বাইরে আগের মতন বৃষ্টি। টিনের চালায় একটানা ঝুমঝুম শব্দ। কোথাও আর কোনও শব্দ নাই। কুকুরটা শুকনা জায়গার খোঁজে রান্নাচালার দিকে চলে গেছে। বৃষ্টি পড়ে না এমন জায়গা খুঁজে এতক্ষণে হয়তো কুণ্ডলী পাকিয়েছে, হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। কুপির আলোয় দবিরের ঘরের অর্ধেকটা আলোকিত হয়েছে। সেই আলো তেমন জোরালো না, জোনাকির আলোর মতন ম্লান, মোলায়েম।
হামিদা বলল, মরনিবুজির লগে আর কোনও প্যাচাইল পাড়ো নাই?
কুপির আগুনে টিকা পোড়াতে পোড়াতে দবির বলল, আর কোন প্যাচাইল?
ল্যাংড়ায় যে সমন্দ আনলো!
একথা শুনেই বুকটা ধক করে উঠল দবিরের। পলকের জন্য বুকের সেই নেমে যাওয়া পাথর আবার চেপে বসতে চাইল বুকে। কলিজাটা মাত্র জবাই করা মুরগির মতন ছটফট করতে চাইল। কলকিতে টিকা বসিয়ে, পর পর বেশ কয়েকটা টান দিল হুঁকায়। এই ফাঁকে ভেবে নিল সকালবেলার মতন অবিরাম মিছাকথা এখন হামিদার লগে বলতে হবে। নানারকম কথায় ভুলাতে হবে তাকে।
তামাক টানার ফাঁকে দবির বলল, হ কইছি।
মরনিবুজি কী কইলো?
তোমার মতনই কইছে। দরকার অইলে বাইত্তে বহাইয়া রাখবা মাইয়া। তাও দোজবরের লগে বিয়া দিবেন না গাছিদাদা। যার বস আপনের থিকাও বেশি। নূরজাহান অইবো যার নাতিনের বসি।
হামিদা খুশি হল। ঠিকঐ কইছে। এত কষ্ট যেই মাইয়ার লেইগা করছি, এতবড় বিপদ থিকা আল্লায় যেই মাইয়ারে উদ্ধার করছে তারে অমুন মাইনষের কাছে বিয়া দিমু ক্যা? আল্লায় তো আমগো চালাইয়াই রাখছে। না খাইয়া তো আর থাকি না।
হ। মরনিবুজিও এইভাবেই কইছে।
তামাক টানার ফাঁকে হামিদার দিকে তাকাল দবির। কথা ঘুরাল। ম্যাগের যেই চেহারা ইবার দেকতাছি গো নূরজাহানের মা, মনে হয় বউন্যা অইয়া যাইবো।
অইতে পারে। বউন্যা অইলে আরেক বিপদ। ঘরে পানি উইট্টা গেলে মাচা বানতে অইবো।
অমুন বউন্যা মনে অয় অইবো না। আমগো চকিডা উচা আছে। চকিতেই থাকন যাইবো।
হামিদা আর কথা বলল না। ঝুলানো পা টেনে চৌকিতে তুলল। নূরজাহানের পাশে শুয়ে পড়ল।
তামাক টানা শেষ করে কাটা জায়গা মতন রাখল দবির। কলকিটা উপুড় করে রাখল হুঁকার পাশে, এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে টিকার আগুন। এভাবে রাখলে ধীরে ধীরে নিভে ছাই হয়ে যাবে। তারপর ফুঁ দিয়া কুপি নিভাল দবির। হামিদার পাশে শুয়ে পড়ল। বড় করে একটা শ্বাস ফেলল। শরীর ভেঙে ঘুম আসছে। বড় ধকল কাটলে শরীর ছেড়ে দেয়। দবিরেরও শরীর ছেড়ে দিল। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে দবির ভাবল, কাইল বিয়ানেই দেলরাবুজির কাছে যামু। এনামুল সাবরে যত তাড়াতাড়ি খবর দেওন যায়। যত তাড়াতাড়ি এই আজাব থিকা বাঁচন যায়।
বাইরে তখনও সেই আগের মতনই বৃষ্টি।
.
আইজ আবার কই মেলা দিলা?
কাঁধে নীল রঙের পিরন ফেলে মাজায় গামছাটা মাত্র বাঁধছে দবির, রান্নাচালা থেকে প্রশ্নটা করল হামিদা। স্বামীর কাঁধে পিরন দেখেই অনুমান করেছে, বাড়ি থেকে বের হচ্ছে দবির। খানিক আগে রান্নাচালায় বসে পান্তা খেয়েছে তিনজনে। খাওয়া শেষ করে নূরজাহান গেছে বাঁশঝাড়তলার দিকে। দুইদিনেই ভাদাইম্মা তার মহাভক্ত হয়ে উঠেছে। নূরজাহানের পায়ে পায়ে থাকে। নূরজাহান যেদিকে যায় সেও যায় পিছন পিছন। এত তাড়াতাড়ি একটা অচেনা জীব কী করে একজন মানুষের এমন বাধুক হয়ে ওঠে আল্লাহ মাবুদই জানেন।
নাস্তা পানি শেষ করে থালবাসন ধুতে ঘাটপারে গেছে হামিদা। ফিরা আইসা দেখে দবির তামাক টানছে যেখানে বসে পান্তা খেয়েছিল ঠিক সেই জায়গায় বসে। নূরজাহান বাঁশঝাড়তলায়ই আছে। ভাদাইম্মার লগে মজা করছে। সকাল থেকে রোদই ওঠে নাই। সারারাত বৃষ্টির পরও যেন আকাশের সাধ মিটে নাই। বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে দক্ষিণদিককার ধইনচাখেতের উপরকার আকাশ দিয়া পদ্মাপাথালে উড়ে আসছে কালিবাউস মাছের মতন মেঘ। এমনিতেই থম ধরে আছে চারদিক। পোলাপানের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতন হাওয়াটুকুও নাই। রোয়াইল ফলের মতন ম্লান আলো চারদিকে।
এই অবস্থায় কোথায় মেলা দিল দবির?
তামাক শেষ করে ঘরে ঢুকেই পিরান কাঁধে বের হয়েছে দবির। মাজায় গামছা বাঁধতে বাঁধতে কোষানাওটার দিকে যাচ্ছে, তখনই প্রশ্নটা করল হামিদা।
কোষানাও থাকে বাড়ির পুবদিকে। নূরজাহান যেখানটায় শোয় ওখানটায় ওই জানালার পাশে একটা আমগাছ। আমগাছের লগে বাঁধা থাকে নাও। দিনেরবেলা দড়ি দিয়েই বাঁধা থাকে। রাতে লোহার চিকন একখান শিকল দিয়া, আমগাছের গোড়ার দিকে প্যাচিয়ে পুরানা তালাটা মারা হয়। দেশগ্রামে নৌকাচোরের আকাল নাই। তালা না দিলে দড়ি খুলে নিঃশব্দে নৌকা নিয়া চলে যাবে। দিঘলির হাটে নিয়া গোপনে বিক্রি করে দিবে।
বর্ষার মুখে মুখে নৌকার তালাটাও বের করা হয়। পুরানা তালা। বছরভর ব্যবহার করা। হয় না। জং ধরে, শুকিয়ে খটখটা হয়ে থাকে। চাবিরও একই অবস্থা। একটুখানি সরিষার তেল চাবির গর্তে ঢুকিয়ে বার কয়েক মোচড়ামুচড়ি করলে তবে কাজ করে তালা। চাবিটা চিকন সুতলি দিয়া বান্ধা থাকে।
হামিদার কথার জবাব না দিয়া আমগাছের গোড়া থেকে নৌকার তালা খুলল দবির, শিকলের প্যাঁচ খুলে নৌকার ডরায় রেখে দিল।
হামিদা বলল, ছিকল তালা ডরায় রাকতাছো ক্যা? পাইনতে ভিজ্জা জমে (জং) ধরবো! ঘরে নিয়া রাখো।
ঘরে নিয়া তালা শিকল রেখে এল দবির। নূরজাহানকে ডাকল। কই গো মা, আয় মা।
