পাছার চারটে এসে বইঠায় চারি দিল নূরজাহান। মেন্দাবাড়ির বড় পুকুর পাড়ি দিয়া হাজামবাড়ি মিহি মেলা দিল।
খানিক দাঁড়িয়ে মেয়েকে কোষানাও বেয়ে পুকুর পাড়ি দিতে দেখল দবির। তারপর মাজায় বান্ধা গামছা খুলে মুখ গলা মুছতে মুছতে দেলরা বুজিদের বড়ঘরের দিকে পা বাড়াল। রানঘরের দিক থেকে তখন বাদলার চিৎকার ভেসে আসছে। উঁহু রে উঁহু রে, বিষ্যে মইরা গেলাম রে। ওমা, মা আমারে পোকাশিংয়ে কাতা দিছে।
বাদলার চিক্কইর পাক্কইরে রান্দনবাড়ন ফেলে দিশাহারা হয়ে গেছে রাবি। কী রেখে কী করবে বুঝতে পারছে না। দেলরা এসে দাঁড়িয়েছেন পুব দিককার দরজার সামনে। পরনে সাদাথান, চোখে চশমা, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। ঘোপাটা রাখা আছে রান্নঘরের দরজার সামনে। ভিতরে খলবল খলবল করছে শিংমাছ। সেই ঘোপার সামনে দাঁড়িয়ে এখন ডান হাত দিয়া বাম হাতের বুইড়া লোউং টিপে ধরেছে বাদলা। আর চিক্কইর পাড়ছে।
ছেলের কিছু হলে প্রথমেই দিশাহারা হয় রাবি, তারপর চেতে যায়। এখন সেই চেতাটা চেতল। বাদলার পিঠে গুম গুম করে দুইটা কিল দিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ওই গোলামের পো গোলাম বসুসি বাইতে তরে যাইতে কইছে কে? শিংমাছ ধরতে কইছে কে?
দেলরা তার স্বভাব মতন চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে ঠান্ডা গলায় বললেন, এমতেঐ শিংয়ের কাত খাইছে, আবার অরে কিলাইতাছস ক্যা?
রাবি মুখ খিঁচিয়ে বলল, গোলামের পোয় শিংমাছ ধরতে গেছে ক্যা?
গিয়া তো ভালই করছে। শিং ধরছে। কয়ডা ধরছরে বাদলা।
বাদলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, পাঁচটা ধরছি। চাইল্ডা বড় বড়, একহান পোকা। ওই পোকাডায়ঐ আমারে খাইছে। উঁহু রে। এই যে দেহেন বাও আতের বুইড়া লোউং ফুদরি (ছিদ্র, ফুটো) কইরা হালাইছে। আর সাই বিষ। উহু রে।
বাদলার বাঁ হাতের বুড়া আঙুলের আগায় মুশুরি দানার মতন একটুখানি রক্ত লেগে আছে। দেখে দেলরা বললেন, ইট্টুহানি হলদি বাটা লাগায় রাখ। বেদম কইম্মা যাইবোনে।
রাবি তখন মতলেবকে নিয়া পড়েছে। পোলা রেখে স্বামীরে বকাবাজি শুরু করেছে। আরেক গোলামের পোয় জ্বরের ভ্যাক ধইরা পইড়া রইছে। পোলায় শিংয়ের কাতা খাইয়া মরে, গোলামের পোয় রাও করে না। মনে অয় মইরা গেছে।
রাবিকে ছোট করে একখান ধমক দিলেন দেলরা। আকথা কইচ না ছেমড়ি। কইলাম যে হলদি বাটা লাগায়া দে।
ততক্ষণে দবির এসে দাঁড়িয়েছে রানঘরের সামনে।
বাদলা ঙো ঙো করতে করতে মাকে বলল, তোমার লেইগাঐত্তো শিঙের কাতা খাইছি আমি। মোতালেব কাকার লগে বাজারে যাইতে চাইলাম যাইতে দিলা না। বাজারে গেলে শিংয়ের কাতা আমি খাইতাম? বাজারে যাই নাই দেইক্কাঐত্তো বসৃসি বাইতে গেছি।
রাবি কথা বলবার আগেই দবির বলল, কী অইছে? শিংয়ে কাতা দিছে? আরে বেড়া শিংয়ের কাতায় কিছু অয় না। দেখ বিষকাডালি (বিষকাটালি। এক ধরনের আগাছা) পাওয়া যায়নি। দুই-তিনডা বিষকাডালি আইন্না যেহেনে শিংয়ে কাতা দিছে ওহেনে বইড়া কহেকখান বাড়ি দিলেঐ দেকবি বেদনা গেছে গা।
দবিরের কথা শুনে বাদলার মুখ উজ্জ্বল হল। কান্না ব্যথা ভুলে বলল, এইত্তো, আসল বুদ্ধি পাওয়া গেছে। বিষকাড়ালির কথা তো আমার মনেই আছিলো না। মোতালেব কাকাগো ছাইছে, তেতইল গাছের ওই মিহি বিষকাডালি আছে। যাই লইয়াহি গিয়া।
বাঁ হাতের বুড়া আঙুল ডান হাতে চেপে ধরে বাদলা দৌড়ে চলে গেল মোতালেবদের বাংলাঘরের ছাইছে। সেই ঘরের চালে মোতালেবের কয়েকটা কবুতর বাকবাকুম বাকবাকুম করছে। রাবি গিয়া ঢুকেছে রানঘরে। মুখ এখনও থমথমা। বাদলার কিছু হলে সহজে মুখ থেকে রাগ বিরক্তি যায় না তার।
দেলরা তখনও দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। দবির হাসিমুখে তার দিকে তাকাল। কেমুন আছেন বুজি?
আছি ভালই। তুই আইলি কইথিকা?
বাইত থিকাঐ আইছি।
তরে দেকলাম বহুতদিন পর। নূরজাহানের ওই ঘটনার পর তরে আর দেহি নাই। ভাল আছস দবির?
দবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আছিলাম ভালঐ বুজি। তয় দুই দিন ধইরা ভাল নাই।
ক্যা, আবার কী অইলো?
অইছে একহান কারবার। হের লেইগাঐ আপনের কাছে আইছি।
আয় ঘরে আয়।
ঘরে বাদলার বাপে আছে?
হ। ও অর সামনে কথা কইতে চাস না?
না বুজি। আমি চাই না এই কথা অন্য কেঐ হুনুক।
মতলার হোনন না হোনন একঐ কথা। কে কী কইলো না কইলো ওই হগল ও মনে রাকবো না। ও আছে অর শইল লইয়া। ইট্টুহানি জ্বর অইছে হেতেই বেউস অইয়া পইড়া রইছে। হুনলি না রাবি বকাবাজি করলো!
হুনছি।
দেলরা কয়েক পলক কিছু ভাবলেন, তারপর বললেন, আইচ্ছা ঠিক আছে। তয় ল নিমতলায় বইয়া কথা কই। এইমিহি কেঐ আইবো না।
আইচ্ছা। দেলরা রাবিকে ডাকলেন। ওই রাবি, নিমতলায় চের দে আর একহান জলচকি দে। তারবাদে দুইকাপ চা বানা।
দবিরকে দেখেই বিরক্ত হয়েছে রাবি। তর মেয়ে নূরজাহান মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ ছিটিয়ে দিয়েছিল। রাবির কাছে মান্নান মাওলানা হচ্ছেন ফেরেশতা। সেই ফেরেশতার মুখে ছ্যাপ দিয়েছে যার মেয়ে তাকে দেখতে পারায় কোনও কারণ নাই রাবির। সেই মানুষের জন্য জলচৌকি আনতে হবে, চা বানাতে হবে এটা রাবি ভাবতেই পারছে না। সে একবার যার উপর রাগ বিরক্ত হয় হাজার চেষ্টায়ও সেটা আর ঠিক হয় না। ওই যে একদিন বাদলারে থাবড় দিয়েছিল মোতালেব, ঘেঁটি ধাক্কা দিয়েছিল তারপর থেকে আইজরি মোতালেবরে দুইচোক্ষের নিলায় দেখতে পারে না সে। মোতালেবকে দেখলেই থমথমা হয়ে যায় মুখ। ওদিকে বাদলার লগে মোতালেবের আইজকাইল বিরাট খাতির। বাড়িতে থাকলে বাদলা আছে মোতালেবের পিছে পিছে। ওই নিয়া রাবি রাগারাগিও করে পোলার লগে। পোলায় পাত্তা দেয় না। পোলা আছে পোলার মতন, রাবি আছে রাবির মতন। আর এই দুইজনের মাঝখানে আছে মতলা। এইসব নিয়া রাবিকেও সে কিছু বলে না, বাদলাকেও বলে না। বলে লাভও নাই। মা-ছেলে কেউ মতলারে গনায় ধরে না। সে যে মানুষ, একজনের স্বামী আরেকজনের বাপ, দুইজনের কেউ সেটা মনে রাখে না।
