মরনি স্থির চোখে দবিরের দিকে তাকাল। আপনে ঘাবড়াইয়েন না দাদা। আমার কথা হোনেন।
দবিরও তাকাল মরনির দিকে। কও বুজি, কও।
আপনে দেলরা বুজির কাছে যান। দেলরা বুজির বইনপোয় মজ্জিদ (মসজিদ) বানাইতাছে মিয়াগো ছাড়াবাইত্তে। হেই মজ্জিদের ইমাম অইবো মান্নান মাওলানা।
হ এইডা পুরান কথা। এইডা জানি।
জানবেন না ক্যা? আমি যেইডা কই, হেইডা হোনেন। দেলরা বুজিরে গিয়া বেক কথা কন। তারা মানুষ ভাল। দেলরা বুজিরে বুঝাইয়া কইলে হেয় কইবোনে তার বইনপোরে। বইনপোয় যদি মাওলানা সাবরে কয়, হুজুর, এইসব বাদ দেন। নূরজাহানের মিহি চক্ষু তুইল্লা চাইয়েন না। নাতিনের বসসি মাইয়া আপনের বউ অইতে পারে না। বিয়া করতে অয় অন্য জাগায় করেন। তয় দেখবেন মান্নান মাওলানা থাইম্মা গেছে। আপনেরে আর কোনও বিপাকে হালানের চেষ্টা করবো না।
মরনির কথা শুনে বুকে চাপা পাথর অনেকখানিই নেমে গেল দবিরের। ফ্যাকাশে মুখ উজ্জ্বল হল। গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখে খেলে গেল শ্রাবণমাসের দুপুরবেলার রোদ। কাল সন্ধ্যার পর থেকে এই প্রথম আমুদে গলায় কথা বলল দবির। এইত্তো ভাল বুদ্ধি বাইর করছো বুজি। এইডা অইলো আসল বুদ্ধি। দেলরা বুজিরে ধরলেঐ কাম অইয়া যাইবো। আল্লাহ আল্লাহ, রহম করো আল্লাহ। রহম করো।
.
নূরজাহান এমন খিলখিল করে হাসছে, হাসিটা যে কী সুন্দর মেয়েটির, মজনু মুগ্ধ হয়ে গেল। কী বলেছিল সে-কথা ভুলে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে, মরনি আম্মার লগে হাত লাগিয়ে খাওয়াদাওয়ার পরের কাজকর্ম শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পশ্চিম-দক্ষিণ দিককার আমগাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে নূরজাহান। মজনু আগে থেকেই অলস ভঙ্গিতে ঘুরঘুর করছিল এই দিকটায়। দবির আর মরনি বসেছে পান তামাক নিয়া। আমগাছটার গোড়ার কাছে এসে স্থির হয়ে আছে বর্ষাকালের পানি। দুই-চারটা কুটাকাটা, আমের শুকনা পাতা পড়ে আছে পানিতে। কিছু ঘাস বিচালি আছে, সেচিশাকের ছোট্ট একটা চাক আছে। তারপর থেকে শুরু হয়েছে চক। চক মানে ধইনচাখেত। কোথাও কোথাও ফাঁকা জমি। সেইসব জমিতে মাথা তুলে আছে দল আড়ালি (এক প্রকারের ঘাস। গোরুছাগলের খাদ্য)। কচুরি আছে কোথাও কোথাও, খাইল্লা (কাশের চেয়ে মোটা এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ) জন্মেছে নিবিড় হয়ে। শুধু ধানটাই নাই কোথাও।
বর্ষাকালে আগে এই চক ভরা থাকত আমন আউশ ধান। পাটও থাকত। পাট চাষ তো দেশ থেকে উঠেই গেছে। আমন আউশের চাষও আজকাল আর হয় না। এখন হয় ইরি। আমন আউশের চেয়ে ফলন দুই-তিনগুণ বেশি। ইরি চাষে পড়তা ভাল। পড়তা ভাল পড়লে সেই চাষই তো করবে দেশগ্রামের গিরস্তে।
তাই করছে। ফলে বর্ষার আগে আগেই চক খালি। আগাছা কুগাছায় চক ভরে থাকে। গিরস্তরা সেইদিকে তাকিয়েও দেখে না।
আর বিক্রমপুর এলাকার সেই গরিবি দিন কি আর আছে? এখন বিক্রমপুর হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী এলাকা। টাকার আকাল নাই একেকজন মানুষের। কত গরিব মানুষ কুট্টি কুট্টি (কোটি কোটি) টেকার মালিক অইয়া গেছে। টেকার গরমে মাডিতে পাও পড়ে না। দশ টেকার ইলশামাছ পঞ্চাশ টেকা দিয়া কিনে। মাওয়ার বাজারে গিয়া গরিব মাইনষে আইজকাইল বাজারঐ করতে পারে না। টেকাআলারা বেবাক কিন্না লইয়া যায়। এই অবস্থায় খেতখোলায় ধান অইলো কী অইলো না ওই হগল লইয়া চিন্তা করে কেডা? বাইত্তে থাকে চউড়ারা। অরাঐ চাষবাস করে, ওরাঐ খায়। আর নাইলে দবিরের মতন দুই-চাইরজন গরিব গুরবা যারা আছে তাগো কাছে বর্গা দিয়া দেয়।
তয় হিসাবকিতাবের ব্যাপারে বিক্রমপুইরারা বিরাট ওস্তাদ। একহান পয়সাও এদিক ওদিক অইতে দিবো না।
চকের দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবছিল মজনু। নূরজাহান এসে তার সামনে দাঁড়াবার পর বলল, নূরজাহান, তুই আমারে আবডাল কইরা খাড়ো।
শুনে কথা নাই বার্তা নাই নূরজাহানের ওই খিলখিল হাসি। নূরজাহানকে হাসতে দেখে প্রথমে অবাক হয়েছে মজনু। কী রে, এমতে হাসতাছস ক্যা?
নূরজাহানের হাসি তবু থামে নাই। আর একটু যেন বেড়েছে। সেই হাসি দেখে কোন ফাঁকে যেন অবাক হওয়ার ভাব চলে গেছে মজনুর, সে গেছে মুগ্ধ হয়ে।
হাসলে এত সুন্দর দেখায় নূরজাহানকে? কই আজকের আগে তো কখনও নূরজাহানের হাসি এত সুন্দর লাগে নাই তার! নূরজাহান হঠাৎ করে বড় হয়ে গেছে। শ্যামলা মুখখানি আগের চেয়ে হয়েছে অনেক মিষ্টি। চিকনচাকন গড়নখানির দিকে তাকালে যে কারও ভাল লাগবে মেয়েটিকে। মাথার চুল ঘনকালো, লম্বা। ডাগর চোখের দিকে তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। মুখের দিকে তাকালে চোখ ফিরাতে ইচ্ছা করে না।
কবে এত সুন্দর হয়ে গেল নূরজাহান!
কোন ফাঁকে!
নূরজাহান হাসতে হাসতেই বলল, এমুন কইরা চাইয়া রইছো ক্যা?
নূরজাহানের হাসিতে যে মায়াজাল তৈরি হয়েছিল, যে ঘোর লেগেছিল মজনুর চোখে, সেই ঘোর একটু যেন কাটল। কোনওরকমে বলল, তরে দেকতাছি। তরে।
মুখের একটা মজাদার ভঙ্গি করল নূরজাহান। ইস আমারে দেখতাছে! আমারে কি আইজ পয়লা দেখলা তুমি?
আইজ মনে অইলো পয়লাই দেকলাম।
নূরজাহানের হাসি থামল। পয়লা না অইলেও বহুত দিন বাদে দেখলা।
হ। তুই তো অহন আর বাইত থিকাঐ বাইর অচ না।
একথায় নূরজাহান একেবারে মুখিয়ে উঠল। এই হগল প্যাচাইল উডাইলে অহন কইলাম কাইজ্জা লাগবে।
