হেইডা কইতে পারি না। দোফরও অইতে পারে, বিয়ালও অইতে পারে।
মাইয়াডা এতক্ষুন না খাইয়া থাকবো?
নৌকায় বসেই কথাটা শুনতে পেল নূরজাহান। বলল, আমারে লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না মা। বাইত্তে আইয়া রাইত্রে ভাত খাইলেও আমার অসুবিধা নাই। আমদে থাকলে খিদা আমার লাগেই না।
দবির গিয়া নৌকায় উঠল। কাঁধের পিরন নূরজাহানের হাতে দিয়া পাছার চারটে বসে বইঠা ফেলল। নৌকা ধীরে ধীরে ছাড়া বাড়িটার দিকে যায়। হামিদা আর ভাদাইম্মা দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। ছাড়াবাড়ির হিজল ডুমুরের ঝোঁপের দিকে উড়ে এল একটা কানিবক। বাসায় এসে বসতেই দুই-তিনটা ছানা চিঁ চিঁ করে মা’কে ঘিরে ধরল। কার আগে কে নিবে মায়ের মুখের আধার। এতক্ষণ ছানাদের পাহারা দিচ্ছিল বাবা বক। মা আসতেই সে উড়াল দিল আধারের সন্ধানে।
এতদূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আশ্চর্য এক ভাল লাগায় বুক ভরে গেল হামিদার। নূরজাহানও তো তাদের ওরকম এক ছানা। কখনও মা কখনও বাবা, দুইজন মানুষের কেউ না কেউ ওই কানিবক দুইটার মতনই আগলে রাখছে তাকে। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য পাহারা দিয়া রাখছে।
বড়ঘরের ছাইছে একটা ফজলি আমগাছ।
পশ্চিম দিককার ভাঙন ছাড়িয়া সমেদ খাঁ-র পুকুর। আমগাছটা ডিঙ্গি নৌকার মতন বেঁকা হয়ে আছে পুকুরের দিকে। গোড়ার কাছাকাছি এসে থেমে আছে বর্ষার পানি। আকাশের বৃষ্টি আর পাতালের পানি মিলামিশা জায়গাটা ক্যাতক্যাতা হয়ে আছে। লুঙ্গি কাছা মেরে এখানকার মাটি খুঁড়ছে বাদলা। তার হাতে বোতা (ভোতা) একখান দাও (দা)। দাওয়ের আছাড়ি নাই। গোড়ার দিকটা লম্বা গজালের মতন। সেই জায়গাটা শক্ত করে ধরে মাটি খুঁড়ছে বাদলা। হাতের কাছে কানা ভাঙা মালশা। খালি গায়ের বাদলার কালা কোলা রং মেঘের ছায়ায় কুইচ্চার মতন দেখাচ্ছে।
যে আশায় মাটি খুঁড়ছে বাদলা, সেই আশা পূরণ হতে সময় লাগল না। একটুখানি খোঁড়ার পরই দেখা গেল কিলবিল কিলবিল করছে কেউচ্ছা (কেঁচো)। ক্যাতক্যাতা মাটিতে আরামেই ছিল তারা। মাটি খুঁড়ে বাদলা তাদেরকে ভাল রকম বিপাকে ফেলেছে। মাটির আরও গভীরে মেলা দিছে তারা। খাবলা মেরে মেরে মাটিসহ কেউচ্ছা তুলে মালশায় রাখল বাদলা। চার-পাঁচ খাবলায় তার কাজ হয়ে গেল। এখন আরামছে একখান কইরা কেউচ্ছা মালশার মাটি থেকে বের করবে আর সাইজ বুঝে তিন-চার-পাঁচটা টুকরা করে বসৃসিতে (বঁড়শিতে) গাঁথবে। পালানের দক্ষিণ সীমানায় টোসখোলা ছিটকি আর ডুমুর বউন্না হিজলের জঙ্গল। দেলরা বুজিগো পায়খানা ঘর এই দিকটায়। বর্ষার পানিতে সকালের দিকেই ঝিম ধরে আছে ওদিকটা। খানিক আগে একটা ডাউক (ডাহুক) কয়েকটা ছাও নিয়া পালানের দিকে আসছিল। বাদলাকে দেখে চোখের পলকে কোনদিকে যে গেল, হদিস নাই।
তয় বাদলার মন ডাউকের দিকে নাই। সে আছে শিংমাছের আশায়। বর্ষার পানিতে জংলা মতন জায়গায় আধার খাইতে আসে শিং, ফলি, কই, মাগুর আর শোলটাকি গজারটাকি। এইসব মাছের স্বাদের জিনিস হইলো কেউচ্ছা। বসৃসিতে কেউচ্ছা গাইথথা ফালাইলেই হইলো।
বঁড়শিটা বাদলা রেখে আসছে ওইদিকে। এখন কেউচ্ছা নিয়া গেলেই হল। মাটির একটা ঘোপাও রাখছে। সকাল থেকে রোদ আর ওঠে নাই। আকাশের মেঘলাভাব চারদিক মনমরা করে রেখেছে। কেউচ্ছার মালশা হাতে নিয়া পায়খানা ঘরের ওদিকটায় এল বাদলা। দাওটা পড়ে রইল ফজলি আমগাছতলায়। দরকার হলে আবার গিয়া ওই দাও দিয়া মাটি খুঁড়ে কেউচ্ছা বের করবে।
তিনদিন ধরে মতলার একটু একটু জ্বর। বড়ঘরের বারান্দার চৌকি থেকে সে আর নামেই না। মেন্দাবাড়ির বাইরে রাবির কোনও কাজ নাই। তাও যে কাজ, এই কাজকে কাজই মনে করে না সে। দেলরা বুজির দুই ওক্তের রান্দনবাড়ন। লগে নিজের সংসারের রানটাও রান্দে। বর্ষাকালে নিমতলার চুলায় রান্দন চড়ান যায় না। রানতে হয় রান্নঘরে বইসা। উঁচা ভিটির ঘর। জোড়া চুলার একটায় দেলরা বুজির রান্না, আরেকটায় নিজেদেরটা। একলগে। দুই সংসারের রান হয়ে যায়। বিয়ানে তো আর রান্দনবাড়ন থাকে না। মুড়ি মিঠাই দিয়াই নাস্তা হয়। দেলরা বুজি শুধু এককাপ চা খান।
চা বানানো কোনও কাজ হল!
এইসব কাজ গায়েই লাগে না রাবির। বর্ষাকালে গিরস্তবাড়িতে কাজকাম কম। খরালিকালে কাজের আকাল নাই। আকাল হল বর্ষাকালে। তয় দেলরা বুজির বাড়িতে আছে বলে সুবিধা ম্যালা। খরালিকালে দেলরা বুজির সাহায্য লাগে না। মাসে দুই-চারদিন কামলা খাটে মতলা, কিছু পয়সা পায়। রাবি বাড়ি বাড়ি ধান বাইন্না পায় চাউল। সংসার ভালই চলে। বর্ষাকালে রাবির সংসার চালায় দেলরা বুজি। চাউলটা সে দেয়। মতলা বসি বাইয়া মাছ দুই-চারটা ধরলে দেলরা বুজির কাজ চলে। আবার মাঝে মাঝে মাওয়ার বাজার থেকে পদ্মার তাজা ইলিশ কিনা আনায় মতলারে দিয়া। মোতালেবরে দিয়াও আনায়। তয় মোতালেব আবার দুই-তিনটা টাকা চুরিও করে। হয়তো দুইখান ইলিশ কিনল। একটা নিজের জন্য আরেকটা দেলরা বুজির জন্য। দেলরা বুজির মাছের দাম থেকে দুই-তিনটা টাকা, পাঁচটা টাকা নিজের মাছের মধ্যে ভরে ফেলল। এজন্য মোতালেবকে দিয়া মাছ সহাজে কিনায় না দেলরা। মতলা বাজারে গেলে তারে দিয়া মাছ আনায়। মতলা দুইন্নাইর আইলসা (দুনিয়ার অলস), তয় চোর না।
