সেই দিন নাইরে নাতি
খাবলা খাবলা খাতি
এক গরিব নানা তার নাতিকে সুখের দিনের বর্ণনা দিতে গিয়া এই কথা বলছিল। অর্থ হচ্ছে, আগের দিন ভাল ছিল। তখনকার দিন থাকলে প্রচুর খেতে পেতি। তবে আবদুলের মনে হয় এই প্রবাদের কোনও অর্থ নাই। গরিব মানুষের জন্য আগের দিন পরের দিন সব দিনই অভাবের।
হাজামরা একসময় দাঐন বাওয়ার কাজও করত বর্ষাকালে। দেশগ্রামে ইরির চাষ শুরু হওয়ার পর ছাইড়া দিছে। একদম ঠেকায় না পড়লে আইজকাইল আর কেউ বায় না। মেদিনমণ্ডলে তো একটাই হাজামবাড়ি। আবদুল ছাড়া হাজামবাড়ির কেউ আর দেশগ্রামে নাই। কে বাইবো দান। রানাদিয়া গ্রামে যারা আছে, তারা বিরাট গুষ্টি। এক বাড়িতেই শ-খানেকের উপর ঘর। ভোটের সময় বিরাট দাম তাদের। ম্যালা ভোটার এক বাড়িতে। তাদের মধ্যে একেবারেই গরিব যারা তারা কেউ কেউ এখনও বর্ষাকালে দান বায়। মাছ যা ধরে ওই দিয়া সংসার চালানো দায়। তাও ধরে। কী করবো? দিনে এক ওক্ত খাইয়া বাঁচলেও তো বাঁচতে হইবো!
ঘরের ওটায় বসে সকালবেলা আজ মোটা মোটা তিনখান আটার রুটি ঝোলা মিঠাই দিয়া খাইছে আবদুল। তারপর এতখানি বেলা হইছে ওটাতেই বইসা আছে। সংসার নিয়া, বর্ষাকালের সামনের দিনগুলি নিয়া খুবই ভাবছে।
আবদুলের বউর নাম মাজেদা। সংসার পোলাপান নিয়া ব্যস্ত থাকার পরও স্বামীর চিন্তিত মুখ কয়েকবার খেয়াল করছে সে। মেয়েটার নাম আসুরা। সে উঠানের মাটিতে বইসা ধুলাবালি দিয়া খেলতাছে। আলালদ্দি আর বারেক দুইজনের হাতে দুইখান বঁড়শি। বাড়ির পিছন দিককার হিজল তলায় গিয়া বঁড়শি ফালাইয়া বইসা আছে তারা। আধার দিছে গুঁড়া ইচা (চিংড়ি)। দুই চারটা পুঁটি ট্যাংরা, পাবদা রয়না ধরবে। দুপুরের দিকে ঘোপার ওইসব গুড়াগাড়ি মাছ নিয়া আসলে কুইটা কাইটা রান্না করবে মাজেদা। লগে শাকপাতা কিছু দিবে। সংসার তো এইভাবেই চলে। রোয়াইলতলার ঘরে আজ সাত-আষ্টমাস ধইরা কাঁথার নীচে শুইয়া থাকে তছি পাগলনি। মা বইসা থাকে তার শিথানে। রাতেরবেলা আগের নিয়মেই বারেক গিয়া ঘুমায় দাদি ফুবুর পাশে।
তছিরে নিয়াও গোপন একখান চিন্তা আছে আবদুলের। মানুষ খুন করছে পাগলনি। তারপর থেকে পাগলামি হয়েছে অন্যপদের। কাঁথার তলায় সারাদিন নিজেরে লুকাইয়া রাখে। রাতেরবেলা চুপে চুপে বাইর হয়। দিনের কাজ সারে রাতে, রাতের কাজ দিনে। দুনিয়াটাই উলটা হইয়া গেছে তছির।
তয় গত আষ্টমাসেও কারও মুখে কোনওখানে রুস্তম রিকশাআলার খুনের কথা তেমন আর ওঠে নাই। পুলিশ দারোগারাও মনে হয় ভুইলা গেছে। ভোলে নাই শুধু এই বাড়ির তিনজন মানুষ। তছি নিজে আর তার মা, আর তার ভাই। গোপন ভয়টা তাদের রয়েই গেছে।
ভাতকাপড়ের মতন এইটাও তো এক চিন্তা।
একটু আজাইর হইয়া আবদুলের সামনে আইসা দাঁড়াইছে মাজেদা। কী অইছে তোমার?
আবদুল উদাস চিন্তিত চোখে বউর দিকে তাকাইছে। না কী অইবো?
কী চিন্তা করতাছো বিয়ান থিকা?
আবদুল দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। চিন্তার কি আর সকাল আছে? কামকাইজ নাই। ঘরের চাউল ফুরাইয়া আইতাছে। কয়দিন পর তো ভাত জুটবো না!
স্বামীর পাশে আন্তরিক ভঙ্গিতে বসল মাজেদা। হ। কোলার ধান বাইন্না (ভেনে) যেই চাউল পাইছি হেইডি তো শ্যাষ অইয়া আইলো।
এতডি মানুষ সংসারে। ওড়ু চাউলে কয়দিন যায়?
হ। তয় ছাতির কাম ইবার নাই ক্যা? এত ম্যাগবিস্টি অইতাছে, দেশগেরামের মাইনষে কি বাইত থিকা বাইর অয় না? বেবাকতে কি নতুন ছাতি লইয়া বাইর অয়? ছিড়া ভাঙ্গা ছাতি নাই কেঐর?
কেমতে কমু? কাইল বাজারে বইয়া তো দশটেকার কামও করতে পারি নাই। আইজ কাইল দশটেকায় এক-দেসসের চাউলও তো পাওয়া যায় না।
আইজ যাইবা না বাজারে?
না। কী করুম গিয়া কও? নাও বাইয়া এতদূর যাওন আহন, শতখানি টেকার কাম না অইলে পোষায়, কও?
হ।
তয় অন্য একহান চিন্তা করতাছি।
কী চিন্তা?
আলালদ্দিরে লইয়া দাঐন বামু।
মাজেদা একটু চমকাল। কও কী?
হ। বিলেরবাড়ির ওই মিহি হারারাইত দাঐন বাইলে গুঁড়াগাড়ি মাছ যাঐ পাই, এক দেসসো টেকার কাম অইবো।
হেইডা অইতে পারে। তয় তোমার শইল্লে কুলাইবো?
কী করুম কও! আর তো কোনও পথ দেখতাছি না। বাপে-পুতে দাঐন বাওনের ফাঁকে ফাঁকে ঘুমাইয়া লমুনে। এক ঘণ্টা আমি ঘুমামু, এক ঘণ্টা পোলায়।
কেমতে ঘুমাইবা? কেঁতা বালিশ রাখবা কই?
ক্যা, নাওয়েই রাখুম।
তোমার নাওয়ে তো ছই নাই?
পলিথিন দিয়া কোনওরকমের একখান ছই বানাইয়া হালামুনে। বাঁশের একখান বেড়া বাইন্দা, বেড়ার উপরে পলিথিন দিয়া আইজঐ ওইহান বানামু।
তয় তো বাজারে যাওন লাগবো পলিথিন কিনতে।
হ। কম দামের পাতলা পোতলা একখান বেড়াও কিন্না আনুম কিনা চিন্তা করতাছি। তয় আইজ থিকাঐ দান বাইতে যাইতে পারি। বসি আর লায়লনের (নাইলনের) সুতা দড়ি এই হগলও কিনতে অইবো। শত তিনেক টেকা খরচা আছে।
টেকা পাইবা কই?
হেইডাঐ চিন্তা করতাছি। ঘরে তো দশটা টেকাও নাই।
হ। এমতে কি সংসার চলে!
আবদুল একটু চুপ করে রইল, মাজেদার মুখের দিকে তাকাল। দেলরা আম্মার কাছে যাই। তারে গিয়া কই, শততিনেক টেকা উধার দেন আম্মা। মাসেকখানি বাদে দিয়া দিমুনে।
হেয় কি দিব?
দিতে পারে! আগে দুই-চাইর বার বিশ-পনচাশ টেকা চাইয়া তার কাছে আমি পাইছি।
বিশ-পনচাশ আর তিনশো কি এককথা অইলো?
