তয় নূরজাহানের বাপের জন্য জলচৌকি দিতে হবে, চা বানাতে হবে এটা সহ্য করা রাবির পক্ষে খুবই কঠিন। দেলরার কথা শুনে থমথমা গলায় বলল, আমি অহন কেমতে এই হগল কাম করুম? বাদলা শিংমাছ ধরছে হেই মাছ কুড়ুম, ভাত চড়াইছি, অহন আবার মোশলা বাটতে অইবো, এই হগল থুইয়া চের চকি কেমতে দিমু? আপনে গিয়া ঘরে বহেন। আর আপনে তো বুজি এই টাইমে কোনওদিন চা খান না। অহন চা খাইবেন ক্যা? চা খাইলে দোফইরা ভাত খাইতে পারবেন না। খিদা নষ্ট অইয়া যাইবো।
রাবি যে তাকে আর তার মেয়েকে দুইচোক্ষে দেখতে পারে না, ছ্যাপ ছিটানোর দিন থেকেই এটা জানে দবির। হামিদাকে নিয়া সেদিন দেলরা বুজির ঘরে নূরজাহানরে খুঁজতে এসেই বুঝছিল। তবে তারপর এতদিন কেটে গেছে, এখনও ঠিক হয় নাই রাবি। দবিরের মতন নিরীহ একজন মানুষের উপর, নূরজাহানের মতন একটা মাইয়ার উপর এখনও রাগ হইয়া রইছে। আজ এই বাড়িতে এসেই তো বাদলাকে সে বিষকাটালির কথা বলল। ওই তো একগোছা বিষকাটালি তুইলা আনছে বাদলা। রান্নঘরের ওটায় বসে বিষকাটালি দিয়া ছটছট করে বাড়ি মারছে শিংয়ে কাতা দেওয়া লোউংয়ে। তারপরও রাবির মন গলে না!
রাবির লগে একটু কথা বলতে চাইল দবির। তার আগেই দেলরা বললেন, যা কইছি ওইডা কর রাবি। তুই যুদি না পারছ তয় আমি বাদলারে কই।
দবির বলল, না না বুজি। বাদলা ছেমড়াডা শিংয়ের কাতা খাইছে। অর কাম নাই চের টাননের। আপনে নিমতলায় গিয়া খাড়ন আমি চের আনতাছি। জলচকি আমার লাগবো না, আমি একহান ফিরি আইন্না বমু নে। রাবি কাম করতাছে, করুক। আপনে চা খাইলে খান। আমার চা লাগবো না।
চেয়ার আনতে বড়ঘরে ঢুকে গেল দবির।
.
নূরজাহানকে দেখে ভাল রকম সাড়া পড়ল হাজামবাড়িতে।
বর্ষাকালে আবদুলের তেমন কাজকাম থাকে না। গোপন একটা অভাব লেগে থাকে সংসারে। শীতের দিনে লেপ তোশকের কাজ, মুসলমানির কাজ এসব থাকে। খরালিকালে গোরু তোলানোর (ষড়গোরুর অণ্ডকোষ ফেলে দেয়া) কাজও সে করে। এই কাজটা সব হাজাম করে না। হাজামদের মধ্যে যারা নিচা ধরনের তারা করে। আগে আবদুল করত না। দুই-তিন বছর ধরে করে। সংসার বড় হওয়ার ফলে এক-দুইদিন আজাইর থাকলে, রুজি রোজগার কিছু না হলেই চাউলে টান পড়ে। ছোট ভাইরা বুড়া মা আর পাগল বোন ফেলে যে যার মতন সংসার করছে। ভালই আছে তারা। শুধু মা-বোনের কথা ভাবে না। বড় পোলা হইছে বইলা সব দায় য্যান শুধু আবদুলের। এমনকী বোনগুলি তরি কোনওদিন খবর লয় না, তাদের বুড়া মা-টা কেমন আছে, পাগল বোনটা কেমন আছে। বড়ভাই আবদুলের কথা না ভাবল, আবদুলের বউপোলাপানের কথা না হয় না ভাবল, মা-বোনটার কথা কেউ ভাববে না! এই মায়ের পেটে শুধু কি আবদুলই জন্মাইছে? অন্যরা জন্মায় নাই? পাগল বোনটার ভাই কি শুধু আবদুলই? আর কেউ না? কারও কোনও দায়দায়িত্ব নাই?
নিজের তিনটা পোলাপান আবদুলের। বড়পোলা আলাউদ্দিন, বাড়ির সবাই ডাকে আলালদ্দি, তার বয়স বারো-তেরো বছর। মাজারো বারেক। তারপর একটা মাইয়া। বউ নিয়া নিজেরা পাঁচজন আর মা-বইন। সাতজন মানুষের সংসার কি য্যানত্যান! জাগা জমিন বলতেও তো কিছু নাই। এই বাড়ি আর বাড়ির লগের ওই তিন চাইর গন্ডার কোলা (ছোট খেত)। তারও তো ভাগিদার কম না। আবদুল একলা হইলে কথা ছিল। তয় এইসব নিয়া এখনও কথা তোলে নাই ভাইবইনরা। অভাব অনটনে পড়লে একদিন তুলবো। বেচার কথা। বলবো। যে যার অংশ বেইচা টাকা নিয়া যাইবো। সড়ক হওয়ার ফলে জাগা জমিনের দাম লাফায়া লাফায়া বাড়ছে। কোনদিন কোন ভাই আর নাইলে বইন আইসা বেচার চারি (তাল) তুলবো আল্লাই জানে।
এইসব আজকাল মাঝে মাঝে ভাবে আবদুল। আজ সকালেও ভেবেছে। কাল সকাল থেকে দুপুর তরি মাওয়ার বাজারে ছাতি মেরামতের ছোট ব্যাগ নিয়া বইসা ছিল। দশ টাকার কাজও হয় নাই। বর্ষাকালে ছাতি মেরামতের কাজ সে করে। তয় এই বছর এত ম্যাগবিষ্টি তাও ছাতির কামে পয়সা নাই। আবদুল দিশা পাচ্ছে না বর্ষাকালটা এবার কেমন করে কাটবে। বাড়ির সামনের কোলায় ইরি যেটুকু হইছিল মাস দুয়েকের চাউল হয় না। সেইটুকু চাউল বর্ষাকালের জন্য রেখে দেয়। ওই চাউল দিয়াই সংসার চলছে। আর বেশিদিন চলবো বইলা মনে হয় না। রুজি রোজগার না করতে পারলে না খাইয়া থাকতে হইবো।
আজ সকাল থেকে নতুন একটা পথ বের করার চেষ্টা করছে আবদুল। আলালদ্দি বড় হইছে। তারে নিয়া বিলের বাড়ির ওইদিকে গিয়া দাঐন (এক ধরনের বঁড়শি। লম্বা দড়ির তিন-চার হাত পর পর চার-পাঁচ হাত লম্বা সুতোর মাথায় বঁড়শি লাগিয়ে পেতে রাখতে হয়। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সেই বঁড়শি তুলে মাছ ধরতে হয়) বাইবে কিনা চিন্তা করছে। সড়কের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশগ্রামে সবকিছুর দাম বাড়ছে। বড় মাছের দাম তো বাড়ছেই, গুঁড়াগাড়ি মাছও গরিব মানুষরা বাজারে গিয়া হাত দিয়া চুঁইতে পারে না, এত দাম। সারারাত দাঐন বাইলে দেড় দুইশো টাকার মাছ ধরা যাবে। তয় বিল বাওরে, চকেমাঠে আইজ কাইল ইরির চাষ দেখে, ইরির চাষে সার কীটনাশক এইসব ব্যবহার করা হয় দেইখা, জানের ভয়ে দেশ ছাইড়া পলাইছে সব মাছ। আগে কী পরিমাণ মাছ যে বিক্রমপুরে আছিলো?
আগের দিনের কথা মনে হলেই একটা প্রবাদ মনে আসে আবদুলের–
