওয়াইবা। নিজের মা বইনরেও খাওয়ামু?
হ হেইডাও খাওয়াইবা। এর লেইগা তোমার কাছ থিকা আমি সুদ নিমু কম। শতকরা পাঁচটেকা। আর সুদের টেকাডাও আগেঐ কাইট্টা রাখুম না। একমাস বাদে তুমি আমারে তিনশো পোনরো টেকা দিবা।
আইচ্ছা দিমু।
সত্য?
সত্য।
আবদুলের তখনও পর্যন্ত ধারণা মাজেদা তার লগে ফাইজলামি করতাছে। তাকে চিন্তিত দেখে, মন খারাপ দেখে তার মন ভাল করবার চেষ্টা করছে। তিনশো টাকা মাজেদা পাবে কোথায়?
আবদুলের ধারণা তছনছ করে ঘরে ঢুকল মাজেদা, ঘরের কোনও টুমটামের (আসবাবপত্রের) ভিতর থেকে পাঁচ দশ বিশ পঞ্চাশ টাকার খুচরা খাচরা মিলাইয়া পুরা তিনশো টাকা এনে দিল আবদুলের হাতে। এই লও, পুরা তিনশো।
টাকা হাতে নিয়া অপলক চোখে মাজেদার দিকে তাকিয়ে রইল আবদুল। কথা বলতে ভুলে গেল।
মাজেদার মুখে তখনও হাসি। এমতে চাইয়া রইলা ক্যা?
আবদুলের মুখটা হাঁ হয়েছিল। মাজেদার কথা শুনে মুখ বন্ধ হল। চোখে পলক ফেলে বলল, সত্যঐ এতডি টেকা তুমি আমারে দিলা?
হ। বিশ্বাস না অইলে গইন্না দেহো।
গনন লাগবো না। টেকা যে তিনশোই আছে হেইডা আমি বুজছি।
অহন বুজতে চাইতাছো এতডি টেকা আমি কই পাইলাম, এইত্তো?
হ।
পরে তোমারে কমু নে। বেইল হইয়া গেছে, তাড়াতাড়ি বাজারে যাও। নাওয়ের ছই দেওনের বেড়া কিন্না আনো, দাঐনের জিনিসপত্র কিন্না আনো, আইজ থিকা দাঐনএ বাও। পোলা লইয়া দাঐন বাইলে ভাল অইবো তোমার। এইডা আমি তোমারে কইলাম। যাও।
আলালদ্দিকে মাত্র ডাকতে যাবে আবদুল, তখনই বাড়ির ঘাটে এসে লাগল একটা কোষানাও। নাও বাইয়া আসছে নূরজাহান। কোনওরকমে কোষানাও ঘাটে লাগাইয়া, আগার চারটে রাখা দড়ি দিয়া ঘাটের খুঁটার লগে দড়ির একটা প্যাঁচ দিয়াই একদৌড়ে বাড়িতে উঠল নূরজাহান। খুশির চোটে বিরাট একটা লাফ দিল।
আবদুলের বউকে সে ডাকে ভাবি, আর আবদুলকে আবদুলদা। পারলে দুইজনকেই প্যাচাইয়া ধরে। তয় আবদুলকে সে ধরল না, ধরল মাজেদাকে। ভাবিগো, ও ভাবি। আহা রে কতদিন বাদে তোমগো দেখলাম!
নূরজাহানকে নৌকা বাইয়া আসতে দেখে আবদুল-মাজেদা দুইজনেই অবাক। মান্নান মাওলানার লগে ওই ঘটনা ঘটাবার পর নূরজাহানকে আর গ্রামের কোথাও দেখা যায় নাই। বাড়ি থেকে তারে বাইর হইতে দেয় নাই দবির-হামিদা। দেশগ্রামের বউঝিরা নূরজাহানের চেহারা কেউ আর দেখেই নাই। পুরুষপোলারাও তেমন কেউ দেখে নাই। কারণ দবিরের বাড়িতে তেমন যাওয়াআসা নাই কারও। সেই নূরজাহান আইজ একলা একলা নাও বাইয়া হাজামবাড়িতে আসছে এইটা তো বিরাট ঘটনা। একদিকে কিছুক্ষণ আগে মাজেদা আবদুলকে দিয়েছে তিনশো টাকা তারপর এইভাবে নূরজাহান আইসা হাজির, একলগে এতবড় দুইখান ঘটনা, আবদুলের দশা আথকা বোবা হয়ে যাওয়া মানুষের মতন। সে কোনও কথাই বলতে পারছে না। মাজেদা টাকা আইনা দেওয়ার পর যে অবস্থা হয়েছিল, নূরজাহানকে দেখেও সেই অবস্থা। কথাই বলতে পারছে না।
মাজেদাও নূরজাহানের মতো করেই প্যাচাইয়া ধরছে নূরজাহানরে। আনন্দ উত্তেজনায় ফাইটা পড়া গলায় বলল, তুই কই থিকা আইলি নূরজাহান? কেমতে আইলি? একলা একলা : নাও লইয়া তরে গাছিমামায় বাইর অইতে দিল? হামিদাআম্মায় তরে বাইর অইতে দিল?
নূরজাহানকে দেখে উঠানের ভিজা ভিজা মাটিতে খেলতে বসা আসুরা দৌড়াইয়া আসছে, হিজলতলার দিকে বঁড়শি বাইতে যাওয়া আলালদ্দি আর বারেক দুইজনেই বঁড়শি ফালাইয়া দৌড়াইয়া আসছে, যেন বাড়িতে আথকা একখান আমোদ আহ্লাদ শুরু হইয়া গেছে।
