মজনুর পিছন পিছন মন্নাফ হাওলাদারের সীমানায় এল নূরজাহান। ঘরগুলি ভেঙে নিয়ে গেছে তবে মাটির উঁচু ভিটি এখনও রয়ে গেছে। খামের গর্তটর্ত রয়ে গেছে। চার-পাঁচখান ঘর ছিল গায়ে গা লাগিয়ে। উঁচু ভিটিগুলির ফাঁকে ফাঁকে সরু রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়া উত্তর দিককার বাড়ির ঘাট বরাবর এসে দাঁড়াল ওরা। বিকাল প্রায় হয়ে গেছে। এদিকটায় দাঁড়ালে মুখ বরাবর ছোট মেন্দাবাড়ি। এই বাড়িটাকে পুরানবাড়িও বলে। পুরানবাড়ি ছাড়িয়ে ছেউলার বাড়ি। সেই বাড়ির গা ঘেঁষে মাওয়ার দিক থেকে হালট এসে মিশেছে। খাইগোবাড়িতে।
হালট এখন ডুবে আছে পানিতে। পুরানবাড়ির তালগাছটায় অজস্র বাবুই পাখির বাসা। পাখিগুলি সারাদিন ওড়াউড়ি করে গাছটার মাথায়। এখনও করছে।
নূরজাহান সেই গাছটার দিকে তাকাল। আর সেই ফাঁকে একেবারেই বড়দের কায়দায় প্রথমে দুই ঠোঁটের মাঝখানে সিগ্রেট গুঁজল মজনু, হাওয়া বাতাস কিছু নাই তাও ম্যাচের কাঠি জ্বেলে দুইহাতে হাওয়া বাঁচিয়ে একেবারে পাকা সিগ্রেটখোরদের ভঙ্গিতে সিগ্রেট ধরাল। বড় করে সিগ্রেটে টান দিল। নাকমুখ দিয়া গলগল করে ধুমা ছাড়ল।
নূরজাহান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে মজনুর দিকে। জীবনে কাউকে সিগ্রেট ধরাতে দেখে, সিগ্রেট খেতে দেখে এত ভাল লাগে নাই তার।
সিগ্রেটে আরেকটা টান দিয়া মজনু বলল, তর লগে আমার অনেক কথা আছে নূরজাহান।
মুগ্ধচোখে মজনুর দিকে তাকিয়েই আছে নূরজাহান।
চোখ ফিরাতেই পারছে না। মজনুর সিগ্রেট ধরানো, সিগ্রেটে টান দিয়া নাকমুখ দিয়া ধুমা ছাড়া, সবকিছু এত ভাল লাগছে! কথা যেন কানেই গেল না।
মজনুর মুখে একটুখানি রোদ পড়েছে। ফরসা সুন্দর মুখ সেই রোদে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, শার্ট লুঙ্গি পরা হঠাৎ করে বড় হয়ে যাওয়া ছেলেটিকে আজকের আগে এত ভাল কোনওদিনও লাগে নাই। আগে কাছাকাছি এলে গা থেকে আসত বাচ্চাছেলের গন্ধ। আজ আসছে পুরুষ পুরুষ গন্ধ। এই গন্ধে ভিতরে ভিতরে দিশাহারা হচ্ছে নূরজাহান। শরীরের অনেক ভিতরে কোথায় যেন কী একটা ঘটছে।
নূরজাহান আনমনা গলায় বলল, তুমি কী জানি কইলা?
মজনু চকের দিকে তাকিয়ে বলল, কইলাম, তর লগে আমার কথা আছে।
কী কথা?
কইলে তুই আবার চেইত্তা যাবি না তো?
নূরজাহান চোখ পাকাল। অসব্য কথা কইলে চেতুম।
মজনু সিগ্রেটে টান দিল। পুরো ছেমড়ি। আমি তর লগে কোনওদিন অসব্য কথা কইছি?
না।
তয়?
আইজ যুদি কও?
ক্যান তর মনে অইলো আমি অসব্য কথা কমু? আমি কি ওই পদের পোলা?
আগে ওইপদের আছিলা না। অহন টাউনে থাকো, ডাঙ্গর অইছো, অহন কইতে পারো।
মজনু হাসল। না। ডাঙ্গর অইলেও অসব্য অই নাই। তয় খলিফা দোকানে কাম করা ছেমড়ারা ইকটু অসব্য অয়। নানান পদের কথাবার্তা কয়, নানান পদের অসব্য কামকাইজ করে। আমি ওই পদের না।
মুখের মিষ্টি একটা ভঙ্গি করল নূরজাহান। হেইডা আমি জানি।
তয় কইলি ক্যা?
কইয়া দেখলাম তুমি কী কও।
তুই বহুত চালাক।
মজনু আবার সিগ্রেটে টান দিল। চকের দিকে ধুমা ছাড়ল।
আজ আকাশের কোথাও মেঘ নাই। নীল সাদার মিশেল দেওয়া আকাশ রোদে ভেসে যাচ্ছে। বাতাস আসছে এদিক ওদিক থেকে। চকেমাঠে কোথাও কোনও মানুষ নাই। বিলেরবাড়ির ওদিক দিয়া দক্ষিণ থেকে উত্তরে যায় বাদাম দেওয়া একটা নৌকা। চারদিক নিথর, নিস্তব্ধ। এই নিস্তব্ধতার মধ্যে কোথায় যেন একটা কাক ডাকে। পুরানবাড়ির তালগাছে ওড়াউড়ি করছে বাবুইপাখিরা। মৃদু হাওয়ায় দুলছে তাদের বাসা।
মজনুর পেটের কাছটায় মৃদু একটা ধাক্কা দিল নূরজাহান। কী অইলো? কী কইবা কও না ক্যা?
নূরজাহানের দিকে মুখ ফিরালো মজনু। কইতে ডর করে!
ডর করে?
হ।
ক্যা?
কথার মইদ্যে ডর আছে।
আমি তোমার কথা কিছুই বুজতাছি না।
মজনু সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, কেমতে যে তরে বুজাই।
তারপর আনমনা হয়ে কী ভাবল। হাতের সিগ্রেট কোন ফাঁকে গোড়ার দিকে চলে আসছে। ফুক ফুক করে শেষ দুটা টান সিগ্রেটে সে দিল। টোকা মেরে বাড়ির নামার দিককার পানিতে সিগ্রেটের গোড়া ফেলে কীরকম চটপটা হয়ে গেল। নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই অনেক বড় অইয়া গেছছ নূরজাহান। অনেক সোন্দর অইয়া গেছছ।
একটু যেন লজ্জা পেল নূরজাহান। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল, যাহ্।
হ। তরে আইজ খুব ভাল্লাগলো।
এই কথাই কইতে চাইতাছিলা?
না আরও কথা আছে।
কইয়া হালাও।
তরে খুব ভাল্লাগে।
একবার তো কইলা।
হ কইছি। এই এক কথা মনে অইতাছে অনেকবার কই। বারে বারে কই।
মজনুর মুখের দিকে তাকাতে চাইল নূরজাহান, পারল না। আশ্চর্য এক লজ্জা পেয়ে বসেছে তাকে। খানিক আগে শরীরের অনেক ভিতরে নতুন ধরনের অনুভূতি টের পাচ্ছিল, সেই অচেনা অনুভূতি আবার আচ্ছন্ন করল তাকে। পায়ের বুড়া আঙুলে মাটি খুঁটতে লাগল সে।
মজনু বলল, তর মুখোন বহুত সোন্দর। চক্ষু দুইখান সোন্দর। মাথার চুল অনেক ঘন, অনেক লম্বা। তুই যখন হাসতেছিলি, আমার মনে অইলো সেই হাসিতে শাওন মাসের গরম কইম্মা যাইতাছে। আমার মনডা কেমুন জানি কইরা উঠলো তরে হাসতে দেইখা। তখন আমগো বাড়ির উপরে দিয়া মেঘের একখান টুকরা ভাইসা যাইতাছিল, বাড়িডা। আন্ধার অইয়া যাইতাছিল। তর হাসিতে সেই আন্ধার কাইট্টা গেল। চাইরমিহি (চারদিক) ফকফক কইরা উঠলো। তুই আমগো বাইত্তে আহনের পর থিকা আড়চোখে আমি খালি তরে দেখছি। খালার লগে বইয়া তুই মোরগ পোলাও রানলি, বাইড়া বুইড়া খাওয়াইলি। খালায় আর গাছিমামায় যাতে না দেখতে পায় এমুন কইরা আমি খালি তরে দেখছি।
