একপলক মজনুর দিকে তাকিয়েই পায়ের দিকে চোখ নামাল নূরজাহান। ক্যা, এমুন কইরা আমারে দেখছো ক্যা?
কইতে পারি না। দেখতে খালি মন চাইছে।
আথকা মন চাইলো ক্যা?
আথকা চায় নাই। মনে অয় আগে থিকাই চাইছে।
এবার রাগী মুখ করে মজনুর দিকে তাকাল নূরজাহান। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ইস, আগে থিকাই চাইছে। আগে থিকা চাইলে আমার খবর লও নাই ক্যা? আমার যে এতবড় বিপদ গেল, তুমি হেনো নাই? বাইত্তে তো ঠিকঐ আইছো, আমার খবর লইছো?
ওইডা ভুল অইয়া গেছে!
হ অহন ভুল অইয়া গেছে।
হাত বাড়িয়ে নূরজাহানের একটা হাত ধরল মজনু। এমুন ভুল আর কোনওদিন অইবো না।
মজনু হাত ধরার পর শরীরের ভিতরকার সেই অনুভূতি শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেল নূরজাহানের। শরীরের রক্ত যেন জোয়াইরা পানির মতন ছুটতে শুরু করল। চোখ মুখ হয়ে গেল নাড়ার আগুনের মতন উষ্ণ। দম বন্ধ হয়ে এল। ছটফটা ভঙ্গিতে হাতটা ছাড়িয়ে নিল সে।
মজনু একটু লজ্জা পেল।
হাত ছাড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করবার চেষ্টা করল নূরজাহান। মজনুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ওমুন ভুল করনের সুযুগ তুমি আর পাইবা কই মজনুদাদা? ওই বান্দরডার মুখে কি আমি আর কোনওদিন ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিমু?
মজনু হাসল। না হেইডা না। আমি কইতে চাইলাম অহন থিকা যহনঐ বাইত্তে আমু, যেদিন আমু হেদিন তর লগে গিয়া দেখা করুম। তর লেইগা সুনু পাউডার কিন্না আনুম, লিবিস্টিক কিন্না আনুম। সদরঘাটে সোন্দর সোন্দর চুড়ি পাওয়া যায়, চুড়ি কিন্না আনুম।
শাড়ি আনবা না?
বলেই সেই খিলখিল হাসি।
নূরজাহানকে হাসতে দেখে মজনুও হাসল। আনুম, শাড়িও একদিন আনুম। খলিফা কামে বেতন অইছে আমার। দিনে দিনে বেতন আরও বাড়বে। তহন শাড়িও তর লেইগা আনুম। তারবাদে বেতনে খলিফা কাম আর করুম না। খালায় কইছে খেতখোলা বেইচ্চা টেকা দিব আমারে। সদরঘাটে আমি খলিফা দোকান দিমু। এক দোকান থিকা তিনদোকান অইবো। দশ-পোনরোজন কর্মচারী অইবো দোকানে। তহন আমি মিশিনে বমু না। আমি হমু টেইলাইর মাস্টার। গলায় ঝুলবো কাঁপোড় মাপনের ফিতা। আমি খালি কাঁপোড় কাইট্টা দিমু। কর্মচারীরা হেই কাঁপোড় সিলাইয়া কাস্টমারের শাট বানাইবো, ফুলপেন বানাইবো। পায়জামা পাঞ্জাবি বানাইবো। মাইয়াগো ছেলোয়ার কামিজ ফরক সব বানাইবো। দিনে। দিনে খলিফা হিসাবে বিরাট নাম অইবো আমার। বিরাট ধনী অইয়া যামু আমি।
কথা বলতে বলতে গলার স্বর বদলে গেছে মজনুর, চোখ গেছে স্বপ্নময় হয়ে। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহানও যেন দেখতে পেল মজনুর দেখা স্বপ্ন। আগের লাজলজ্জা উধাও হয়ে গেল। মুগ্ধচোখে মজনুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মজনুও তাকাল নূরজাহানের দিকে। স্নিগ্ধগলায় বলল, তহন তরে মাসে মাসে শাড়ি কিন্না দিমু।
নূরজাহান হাসল। আমারে তুমি পাইবা কই? আমি কি তোমার লেইগা বইয়া থাকুম? আমার বিয়া অইবো না? জামাই বাড়িত যামু না আমি?
না।
কী?
জামাই বাড়ি তুই যাবি না।
আমার বিয়া অইবো না?
অইবো!
তয়?
মজনু কথা বলল না।
মজনুর চোখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহান বলল, তয় কি তোমগো বাড়িডাই আমার জামাই বাড়ি অইবো? তুমি আমারে বিয়া করবা? এর লেইগাই শাড়ি কিন্না দেওনের কথা কইতাছো? তয় এত ঘুরাইয়া প্যাঁচাইয়া কথা কও ক্যা? ওই যে হেই রকম,
আসল কথার ধারে নাই
লও পুকুরপারে যাই।
কথাগুলি বলার পর নূরজাহানের মনে হল আগের সেই লাজলজ্জা যেন নাই তার। যেন মজনুর লগে অনেকদিন হল তার বিয়া হয়ে গেছে। সে যেন মজনুর অনেক দিনকার পুরানা বউ। পুরানা বউদের জামাইর কাছে যেমন লজ্জা শরম থাকে না, তারও যেন হয়েছে সেই অবস্থা।
তবে মজনু খুব লজ্জা পাচ্ছে। নূরজাহানের মুখে ওইসব কথা শুনে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। কথা তো বলতেই পারছে না, নূরজাহানের দিকে তাকাতেও পারছে না। লাজুক মুখ করে চকের দিকে তাকিয়ে আছে।
এসময় মজনুদের সীমানা থেকে দবিরগাছির গলা ভেসে এল। নূরজাহান, ও নূরজাহান। কই গো মা? বিয়াল হইয়া গেছে, লও বাইত্তে যাই।
বাবার গলা শুনে মজনুকে একটা ধাক্কা দিল নূরজাহান। কী কইতে চাইলা হেই কথা আর কইলা না মজনুদাদা। অহন কইলেও আমার আর হোননের টাইম নাই। বাবায় ডাকতাছে। আমি গেলাম।
মজনু স্নিগ্ধ হাসিমাখা গলায় বলল, যা কওনের আমি কইলাম তরে কইয়া হালাইছি। যা না কইছি হেইডা তুই বুইজ্জা লইছ।
ঘোড়ার আন্ডা বুজুম।
বলেই মজনুদের সীমানার দিকে দৌড় দিল নূরজাহান।
মজনু বলল, একখান কথা হুইন্না যা নূরজাহান। আগে তুই আমারে আপনে কইরা কইতি। আইজ তুমি কইরা কইছস। আমি বহুত খুশি অইছি।
নূরজাহান কথা বলল না। হেসে দৌড় দিল।
বাড়ি ফিরার সময় শরীর আর মনের অনেক ভিতর থেকে গভীর একটা আনন্দ ফেটে বের হতে চাইছিল নূরজাহানের। পাছার চারটে বসে বইঠা বাইছে দবির। বইঠার চাড়ে চাড়ে আগাচ্ছে কোষানাও। পদ্মার দিক থেকে আসছে বিকালবেলার হাওয়া। পানির যেখানে ঘাস আর জলজ আগাছা নাই, স্বচ্ছ পানি যেখানে, সেই পানিতে হাওয়ায় হাওয়ায় উঠছে মৃদু ঢেউ। গৃহস্থ বাড়ির গাছপালা আর বর্ষার পানিতে মাথা উঁচু ঘাস আগাছা, ধইনচাখেত উথাল পাথাল করছে পদ্মানদীর পাগল হাওয়ায়।
নূরজাহানের মন যেমন ফেটে পড়তে চাইছে গভীর আনন্দে, মজনুর মুখখানি যেমন লেগে আছে চোখে আর তার স্বপ্নমাখা কথা যেমন তোলপাড় করছে হৃদয়ে ঠিক এরকম না হলেও অন্যরকম এক আনন্দ খেলা করছে দবির গাছির মনে। মরনিবুজি পথ দেখিয়ে দিয়েছে। মেন্দাবাড়ির দেলরাবুজির কাছে গিয়া সবকথা খুলে বললে দেলরাবুজি বলবেন এনামুলকে। এনামুল বলবে মান্নান মাওলানাকে। তা হলে মিটে গেল সব। বেঁচে গেল নুরজাহান।
