সন্ধ্যার পরও অনেকক্ষণ খোলা ছিল ওদিককার জানালা। শোয়ার আগে জানালা বন্ধ করেছে সে। মা-বাবার দিকে পিছন দিয়া শুইয়া পড়ছে। আজ অবশ্য শুইয়া পড়ার লগে লগেই ঘুমিয়ে পড়ার কথা মেয়ের। অনেকদিন পর সারাদিন সে আজ অনেক কাজ করেছে। বাড়িতে তো দুপুরবেলা ভাত খেয়েই ঘুম দেয়। আজ সেই ঘুম হয় নাই। এজন্য শুয়ে পড়ার লগে লগেই ঘুমিয়ে পড়ার কথা।
কুপির আগুনে টিকা পুড়িয়ে মাত্র কলকিতে দিয়েছে দবির, হুঁকায় মাত্র টান দিবে, হামিদা বলল, দুইয়েকখান কথা কইতে চাই।
হুঁকায় টান না দিয়া হাসল দবির। বাপ ফুইস রে (বাপ রে অর্থে)। কথা কওনের ভাল তরিকা ধরছো।
স্বামীকে হাসতে দেখে হামিদাও হাসল। তরিকার অর্থ আছে।
দবির হুঁকায় টান দিল। কী অর্থ?
কাইল রাইত্রে বাড়িতে আসনের পর থিকা তোমারে জানি কেমুন দেহা যাইতাছিল। মনে অইতাছিল কী জানি চিন্তা করো। বিয়ানে অনেক কথা অইলো তোমার লগে। তহনও মুখে চিন্তা দেখছি। তারবাদে আথকা মাইয়াডারে লইয়া গেলে মরনিবুজির বাইত্তে। হারাদিন হেই বাইত্তে কাড়াইয়া ফিরত আসনের পর বাপ মাইয়া দুইজনেই বহুত খুশি খুশি। ঘটনা কী?
নূরজাহান তোমারে কয় নাই?
কইছে। মরনিবুজি মোরগ পোলাও খাওয়াইছে। নূরজাহান নিজে রান্দনবাড়ন করছে। রান্দন খুব ভাল অইছিলো।
তয় তো ঘটনা হুনছোঐ।
না আমি হোনতে চাই আথকা মাইয়াটারে বাইত থিকা বাইর করলা ক্যা?
গুড়ক গুড়ক করে কয়েক টান তামাক খেল দবির। এতদিন ধইরা বাইত্তে বইয়া রইছে মাইয়াডা, বাইষাকাইলা (বর্ষাকাল) দিন, কোনওমিহি যাইতে পারে না, এর লেইগা অরে ইকটু বাইত থিকা বাইর করলাম।
এর লেইগা নাইলে মাইয়ার মনে আমোদ ফুরতি অইছে, তোমার মন কাইল রাইত্রে যেমুন দেখছি, বিয়ানে যেমুন দেখছি, মরনিবুজির বাইত থিকা ফিরত আহনের পর দেখি বিরাট ভাল। এইডার অর্থই আমি বুজলাম না।
বৃষ্টি তখন এত নিবিড় হয়ে নেমেছে, খোলা দরজা দিয়া বৃষ্টির হ্যাঁচলা (ছাট) আসছিল ঘরে। ছনছায় দাঁড়িয়ে ভাদাইম্মা ভিজে একেবারে চুপসে গেছে, খোলা দরজা দিয়া দুয়েকবার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেছে, দবিরের তাড়া খেয়ে পারে নাই।
এখন কুকুরটার দিকে তাকিয়ে মায়া লাগল দবিরের। সারারাত যদি এরকম বৃষ্টি হয় তা হলে কি এইভাবেই ভিজবে?
তামাক টানার ফাঁকে হামিদার দিকে তাকাল সে। কুত্তাডারে ঘরে ঢুকতে দিমু নি?
হামিদা অবাক। ক্যা?
ম্যাগের মইদ্যে ভিজতাছে। হারারাইত এই রকম ম্যাগে ভিজলে…
হামিদা বিরক্ত হল। তোমার কি মাতা খারাপ অইছে? কুত্তার লগে একঘরে থাকুম? দুয়ার আটকাইয়া দেও। দেখবানে কুত্তাডা রান্নঘর মিহি গেছে গা। রান্নঘরের চালের নীচে বইয়া থাকলে ম্যাগে ভিজবো না। ওই জাগা হুগনা থাকে।
দবির খুবই উৎসাহী হল। ঠিকই কইছো। দুয়ার খোলা দেইখাই শালার পো শালায় ঘরে হানতে চাইতাছে।
তামাক টানা রেখে ভাদাইম্মাকে একটা ধমক দিল দবির। যা যা রানঘর মিহি যা। হুগনা জাগা আছে। যা।
তারপর দরজা বন্ধ করে দিল। দরজার ডাসা ভাল করে লাগিয়ে তামাকে কয়েকটা টান দিল। নাকমুখ দিয়া বেদম ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে হামিদার দিকে তাকাল। কী কইবা, কও?
হামিদাও তাকাল দবিরের দিকে। আথকা মরনিবুজির বাড়ি গেলা ক্যা? মাইয়াডারে লগে লইয়া গেলা ক্যা?
মাইয়ার কথা তো একবার কইলাম। এতদিন ধইরা বাইত্তে বইয়া রইছে, মান্নান মাওলানার লগে ওই ঘটনার পর বাইত থিকা আর বাইর অয় না, এর লেইগা ওই বাইত্তে লইয়া গেলাম। মরনিবুজি ওরে জানডা দিয়া আদর করে। ওই শুয়োরের পোর হাত থিকা তো মরনিবুজিই ওরে বাঁচাইছিল।
হেইডা আমার মনে আছে।
অরে দেইক্কা যে কী খুশি অইছে না বুজি, নূরজাহানের মাগো, হেইডা তোমারে কেমতে যে কমু? মনে অইলো আপনা মাইয়াডা য্যান বহুতদিন বাদে বাইত্তে আইছে। মজনুও আমগো দেইক্কা বহুত খুশি।
মুখ তুলে নূরজাহানকে একবার দেখল দবির। আগের মতনই পিছন ফিরে শুয়ে আছে। পা দুইটা পেটের দিকে ভাঁজ করা। ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় গভীর ঘুমে। তবু হামিদাকে ইশারা করল দবির। ইশারায় জানতে চাইল মেয়ে ঘুমিয়েছে নাকি?
হামিদা মেয়ের দিকে তাকাল। খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, হ পুরা ঘুম।
সত্য?
হ। আমি আমার মাইয়ারে চিনি। ওর চালচলন কায়কারবার বেবাক আমার মুখস্থ।
তয় তোমারে একখান কথা কই। খাওনদান শেষ হওনের পর আমি আর মরনিবুজি বড়ঘরের দুয়ারের সামনে বইসা পান তামুক খাইতাছি। মজনু আর নূরজাহান দক্ষিণ পশ্চিমদিককার আমগাছটার ওইমিহি খাড়ইয়া খাড়ইয়া গল্প করতাছে আর হাসতাছে। নূরজাহানের মাগো, দেইক্কা আমার যা ভাল লাগলো।
এইডা আবার ভাল লাগনের কী অইলো?
তুমি আমার কথাডা বোজো নাই?
বুজছি বুজছি।
কী বুজছো কও তো?
মজনুর লগে নূরজাহানরে বহুত মানায়।
দবির হাসল। এই তো বুজছে। ওই বাইত্তে বইয়া বইয়া আমি খালি এই হগল কথাই চিন্তা করছি। মজনুর লগে অরে যেমুন মানায় আর মরনিবুজি অরে যেমুন আদর করে, মজনুর লগে যুদি অর বিয়া অইতো, মাইয়াডা যে কী সুখে থাকতো!
হামিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতবড় কপাল কি অর অইবো?
আল্লাই জানে।
তামাক শেষ হয়ে গেছে আগেই। দবিরের ইচ্ছা হল আরেক ছিলিম তামাক খায়, আর একটু সুখ দুঃখের আলাপ করে হামিদার লগে।
নিজের অজান্তেই তামাক সাজাতে লাগল সে।
