মজনু মনে মনে বলল, আপনে কে?
১.২১-২৫ মাটির গাছাটা (কুপিদানি)
১.২১
মাটির গাছাটা (কুপিদানি) কতকালের পুরানা কে জানে! জন্মের পর থেকে এই একটা মাত্র গাছাই দেখে আসছে মজনু। এক সময় বিলাতিগাবের মতো রঙ ছিল। দিনে দিনে সেই রঙ মুছে গেছে। এখন চুলার ভিতরকার পোড়ামাটির মত রঙ। মাটির তৈরি
একখান জিনিস কী করে এতকাল টিকে থাকে? তাও প্রতিদিন ব্যবহার করার পর!
আসলে গরিব মানুষের সংসারের কোনও জিনিসই সহজে নষ্ট হয় না। অভাবের সংসারে প্রতিটি জিনিসই দামি। যত্নে ব্যবহার করার ফলে ভঙ্গুর জিনিসও বছরের পর বছর টিকে থাকে। মজনুদের সংসারে যেমন করে টিকে আছে গাছাটা।
সেই গাছার ওপর এখন জ্বলছে পিতলের কুপি। কুপির বয়স গাছার চেয়েও বেশি। প্রায়ই ছাই দিয়ে মেজে পরিষ্কার করে মরনি, ফলে এখনও ঝকঝক করে। পুরানা মনে হয় না।
চকিতে শুয়ে আনমনা চোখে কুপির দিকে তাকিয়ে আছে মজনু। মাঝারি ধরনের পাটাতন ঘরের পুরাটা আলোকিত হয়নি একখান কুপির আলোয়। অর্ধেকের কিছু বেশি হয়েছে। বাকিটা আবছা মতন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে পা ছড়িয়ে বসে পান চাবাচ্ছে মরনি। খানিক আগে মজনুকে খাইয়ে নিজেও খেয়েছে রাতের ভাত, তারপর টুকটাক কাজ সেরে পান মুখে দিয়ে বসেছে। এখন কিছুটা সময় উদাস হয়ে বসে পান চাবাবে। গত চারমাসে চুপচাপ বসে পান খাওয়ার এই অভ্যাসটা হয়েছে তার। পান সে আগেও খেত তবে চুপচাপ থাকত না। মজনু ছিল, সারাদিনের জমে থাকা সবকথা খালা বোনপোয় এসময় বলত। চারমাস ধরে মজনু বাড়িতে নাই, কথা সে কার সঙ্গে বলবে! তবে মজনু বাড়িতে আসার পর এসময় চুপচাপ থাকা হয় না তার। আজ হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেই মজনু আনমনা হয়ে আছে। ভাত খাওয়ার সময় তেমন কোনও কথা বলল না। খেয়েই চকিতে শুয়ে পড়ল। এখন উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে কুপির দিকে।
পান চাবাতে চাবাতে মজনুর দিকে তাকাল মরনি। ঘুমাইছস নি বাজান?
মজনু নরম গলায় বলল, না।
তয় চুপ কইরা রইছস ক্যা? কথাবার্তি ক।
সড়কের সেই লোকটার কথা মনে পড়ল মজনুর। সে একটু উত্তেজিত হল। চঞ্চল ভঙ্গিতে উঠে বসল। আরে তোমারে তো একখানা কথা কই নাই খালা। নূরজাহানের লগে সড়ক দেকতে গেছিলাম। ওহেনে কনটেকদারের ছাপড়া ঘরের সামনে একজন মাইনষের লগে দেহা অইলো।
মরনি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কার লগে?
চিনি না।
তয়?
ঘটনাডা হোনো। বলেই লোকটা কেমন করে তার দিকে তাকিয়েছিল, কী কী কথা জিজ্ঞাসা করল সব বলল মজনু। চলে আসার সময়ও যে তাকে যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়েছিল লোকটা, মজনুর বুকের ভিতর কেমন করছিল এবং সেও যে বার বার ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল, সব বলল। শুনে পান চাবাতে ভুলে গেল মরনি। চিন্তিত গলায় বলল, বাড়ি কই?
কামারগাও।
কামারগাও শুনে বুকটা ধ্বক করে উঠল মরনির। দিশাহারা গলায় বলল, কামারগাও?
হ অমুনঐত্তো হোনলাম।
তর লগে কথা কইলো আর তুই ঠিক মতন হুনলি না?
আমার লগে কয় নাই। কনটেকদারের লগে কইতাছিল, আমি দূর থিকা হুনছি।
তয় তর লগে বলে কথা কইলো? তুই জিগাচ নাই বাড়ি কই?
না।
নাম জিগাইছস? নাম কী?
আমি তারে কিছুই জিগাই নাই। সে আমারে দুইখান কথা জিগাইছে। রাইত অইয়া যায় দেইক্কা নূরজাহান আমারে টাইন্না লইয়াছে।
দেখতে কেমুন?
ভাল না! কাহিল।
বয়স কত?
গাছি মামার লাহান। মোখে দাঁড়িমোচ আছে। চুল আর দাঁড়িমোচে পাকনও ধরছে। খয়রি রঙ্গের চাইর গায়দা রইছে। মুখহান দেইক্কা আমার কেমুন জানি মায়া লাগলো।
মরনি চিন্তিত গলায় বলল, এহেনে আইছে কীর লেইগা?
মাডি কাটতে।
লগে লগে বুক হালকা হয়ে গেল মরনির। যা অনুমান করেছিল তা না। সেই মানুষের মাটি কাটতে আসবার কথা না। অবস্থা ভাল তার। সচ্ছল গিরস্থ। সে কেন আসবে মাটিয়াল হতে! এটা অন্য কেউ।
প্রশান্ত মুখে আবার পান চাবাতে লাগল মরনি।
মজনু বলল, মানুষটা কে অইতে পারে কও তো খালা? এমুন কইরা চাইয়া রইলো আমার মিহি!
মরনি নির্বিকার গলায় বলল, কী জানি?
আমগো আততিয় স্বজন না তো?
কেমতে কমু? না মনে অয়। আমগো অমুন আততিয় নাই।
তারপরই চিন্তিত গলায় মজনু বলল, ও খালা, আমগ বাড়ি কামারগাও না?
কথাটা যেন বুঝতে পারল না মরনি। থতমত খেয়ে বলল, কী কইলি?
কইলাম আমার বাপ চাচারা থাকে না কামারগাওয়ে?
মরনি গম্ভীর গলায় বলল, হ থাকে। তয় তর বাড়ি কামারগাও না। তর বাড়ি এইডা। তর ঘর এইডা। তরে যে জন্ম দিছে তার বাড়ি কামারগাও।
তারপর মন খারাপ করা গলায় বলল, মাইনষের নিয়মঐ এইডা, জন্মদাতারে বহুত বড় মনে করে তারা। যেই বাপে আহুজ ঘর থিকা ঠ্যাং ধইরা ফিক্কা হালায় দেয় পোলারে, জীবনে পোলার মিহি ফিরা চায় না, পোলার খবর লয় না, চিনে না, পোলার খাওন পরন দেয় না, একদিন হেই পোলায়ঐ বাপ বাপ কইরা পাগল অইয়া যায়।
খালার কথার ভিতরকার অর্থটা বুঝল মজনু। বুঝে হাসল। আমি কইলাম বাপ বাপ কইরা পাগল অই না। আমার কাছে জন্মদাতা বড় না, বড় তুমি, যে আমারে বাচাইয়া রাখছে, পাইল্লা বড় করতাছে। আমি বাপ বুঝি না, বুঝি তোমারে।
কথা শেষ করার পর কেন যে আবার সেই লোকটার কথা মনে পড়ল মজনুর! কেন যে সেই লোকটার মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে! আর বুকের ভিতর কেন যে হল আশ্চর্য এক অনুভূতি, মজনু বুঝতে পারল না।
