একদিকে বাপ আরেকদিকে মেয়ে, এক নৌকায় বসা দুইজন মানুষ দুইরকম আনন্দ নিয়া বাড়ির দিকে ফিরছে। শ্রাবণদিনের সূর্য তখন গুটিয়ে নিচ্ছে তার আলো। দিনভর বিষয়কর্মে ব্যস্ত থাকা পাখিরা দিনশেষের আলো পাখায় ভেঙে ফিরছে যে যার গাছে। দূরের বিলপ্রান্তর থেকে ধীরে ধীরে আগাচ্ছে কুয়াশার মতন অন্ধকার।
৩.৩ নিঝুম হয়ে বৃষ্টি
সন্ধ্যার পর পরই নিঝুম হয়ে বৃষ্টি নেমেছে।
শ্রাবণ মাসের কায়কারবারই এমন। এই রোদ, এই বৃষ্টি। মরনিবুজির বাড়ি থেকে শেষ বিকালে যখন বাপ মেয়ে ফিরছে তখন কী সুন্দর আকাশ। দবিরের বুকে চেপে চাপা পাথর নেমে গিয়া বুকটা যেমন হালকা ফুরফুরা হয়েছে ঠিক তেমন একখান হাওয়া আসছিল পদ্মার দিক থেকে। কলুই ফুলের মতন নীল আকাশের তলা দিয়া ভেসে যাচ্ছে বাদাম দেওয়া নৌকার মতন সাদা মেঘ। দেশগ্রাম ডুবে গেছে বর্ষার পানিতে। পাখপাখালির আহারের অভাব। পদ্মার ওপারকার চরের দিকে উড়ে যায় সব পাখি। ওদিকটায় উঁচু চরাভূমি, মানুষের ঘরবাড়ি আর বর্ষাকালীন শস্যের মাঠ। ওদিকটায় চরে দিনভর আধার খায় এই দিককার পাখি। বিকাল ফুরিয়ে চারদিক থেকে ঘনাতে থাকে অন্ধকার, পাখিরা দিনের কাজ শেষ করে পদ্মা পাড়ি দিয়া ফিরা আসে।
নূরজাহানকে নিয়া নিজের ছোট্ট কোষানাও বেয়ে ফিরা আসার সময় মাথার ওপর দিয়া এরকম কত পাখি ফিরতে দেখেছে দবির। দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাসও পড়েছে তার। আহা পাখিরা কত স্বাধীন, কত সহজ সরল জীবন পাখিদের। নিজের মতন বড় হয়, ডিমে তা দিয়া বাচ্চা ফুটায়। উড়তে শিখলেই অচেনা হয়ে যায় বাচ্চারা। যে যার নিজের আকাশে উড়ে যায়। পাখিদের সমাজে কোনও মান্নান মাওলানা নাই।
কোষানাওয়ের মাঝখানকার পাটাতনে হাসিহাসি মুখ নিয়া বসেছিল নূরজাহান। এতদিন পর বাড়ি থেকে বের হয়ে মন ভরে গেছে গভীর আনন্দে। কী সুন্দর রান্নাবান্না করল মরনিবুজির লগে বসে। খেতে ভারী স্বাদ হয়েছিল পোলাও মোরগ। একদম বাড়ির নতুন বউটির মতন সবাইকে খাওয়াল সে।
নূরজাহানের এই চেহারা আজকের আগে কখনও দেখে নাই দবির। মরনিবুজির বড়ঘরে ছনছায় বসে তামাক টানতে টানতে আড়চোখে নিজের মেয়েটিকে দেখে একদিকে যেমন ভাল লাগছিল অন্যদিকে বুক ফেটে যাচ্ছিল গভীর কষ্ট বেদনায়। মান্নান মাওলানা নামের বিশাল এক অজগর পা থেকে গলা তরি প্যাঁচ দিয়ে ধরেছে কিশোরী থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা মেয়েটিকে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও সেই প্যাঁচ ছাড়াতে পারছে না মেয়ে। দূর থেকে অসহায়ের মতন তাকিয়ে মেয়ের বাবা দেখছে তার বুকের ধন ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে ওই অজগর। নূরজাহান ধীরে ধীরে হজম হয়ে যাচ্ছে মান্নান মাওলানা নামের অজগরের পেটে।
কাল থেকে দবিরের মনের উপর দিয়া গেছে ভয়াবহ এক চাপ। এই চাপ সহ্য করা কঠিন কাজ। ল্যাংড়া বসিরের কথা শুনে, মাওয়ার বাজার থেকে এই এতটা পথ সঁতরে। আসতে যে কষ্ট হয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি কষ্টে রাতেরবেলা বারবার মনে হয়েছে এই বুঝি কলিজাটা ফেটে গেল তার। এই বুঝি মরে গেল সে।
একই ঘরে শুয়ে আছে তিনজন মানুষ। চৌকির ওপর মা-মেয়ে, মেঝেতে খড়নাড়ার দরিদ্র বিছানায় শুয়ে কাল রাতের আগেও কত শান্তিতে ঘুমিয়েছে দবির। এক বিকালেই সেই শান্তি উধাও হয়ে গিয়েছিল, কলিজা ফেটে মরণদশা হয়েছিল দবিরের। মাত্র কয়েক হাত দূরে শুয়ে যাকে নিয়া এই কাণ্ড সেই নূরজাহান আর তার মা হামিদা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। অজগর প্যাঁচ দিয়া ধরেছে যাকে সেও জানছে না কিছু, পাশে শোয়া মা-ও জানছে না কিছু। শুধু দবিরের কলিজা পুড়ছে।
আজ মরনিবুজির লগে কথা বলবার পর, তার কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়ার পর শরীর মন দুইটাই তাজা হয়ে উঠেছে দবিরের। বাড়ি ফিরা সন্ধ্যারাতেই খেয়ে নিয়েছে রাতের ভাত। যদিও ক্ষুধা তেমন ছিল না। দুপুরের ওরকম মোরগ পোলাও, তারপর মনের প্রশান্তি, এই অবস্থায় ক্ষুধা থাকে নাকি!
তবু নিজের দরিদ্র সংসারের ভাত আর টাকিমাছের লগে এলাইচ শাকের চচ্চড়ি, তিনজন মানুষ যখন খেতে বসেছে, সংসারের নতুন অতিথিটা এসে দাঁড়িয়েছিল খোলা দরজার সামনে, ছনছায়। একদৃষ্টে তিনজন মানুষের খাওয়া দেখছিল আর পুরপুর করে লেজ নাড়াচ্ছিল। তখনও বৃষ্টি থামে নাই। খেতে খেতেই নিজের মাছের কাঁটাটা, একটুখানি ভাত থেকে থেকেই কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল নূরজাহান। হাসিমাখা কণ্ঠে বলছিল, তর তো দেহি খালি খিদা আর খিদা। কী রে ভাদাইম্মা, তর কোনওদিন পেট ভরে না?
ভাদাইম্মা ঝাঁপিয়ে পড়ে নূরজাহানের ছুঁড়ে দেওয়া কাঁটাকোটা আর ভাতটুকু খেয়ে নিচ্ছিল। তারপর আবার আগের অবস্থা। বাইরে চাঁদের আলো ফুটবার কথা, একটু একটু ফুটছিল আবার ঢেকে যাচ্ছিল কালো মেঘে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে নূরজাহান উঠে গেছে চৌকিতে, হামিদা থালবাসন গুছিয়ে মাত্র বসেছে, বাইরে হঠাৎ করেই গভীর অন্ধকার, হঠাৎ করেই ঝমঝম বৃষ্টি টিনের চালে।
দবির তখন তামাক সাজাতে বসেছে।
টোফা থেকে একদলা তামাক নিয়া ঠেসে দিয়েছে কলকিতে। কার মাথায় কলকি বসিয়ে মালসা থেকে টিকা নিয়া চিমটা দিয়া ধরছে কুপির আগুনে। টিকা পুড়ে আগুন হলেই কলকিতে বসিয়ে টানতে শুরু করবে।
নূরজাহান ঘুমিয়ে পড়েছে কি না কে জানে! তার কোনও সাড়াশব্দ নাই।
