মতলা তিনদিন ধরে জ্বরে পড়ে আছে, ঘোপায় জিয়াইন্না (জিয়াননা) কোনও মাছই নাই। এই তো কিছুক্ষণ আগে মোতালেব আসছিল দেলরা বুজির কাছে। বাজারে যাইতাছি বুজি। ইলশা মাছ আনাইবেন নি? মাওয়ার বাজারে মাছবলে বিরাট সস্তা। আমি আনুম দুইডা। আপনে আনাইলে টেকা দেন। একলগে একআলি (হালি) ইলিশ কিনলে পড়তা ভাল পড়বো।
দেলরা একটু দোনোমোনো করেছেন, তারপর বিশটা টাকা দিয়েছেন মোতালেবকে। তাজা বড় ইলিশ আনিছ মোতালেব।
বাদলার লগে মোতালেবের আজকাইল বহুত খাতির। বাদলাকেও বাজারে নিয়া যেতে চেয়েছিল মোতালেব। যাবি নিরে বাদলা। ল।
বাদলা তখন মুড়ি খাওয়া শেষ করে কী করবে না করবে ভাবছে। মোতালেবের কথা শুনে লাফ দিয়া উঠল। হ যামু কাকা। লন।
রাবি যাচ্ছিল রান্ধনঘরে। মোতালেব আর বাদলার কথা শুনে মোতালেবকে কিছু বলল না, বাদলার দিকে চোখ ঘোরাইয়া বলল, না যাইতে পারবি না।
বাদলা হতভম্ব, ক্যা?
বাইত্তে কাম আছে।
কী কাম?
তর বাপের শইল খারাপ। আমি রানঘরে থাকুম, তুই বইয়া থাকবি বাপের শিথানে। পানিপুনি চাইলে আউগ্নাইয়া দিবি।
মোতালেব বলল, মতলার জ্বর কোনও জ্বরঐ না। পানিপুনি চাইলে তুইঐ দিছ।
না আমি পারুম না। আমার কাম আছে। আপনের যাওন আপনে যান। বাদলা যাইবো না।
বাদলা একটু ঘ্যানঘ্যান করার চেষ্টা করল। ও মা, তুমি না করো ক্যা? আমি ইট্টু যাই। বাইত্তে বইয়া থাকতে আমার ভাল্লাগে না। ও মা!
রাবি কঠিন গলায় বলল, না।
মোতালেব বুঝে গেল, না, বাদলারে বাজারে নেওন যাইবো না। নিতে পারলে কাম অইতো।
মোতালেব চলে যাওয়ার পরও ঘ্যানঘ্যান করছিল বাদলা। তুমি আমারে যাইতে দিলা না ক্যা মা? গেলে কী অইতো?
রাবি এবার একটু নরম হল। তুই বুজছস কীর লেইগা মোতালেইব্বা তরে বাজারে নিতে চাইছিলো?
কীর লেইগা আবার? এমতেঐ।
এমতেঐ না।
তয়?
নিতে চাইছিল তরে দিয়া নাও বাওয়ানের লেইগা। তুই গেলে হেয় বইয়া থাকতো, নাও বাওন লাগতো তর।
বইতাম। আমার তো নাও বাইতে আমদ লাগে।
এবার রেগে গেল রাবি। তর নাও বাওন আমি কিলাইয়া ছুডামু গোলামের পো। যা সর আমার চোখের সামনে থিকা। কয়দিন আগে বুকের দুদ ছাড়ছো, আর অওনঐ সিয়ানা অইয়া গেছো! সর, সর আমার চোখের সামনে থিকা!
বারান্দার চৌকিতে কাঁথা মুড়া দিয়া শুয়ে আছে মতলা। মোতালেব রাবি বাদলা সবার কথাই তার কানে গেছে। ওই সামান্য জ্বরেই সে উ আ কু কা করছিল। যেন জ্বরে বেহুশ হয়ে যাচ্ছে, অন্য কোনওদিকে মন নাই। তিনজন মানুষের কেউ ফিরাও তাকাল না মতলার দিকে। দেলরা তখন টাকা বের করতে কেবিনের আলমারি খুলেছেন।
বাপের কাছে বাদলা কোনওদিনও তেমন ভিড়ে না। সে মা-ন্যাওটা পোলা। মোতালেব বাজারে চলে যাওয়ার পর মা’র লগে লগে রান্নঘর তরি আসল। হঠাৎই একটা দৃশ্যের কথা মনে করে উত্তেজিত হল। মা, ওমা। হাগতে গিয়া পায়খানার তলে আমি তো খালি সিংমাছ দেহি, কইমাছ দেহি। পায়খানার তলের পাইনতে এই হগল মাছ ভরা। গু খাইতে আহে।
রাবি ভাতের চাউল ধুতে ধুতে বলল, হ আমিও দেকছি।
আমি পায়খানায় গিয়া বসসি বাই?
কী কইলি?
হ। বসসিতে কেউচ্ছার আদার দিয়া পায়খানায় বইয়া নীচে হালাইলেঐ সিং ধরন যাইবো, কই ধরন যাইবো।
আউ ছি! ওই গুয়ের মাছ কে খাইবো? দোলরা বুজি হোনলে পিছাদা পিডাইবো।
দেলরা বুজিরে কওনের কাম নাই।
না। ওইমাছ ধরিছ না।
বাদলা একটু চুপ করে মতলব বদলাল। তয় এককাম করি মা, পায়খানার ওই মিহি জঙ্গলে গিয়া বসসি বাই। ওহেনেও সাই মাছ।
আইচ্ছা বা গা। তয় কেউচ্ছা পাবি কই?
কেউচ্ছা এক জাগায় আছে। আমি দেকছি।
কোন জাগায়?
ফজলি আমগাছ তলে।
তারপর কেউচ্ছা তোলার কাজে লেগেছে বাদলা। কেউচ্ছা তুলে পায়খানার সিঁড়ির কাছে এসে টোসখোলা আর ছিটকি ঝোঁপের ফাঁকে বঁড়শি ফেলে বসেছে। হাতের কাছে কেউচ্ছার মালশা আর মাটির খোঁপা। ঘোপায় আধঘঘাপা পরিমাণ পানি। শিং কই শোল টাকি যেটাই ধরুক ঘোপার পানিতে রাখলে সহজে মরব না। এইসব হল জিয়ল মাছ।
মাছের আশায় মাউছারাঙ্গার (মাছরাঙা) মতন পায়খানার সিঁড়িতে বসে আছে বাদলা। কঞ্চির মাথায় শক্ত সুন্দর বঁড়শি। কাইয়া লোউংয়ের (কড়ে আঙুল) মাপের হরমাইলের টোন (পাটখড়ির টোম) ভাসছে পরিষ্কার পানিতে। মাছে ঠোকর দিলেই নড়ে উঠবে টোন। বাদলার বঁড়শিতে ঠোকর দেয় না কোনও মাছ।
তখনই বঁড়শিতে মাছ ধরার একটা কায়দার কথা মনে পড়ে বাদলার। পরিষ্কার পানিতে শিংমাছ আসে খুবই কম। শিংমাছ আসে ঘোলা পানিতে। এজন্য বঁড়শিতে শিংমাছ ধরার আগে যেখানে বঁড়শি ফেলা হয় সেই জায়গায় নেমে দুই পা দিয়া গোতলাইয়া পানি ঘোলা করতে হয়। তারপর বঁড়শি ফেললেই ছুটে আসে শিংমাছ। একদিকে ঘোলা পানি আরেকদিকে কেউচ্ছার আধার। বসি হালাইয়া সারন যায় না।
কায়দাটা করল বাদলা।
বঁড়শি তুলে পায়খানার সিঁড়িতে রেখে টোসখোলা ছিটকির ঝোঁপের ফাঁকে পরিষ্কার পানিতে নেমে গেল। পানি তেমন বেশি না। বাদলার মাজা তরি। কাছামারা লুঙ্গি ভিজে গেল। ওই নিয়া ভাবল না বাদলা। পানিতে নেমে দুই-পা দিয়া কাদামাটি গোতলাতে লাগল। দেখতে দেখতে ঘোলা হয়ে গেল পানি। লাফ দিয়া সিঁড়িতে উঠে বঁড়শি ফেলল বাদলা। এই কায়দায় সত্য সত্যই কাজ হল। বঁড়শি ফেলার পর সময় লাগলই না। সুতায় টান পড়ল। হরমাইলের টোন ডুবাডুবা করে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়া যেতে চাইল মাছে।
