বাদলা হ্যাঁচকা টান দিল। বিঘত পরিমাণ একটা শিংমাছ উঠল। শিং হল শক্ত পদের মাছ। অন্য মাছের তুলনায় শইল্লে জোর বেশি, তেল বেশি। আবার কাটার ডরও আছে। শিংয়ে কাতা (কাটা) দিলে খবর আছে। বিষ্যে জান বাইর অইয়া যাইবো।
তয় শিং ধরার কায়দা বাদলা জানে। মাথার দুইপাশে গোরুর শিঙের মতন কাটা দুইখানের ফাঁক দিয়া টিবি (টিপ) দিয়া ধরতে হয়।
সেই ভাবেই শিংটা ধরল বাদলা। মুখ থেকে বঁড়শি খুলে ঘোপায় রাখল। আনন্দ উত্তেজনায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে। ঘোলাপানি তখন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।
ওই একবার ঘোলা করা পানিতে তিনটা শিং ধরল বাদলা। বেশি বড় না, মাঝারি সাইজের। তারপর পানি গেল পরিষ্কার হয়ে। শিঙের আর দেখা নাই। সুতায় টান পড়ে না, টোন চিৎ হয়ে ভাসে পানিতে। বাদলার আর সহ্য হয় না। বঁড়শি তুলে আবার পানিতে নামল সে। মাজা পানিতে নেমে আগের কায়দায় পানি ঘোলা করল। এবার ধরল দুইটা শিং। প্রথমটা আগের তিনটার সাইজের। পাঁচ নম্বরটা পোকাশিং (ছোটশিং, বাচ্চা অর্থে)। বাদলার হাতের পাঞ্জার চেয়েও ছোট। পাকা তেঁতুলের মতন রং। শিংমাছ বঁড়শি থেকে ছাড়াবার সময় ক্যোত ক্যোত আওয়াজ করে। পোকাশিংয়ের সেই আওয়াজ নাই। বাদলা আগের কায়দায়ই কাটার দুইদিক টিপে ধরে বঁড়শি থেকে শিংটা ছাড়ল। ঘোপায় রাখতে গেছে পোকাশিং ভালরকম একখান কাতা দিল বাদলার ডান হাতের বুইড়া লোউংয়ে। উঁহু রে, গেছি রে গেছি রে বলে ডান হাতের অন্য লোউং দিয়া বুইড়া লোউং চেপে ধরে রান্ধনঘরের দিকে দৌড় দিল বাদলা। বঁড়শি পড়ে রইল পায়খানার সিঁড়ির ওখানে, তবে বাঁহাতে মাছের ঘোপটা ঠিকই নিয়া গেল।
.
নৌকা হাজামবাড়ি বরাবর আসতেই নূরজাহান বলল, ও বাবা, আমারে তুমি হাজাম বাইত্তে নামাইয়া দেও।
আকাশে মেঘরোদ কোনওটাই নাই। ছায়া ছায়া একখান আলো ফুটে আছে চারদিকে। বর্ষার চকমাঠ থইথই করছে পানিতে। কচুরি কাইশ্যা, ধইনচা দল আড়ালি কতপদের ঘাস আগাছা মাথা তুলে আছে পানিতে। পদ্মার দিক থেকে আসা হাওয়ায় ঝিরঝির করছে পরিষ্কার পানি, ধইনচা কাইশ্যা মাথা দোলাচ্ছে। সড়কপার ঘেঁষে নৌকা বাইছে দবির। চকমাঠ থেকে এতটাই উঁচা সড়ক, তাকাতে হয় মুখ অনেকখানি তুলে। পশ্চিম দিককার চকমাঠ থেকে পুবদিককার গিরস্তবাড়ির উঠান পালান দেখা যায় না। দেখা যায় গাছপালা, দেখা যায় ঘরের চাল।
জাহিদ খাঁ-র বাড়ির গাছপালা দেখল নূরজাহান, বড়ঘরের ঢেউটিনের চাল দেখল। দবিরের এসব দেখার সময় নাই। সে তার মতন বইঠা বাইছে নাওয়ের চারটে বসে। নূরজাহানের কথা শুনে বলল, হাজামবাইত্তে গিয়া কী করবি?
আমার তো কোনও বাইত্তেই কোনও কাম নাই। আবার সব বাইত্তেই কাম। আইজ সাত-আষ্ট মাস এই হগল বাইত্তে আমি আহি নাই। তুমি মোবাইত্তে যাও। আমি হাজামবাইত থিকা গাওয়াল বাইত্তে যামু, তারবাদে যামু মিয়াবাইত্তে, তারবাদে আমুনে মোবাইত্তে।
কেমতে আবি? নাও দোন পাবি কই? কে তরে এক বাইত থিকা আরেক বাইত্তে নামাইয়া দিবো?
হেইডা পামুনে।
যুদি না পাছ?
তয় তুমি আইয়া লইয়া যাইবা।
আমি বুজুম কেমতে তুই কোন বাইত্তে আছছ?
নূরজাহান হাসল। হ এইডা একহান কথা। তয় তুমি কইলাম একহান পথ আমারে দেহাইছছা বাবা।
কী পথ?
ওই যে মাওয়ার বাজার থিকা হাতড়াইয়া বাইত্তে আইছিলা?
এবার দবিরও হাসল। নাও দোন না পাইলে তুইও হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া এক বাইত থিকা আরেক বাইত্তে যাবি?
হ।
না মা, ওইডা তুই পারবি না। পুরুষপোলারা যেই কাম পারে মাইয়ারা সবসময় হেই কাম পারে না। মাইয়াগো অনেক অসুবিদা। এতকিছুর কাম নাই, তরে আমি একহান। সোজা পথ দেহাইয়া দেই। দেলরা বুজির লগে আমার কথার কাম আছে। আমি ওই বাইত্তে নামি, তারবাদে তুই নাও লইয়া যেই যেই বাইত্তে যাইতে চাস যা।
আমি নাও বাইয়া যামু?
হ। এডু নাও বাওন তো কোনও বাওন না। বইডার দুইহান চাইড় (চাড়) দিলে মোবাড়ি থিকা হাজামবাড়ি, হাজামবাড়ি থিকা গাওয়ালবাড়ি। গাওয়ালবাড়ির লগেই মিয়াবাড়ি। তয় তুই যেইডা করবি হেইডা আমি হিগাইয়া দেই। পয়লা যাবি হাজামবাড়ি, হাজামবাড়ি থিকা যাবি গাওয়ালবাড়ি। শেষমেশ যাবি মিয়াবাড়ি। সবশেষে মিয়াবাড়ি ক্যা যাবি ক তো?
নূরজাহান আবার হাসল। বুজছি। মিয়াবাড়ির লগে অইলো দেলরা আম্মাগো সীমানা। তোমার কাম শেষ অইলে তাগো পালানে খাড়াইয়া তুমি আমারে ডাক দিতে পারবা।
দবিরও হাসল। হ।
তয় ওইডাই করো বাবা। আগে মেন্দাবাড়িঐ যাও।
হাজামবাড়ি আর আজিজ গাওয়ালের বাড়ির মাঝখান দিয়া নৌকা বাইয়া মেন্দাবাড়ির দক্ষিণ সীমানায়, দেলোয়ারাদের পালানের দিকে চলে এল দবির। বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়াল।
নূরজাহান বলল, তয় আমি অহন আর এই বাইত্তে নামুম না।
বইঠা নূরজাহানের দিকে আগাইয়া দিয়া দবির বলল, আইচ্ছা।
পালানে নেমে বলল, দুফইরা ভাত খাইতে খাইতে আইজ মনে অয় বিয়াল অইয়া। যাইবো।
বইঠা নিয়া নূরজাহান বলল, আমার মনে অয় না।
ক্যা?
দেলরা আম্মায়ঐ দেখবানে তোমারে দুফইরা ভাত খাওয়াইতাছে।
অইতে পারে।
আর আমারেও মনে অয় কেঐ না কেঐ খাওয়াইবো। তয় আমার খিদামিদা লাগবো বইলা মনে অয় না। পর পর দুইদিন তুমি আমারে বাইত থিকা বাইর করলা, এতেই আমার পেড ভইরা গেছে। এই যে অহন ইচ্ছা সাদিন মতন এইবাইত্তে যাইতে দিতাছো এতেই আমার পেড ভইরা গেছে। দোফরে ক্যা, রাইত্রেও যুদি আমি আইজ ভাত না খাই আমার খিদা লাগবো না।
