রান্নাচালা থেকে উঠানে এল হামিদা। মাইয়া লইয়া আইজ আবার কোন বাইত্তে যাইতাছো?
হামিদার দিকে তাকিয়ে হাসল দবির। দেলরা বুজিগো বাইত্তে যামু।
ক্যা?
এমতেই। নূরজাহান, আয় মা আয়। তাড়াতাড়ি আয়।
আগের বার দবিরের ডাক শুনতে পায় নাই নূরজাহান। এবার পেল, দৌড়ে এল। ভাদাইম্মাটাও আছে তার পিছন পিছন।
ল মা, ল।
নূরজাহান অবাক। কই যামু?
দেলরা বুজিগো বাইত্তে যামু। ল। আনন্দে পাকা ডালিম ফলের মতন ফেটে পড়ল মেয়েটি। সত্যই আমারে লইয়া যাইবা, বাবা?
তয় মিছানি? আমি দিহি কতক্ষুন ধইরা তরে ডাক পাড়তাছি।
নূরজাহান নলামাছের মতন একটা লাফ দিল। ইস আমার যে কী আমদ লাগতাছে? কতদিন মেন্দাবাড়িত যাই না, হাজামবাড়ি মিয়াবাড়ি গাওয়ালবাড়ি…। ইস কতদিন পর এতডি মাইনষের লগে দেহা অইবো!
হামিদা গোমড়া মুখে বলল, তরা বাপ মাইয়া তো আহ্লাাদেই আছস। বাইত্তে একলা একলা আমার অস্থির লাগে। কেউ কোনওদিন কয় না, তুমিও লও। আমি যে একজন মানুষ এইডা কের মনেই থাকে না!
হামিদার কথা শুনে বুকটা মোচড় দিয়া উঠল দবিরের। সত্যি তো, হামিদাকে নিয়া তো কোথাও যাওয়া হয় না কোনওদিন। এইটুকু একটা বাড়ির ভিতরই আটকে আছে মানুষটার জীবন। এই ঘর ওই রান্নাচালা আর ওই ছাপরা ঘরখান, বাঁশঝাড়তলা, ঘাটপার এইটুকুই তো মানুষটার দুনিয়া! খালিকালে যা-ও এবাড়ি ওবাড়ি একটু যেতে পারে, বাড়ির সামনের নামার দিকটায় গিয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, ছাড়াবাড়িটার ওদিকটায় গিয়ে একটু হেঁটে আসতে পারে, বর্ষাকালে সেই উপায়ও নাই। চারদিকে পানি। নৌকা ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়ার উপায় নাই। এতগুলি মাস শুধু এই বাড়িতে, ওই যে মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল নূরজাহান ওই সেদিনই গ্রামের অর্ধেকটা ঘুরা হয়েছিল তার। মান্নান মাওলানার বাড়ি, ঠাকুরবাড়ির উপর দিয়া মরনিবুজির বাড়ি, মেয়েকে বাঁচাতে পাগলের মতন ছুটেছিল হামিদা। ওইটারে কি আর বেড়ানো বলে!
আহা রে, সেটা একটা দিন গেছে! এত বড় ভয়ের দিন জীবনে আর কোনওদিন আসে নাই।
সেদিনকার সেই ঘটনার কথা মনে করে দবির মনে মনে বলল, আল্লাহ ওইরকম দিন য্যান ইজিন্দেগিতে আর না আহে।
তারপরই মনে পড়ল পরশু সন্ধ্যায় ল্যাংড়া বছিরের মুখে শোনা কথাটা। বুকটা ধক করে উঠল। মাওয়ার বাজার থেকে রাতেরবেলা সাঁতরে বাড়ি আসা, তারপর থেকে মরনিবুজিকে কথাটা না বলা তরি যে পাথর চেপে ছিল বুকে, সেই পাথরের ওজনও সেদিনকার সেই ঘটনার চেয়ে কম না। মান্নান মাওলানা অন্যভাবে প্রতিশোধ নিতে চাইছে নূরজাহানের উপর। নিজের বউ বানিয়ে জান খাবে মেয়েটির। এই পথ বন্ধ করার পথ দেখিয়ে দিয়েছে। মরনিবুজি। এখন সেই পথেই মেয়েকে নিয়া বের হচ্ছে দবির। দেলরা বুজিকে না ধরতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে! এনামুল সাহেব ছাড়া আর কেউ পারবে না মান্নান মাওলানার হাত থেকে নূরজাহানকে রক্ষা করতে।
এই অবস্থায় হামিদা বলল ওই কথা!
হামিদা যদি ঘুণাক্ষরেও জানত কী কারণে কাল থেকে মেয়ে নিয়া বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। দবির তা হলে মরে গেলেও বাড়িতে সে বসে থাকত না। বাড়িঘর ফেলে সেও রওনা দিত দবির আর নূরজাহানের লগে। ঘর দুয়ার সংসার কোনওদিকেই তাকাত না। নূরজাহান যে শুধু দবিরেরই কলিজার টুকরা তা তো না, হামিদার যে কীরকম টান ভালবাসা মেয়ের জন্য ওই সেদিনই ব্যাপারটা টের পেয়েছিল দবির।
নূরজাহান ততক্ষণে কোষানাওয়ের দিকে দৌড়ে গেছে। আহো বাবা, আহো। তাড়াতাড়ি আহো। লও মেলা দেই।
দবির আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ম্যাগের অবস্থা ভাল না মা। ছাতিডা ল।
এক ছাতিতে দুইজনের কাম অইবানি বাবা?
আমার ছাতি লাগবো না। আমি তো নাও বামু। ম্যাগ আইলে আমার পিরনডা লইয়া তুই ছাতি মাতায় দিয়া বইয়া থাকবি।
হামিদা বলল, তোমার ছাতির যা দশা, ওই ছাতি নেওন না-নেওন একঐ কথা।
আরে না, তেমুন ছিড়া না। কাম চলবো। নূরজাহান, যা মা, ছাতিডা লইয়া আয়।
নূরজাহান দৌড়ে ঘরে গিয়া ঢুকল।
দবির হামিদার দিকে তাকাল। তোমার কথা হুইনা আমার মন খারাপ অইছে। আসলেই তোমার কোনহানে যাওয়া হয় না। খালি এই বাড়ির মইদ্যেই পইড়া থাকো। আমার দিককার কোনও আততিয়স্বজনও নাই যার বাইত্তে গিয়া দুই-চাইরদিন বেড়াইয়া আহন যায়। দেশগেরামের বউঝিরা বাইস্যাকালে নাঐর যায়। বাপের বাইত্তে যায়, ভাই বইনের বাইত্তে যায়। তুমি বহুতদিন ধইরা পয়সা গেরামে যাও না, বাপের বাইত্তে যাও না। আগে দুই- চাইর বচ্ছরে একবার যাইতা। এই বাইষ্যায় তোমারে আমি তোমগো বাইত্তে লইয়া যামু। দেইখো, ঠিকঐ লইয়া যামু। কয়ডা দিন যাউক।
হামিদা কথা বলল না। উদাস হয়ে রইল।
ছাতা নিয়ে নূরজাহান তখন নৌকায় গিয়ে চড়েছে। আরাম করে বসেছে চটির পাটাতনে। ছাতিটা রাখা একপাশে। দবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, আহো বাবা, আহো।
নূরজাহানকে নৌকায় চড়তে দেখে ভাদাইম্মা এসে দাঁড়িয়েছে নৌকার সামনে। নূরজাহান হাসিমুখে বলল, তুই বাইত্তেঐ থাক ভাদাইম্মা। আমার মা’রে পাহারা দে। মা’য় একলা একলা হারাদিন কী করবো? তোর লগে কথাবার্তা কইবোনে।
হামিদার দিকে তাকিয়ে দবির বলল, যাইগো নূরজাহানের মা।
অনেকক্ষণ পর কথা বলল হামিদা। আইবা কুনসুম?
