কাইজ্জা লাগবো ক্যা?
তুমি জানো না আমি কীর লেইগা বাইত থিকা বাইর অই না?
জানি।
তয়?
তয় কী?
তুমি আমারে দেকতে যাও নাই ক্যা? আমগো বাড়ি তুমি চিনো না?
আরে আমি তো থাকি ঢাকায়।
তুমি যে ঢাকায় থাকো হেইডা আমি জানি না?
জানবি না ক্যা?
এত কিছু জাননের পর তুমি আমারে দেকতে যাও নাই ক্যা, হেইডা কও।
ক্যান যে যাই নাই, কইতে পারি না।
নূরজাহান ঠোঁট উলটে, মুখ ভেংচে বলল, ইস ঢং। ক্যান যাই নাই কইতে পারি না।
মজনু হাসল। তোর মুখ ভেঙ্গানি আমার খুব ভাল্লাগে। খাড়া, আমারে আবডাল কইরা খাড়া।
আমগাছতলায় এসে প্রথমেই এই কথাটা বলেছিল মজনু। শুনেই খিলখিল হাসি শুরু হয়েছিল নূরজাহানের। সেই হাসির অর্থ না বুঝে, কারণ জানতে না চেয়ে মুগ্ধ হয়েছিল মজনু। এখন অনেকক্ষণ পর আবার সেই কথাটা বলল।
এবারও হাসল নূরজাহান, তবে আগের মতন খিলখিল শব্দটা করল না।
মজনু বলল, আমার এই কথাডা হোনলেঐ তুই হাছস ক্যা? বিষয়ডা কী?
নূরজাহান হাসতে হাসতে বলল, তুমি কি মাইয়াছেইলা যে তোমারে আবডাল কইরা খাড়ামু?
আমি তোর কথাডা বোজলামঐ না।
আবডাল করতে কয় তো মাইয়াছেইলারে।
মজনু তবু কথাটা বুঝল না। হাঁ করে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মজনুর এই ভঙ্গি দেখে নূরজাহান আবার হাসল। এমুন ভ্যাবলার লাহান চাইয়া রইলা ক্যা? মুখহান হাঁ হইয়া রইছে। ওই যে দেহো ভোমা ভোমা মাছি উড়তাছে। এই হগল মাছি থাকে পায়খানায়। মুখ বন্ধ করো নাইলে মুখে হাইন্দা যাইবো।
বলেই আবার খিলখিল হাসি।
মজনু মুখ বন্ধ করল। তয় তুই যে কী কইতাছস কিছুই আমি বুজতাছি না।
আরে ভোলা (বোকা), তোমারে আবডাল কইরা খাড়াইতে কইছো ওইডা হুইন্না হাসতাছি।
এইডা হুইন্না হাসনের কী অইলো?
কইলাম না আবডাল করতে কয় মাইয়াছেইলারে। তুমি তো আর মাইয়াছেইলা না।
এই কথাড়াই আমি বুজি নাই।
এবার আর হাসল না নূরজাহান। তবে হাসিটা চেপে রাখল। মাইয়াছেইলারা আবডালে বইয়া ওইকাম করে। তুমি কি ওইকাম করবা?
ওইকাম আবার কোন কাম?
তুমি আসলেই একহান ভোলা। আরে পেশাব করে, পেশাব। তুমি কি এহেনে পেশাব করবা? এর লেইগা আমি তোমারে আবডাল কইরা খাড়ামু?
মজনু খুবই লজ্জা পেল। যাহ। তর সামনে আমি পেশাব করুম নি? পেশাব চাপলে আমি অন্য কোনও মিহি গিয়া কইরা আমু। তরে বুজতেও দিমু না।
তয় আমারে আবডাল কইরা খাড়াইতে কইলা ক্যা?
সিকরেট খামু?
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। বলল, কী খাইবা?
সিকরেট, সিকরেট।
নূরজাহান আকাশ থেকে পড়ল। তুমি সিকরেট খাও?
হ খাই তো।
কবে থিকা?
বেশিদিন অয় নাই। দশ-পোনরো দিন অইবো। তয় বেশি খাই না। দিনে তিনডা খাই। বিয়ানে নাস্তা করনের পর একহান, দোফরে ভাত খাওনের পর একহান আর রাইত্রে ভাত খাওনের পর একহান।
হিগলা কই?
খলিফা দোকানে যারা কাম করে তারা বেবাকতেই সিকরেট খায়। তাগো দেহাদেহি হিগছি।
আইজ বিয়ানে খাইছো?
হ খাইছি।
আম্মায় দেহে নাই?
হেয় কেমতে দেকবো? নাস্তা খাইয়া নুরামামাগো ওইমিহি গেছি গা। চুপ্পে চুপ্পে খাইছি। অহন বিরাট নিশা ধরছে। অহন এহেনে খাড়াইয়াঐ খাইতে চাইতাছি। ওই যে দেখ ঘরে খালায় আর গাছিমামায় পান তামুক খাইতাছে। তারা যাতে আতকা দেইখা না হালায় এর লেইগা তরে কইলাম আমারে আবডাল কইরা খাড়াইতে।
আরে আমি তো এইডা বুজি নাই। আমি বুজছি তুমি পেশাব করবা।
ধুরো পাগল।
তয় ধরাও সিকরেট। আমি তোমারে আবডাল কইরা খাড়োই।
মজনুকে আড়াল করে দাঁড়াল নূরজাহান। মজনুর পরনে লুঙ্গি আর ফুলহাতা চেকের শার্ট। শার্টের হাতা কনুয়ের অনেকখানি উপরে, একেবারে বগল তরি গুটানো। বাঁহাতের ওরকম ভাঁজের ভিতর থেকে প্রায় চেপটে যাওয়া একটা সিগ্রেট বের করল সে। ডানহাতের ভাজ থেকে বের করল ম্যাচ।
এরকম জায়গায় সিগ্রেট ম্যাচ রাখা যায় কল্পনাও করে নাই নূরজাহান। সে খুবই অবাক হল। এহেনে ম্যাচ সিকরেট রাখছো ক্যা?
তয় কই রাখুম?
শাডের জেব আছে, জেবে রাখতে দোষ কী?
খালায় দেইক্কা হালাইবো।
বুজছি। তয় আমি তোমারে যত আবডাল কইরাঐ খাড়োই তাও কইলাম আমার বাপে আর তোমার খালায় বুইজ্জা যাইবো তুমি বিড়ি সিকরেট খাইতাছো।
কেমতে বুজবো?
ওই যে আগে একবার কইলাম না তুমি অইলা ভোন্দা। আসলেই তুমি ভোন্দা।
মজনু বোকার মতন হাসল। এইবার বুজছি।
তুমি বুজছো ঘোড়ার আন্ডা।
ঘোড়ার আন্ডা না, আসলডাই বুজছি।
কী বুজছো কও তো?
এহেনে খাড়াইয়া সিকরেট ধরাইলে সিকরেটের ধুমা ওই ঘর থিকাও দেহা যাইবো। খালায় আর দবিরমামায় বুইজ্জা যাইবো আমি বিড়ি সিকরেট খাইতাছি।
এইত্তো বুজছো।
তয় ল, অন্য মিহি যাই।
কোন মিহি যাইবা?
উত্তর মিহি যাই। রহমান মামাগো ওই মিহি অহন কেঐ থাকবো না। মন্নাফ মামারা ঘর দুয়ার ভাইঙ্গা চন্দ্রের বাইত্তে গেছে গা। তাগো সীমানা পুরা খালি। ওই মিহি গিয়া সিকরেট টানি আর তর লগে কথা কই।
কী কথা কইবা আমার লগে?
বহুত কথা আছে।
তয় লও।
ওরা তারপর মন্নাফ হাওলাদারদের সীমানায় এল। এদিকটা একেবারেই ফাঁকা পড়ে আছে। চার শরিকের বাড়ির এই এক শরিক বড় বাড়ি কিনেছে ওই তো বহ্নিছাড়ার পুবপাশে। ঘর দুয়ার ভাইঙ্গা নিয়া তুলছে ওই বাড়িতে। ছেলেরা কেউ থাকে জাপানে কেউ আমেরিকায়। নতুন বাড়িতে বিশাল দোতালা ঘর তুলেছে। তিনখান পাটাতন ঘর, চাপকল, বিরাট উঠান বাড়িতে। সব মিলিয়ে এলাহি কারবার। টাকার শক্তি বেড়ে গেলে যা হয় আর কী। দেশে যে ছেলেরা আছে তারাও কেউ ইসলামপুরে কাপড়ের কারবার করে, কেউ করে রমনা ভবনে। গাউছিয়া মার্কেটে দোকান আছে একজনের। মন্নাফ হাওলাদার মেম্বার ছিলেন। মেম্বার সাবের এখন বিরাট অবস্থা।
