দবির এসে বসেছে মুখামুখি। হাতে হুঁকা। মরনি মনে করেছে দবিরও বুঝি পানের আশায়ই আসছে। খাওয়াদাওয়ার পর পান তামাক দুইটাই একলগে খায় কোনও কোনও গিরস্তে। মুখে পান দিয়ে খানিক চাবায়া, পানের স্বাদ নিয়া টান দেয় তামাকে। দুইটা নেশা মিলেমিশে বেদম শান্তি তখন।
নিজে যে পানের অর্ধেকটা নিয়েছে সেই পানের বাকি অর্ধেক দবিরের জন্য মনে মনে ঠিক করে রেখেছে মরনি। দবির সামনে এসে বসার পর মাত্র জিজ্ঞাসা করবে, পান দিমুনি গাছিদাদা? তখনই দবিরের ওই কথা।
মরনি চোখ তুলে দবিরের দিকে তাকাল। পান চাবাতে চাবাতে জড়ানো গলায় বলল, কন।
তারপরই খেয়াল করল দবিরের মুখে দুশ্চিন্তা খেলা করছে। চোখ যেন একটু বেশি গর্তে ঢুকে গেছে। মুখটা টাকিমাছের পেটের মতন ফ্যাকাশে। আরে, দোফরের অনেক আগে বাপ মাইয়ায় আইলো এই বাইত্তে। তহন তো খ্যাল করি নাই গাছিদাদার মুখহান এমুন হুগনা হুগনা, চক্ষু দুইহান গদে হাইন্দা গেছে। খাইতে বহনের সময়ও তো দেহি নাই। এতক্ষুন ধইরা সামনে বইয়া পোলাও মোরগ খাইলো, তহন ক্যান গাছিদাদার এই মুখহান আমার চোক্ষে পড়ে নাই! এই মুখচোখ তো আথকা অয় নাই। আথকা এমুন মুখচোখ অয় না মাইনষের। এইরকম মুখচোখ অইতে সময় লাগে। তয় কি দুই একদিন আগে থিকাই কোনও চিন্তার মইধ্যে পড়ছে গাছিদাদায়?
কী চিন্তা?
কী হইছে গাছিদাদার?
দবিরকে পান সাধার কথা ভুলে গেল মরনি। এমনকী নিজের মুখে দেওয়া পান চাবাতে ভুলে গেল। কপালের চামড়ায় দুই-তিনটা ভাজ পড়ল তার। কোনওরকমে বলল, কী কথা গাছিদাদা? কী অইছে?
যে উত্তেজনা নিয়া কথা শুরু করেছিল দবির, নিজের ভিতর থেকেই সেই উত্তেজনা কিছুটা সামাল দিল। হুঁকায় কয়েকটা টান দিয়া নাকমুখ দিয়া ধুমা ছাড়তে ছাড়তে একেবারে অন্যদিক থেকে শুরু করল কথা। নূরজাহানের লেইগা একহান সমন্দ আইছে।
শুনে মরনি থতমত খেয়ে গেল। সমন্দ আইছে?
হ।
আরে এইডা তো ভালকথা। মাইয়া ডাঙ্গর অইছে, তার বিয়ার সমন্দ আইছে এইডা তো বিরাট আনন্দের কথা।
মরনি হাসিহাসি মুখে মুখের পানে কয়েকটা চাবান দিল। পানের রস গিলে অতি শান্তির গলায় বলল, এত আনন্দের কথা, আর আপনে কইলেন এমুন কইরা, য্যান বিরাট চিন্তার কিছু ঘইট্টা গেছে। মুখহান হুগাইয়া গেছে, চক্ষু হাইন্দা গেছে গদে। এমুন অইছে ক্যা গাছিদাদা? হ আমি এইডা বুজি, আপনে মাইয়াডারে জান দিয়া আদর করেন। মাইয়া অহনও তেমুন ডাঙ্গর হয় নাই। চৌদ্দ-পোনরো বছর বস। অহনঐ মাইয়ার সমন্দ আইছে, বিয়া অইয়া গেলে মাইয়া যাইবো গা জামাইবাড়ি, এই হগল ভাইব্বা আপনের চেহারা এমুন হুট্টা (শুকিয়ে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া) অইয়া গেছে।
দবির আবার হুঁকায় কয়েকটা টান দিল। হাতের তালু দিয়া টান দেওয়া জায়গাটা নিজের অজান্তেই মুছল। মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, না গো বইন, এর লেইগা চেহারা এমুন অয় নাই আমার। চিন্তার বিরাট কারণ আছে।
কী কারণ? পোলা পছন্দ অয় নাই? কোন গেরামের পোলা? করে কী? সমন্দ আনলো কে?
একলগে এতগুলি প্রশ্ন, কোনটার জবাব আগে দিবে দবির!
দবির আবার হুঁকায় টান দিল। খাওয়ার পর থেকে তামাক টানছে, কলকিতে তামাক পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। এখন টানে টানে শুধু তামাকের গন্ধ আসে, আর ধুমা। নেশা নাই। এই হুঁকা টানা না-টানা সমান।
হুঁকাটা বেড়ার লগে দাঁড় করিয়ে রাখল দবির। দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মরনি বুঝল কিছু একটা চিন্তার ঘটনা ঘটেছে।
কী?
ঘটনা কী?
যে আধখান পান দবিরকে দিবে ভেবেছিল সেই পানটুকু সাজিয়ে ফেলল মরনি। সুপারি খয়ের চুন পরিমাণ মতন দিয়া পানটা পুঁটলি করে দবিরের দিকে বাড়িয়ে দিল। নেন গাছিদাদা, পান খান। পান খাইতে খাইতে কন আমারে কী অইছে?
দবির পান নিয়া মুখে দিল। চাবাতে চাবাতে চিন্তিত চোখে উঠান ছাড়িয়ে আর একটু দূরের দিকে তাকাল। এখনও আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে নূরজাহান আর মজনু। আগের মতনই কথাবার্তা বলছে। কী কথায় নূরজাহান খিলখিল করে হাসছে! এই এতটা দূর থেকেও নূরজাহানের হাসির শব্দটা পেল দবির। সেই শব্দে বুকের খুব ভিতরে একটা দুঃখের হাওয়া কাঁপন ধরায়া দিয়া গেল। মান্নান মাওলানার ঘরে গেলে মাইয়াডা কি এই আমোদের হাসিডা জিন্দেগিতে আর কোনওদিন হাসতে পারবো? এই হাসি কি থাকবো মাইয়াডার?
মরনি বলল, কন গাছিদাদা, বেক কথা আমারে কন।
বাইরের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মরনির দিকে তাকাল দবির। হ আপনেরে কমু দেইক্কাই এই বাইত্তে আইছি। আমার তো আর কওনের মানুষ নাই। তয় বুজি, নূরজাহানের কানে য্যান কথা না যায়।
ক্যা, গেলে অসুবিদা কী? মাইয়া ডাঙ্গর অইছে, তার বিয়ার সমন্দ আইবো, এই কথা মাইয়ায় জানবো না? আইজকাইলকার মাইয়ারা কি আর আমগো মতন। আমগো সমায়ে মা-বাপে যেহেনে বিয়া ঠিক করছে ওহেনেই বিয়া অইছে। আমরা মুখ দিয়া আওজ দেই নাই। আইজকাইল কি আর হেইদিন আছে? মাইয়ারা তো নিজেগো পছন্দ অপছন্দের। কথাও সোজাসুজি মা-বাপরে কইয়া দেয়। জামাই পছন্দ অইলেও কয়, না অইলেও কয়।
এই সমন্দ বুজি ওই পদের না।
তয় কোন পদের?
মুখের পানে চাবান দিল দবির। ওই পদের সমন্দ অইলে তো মাইয়ার মা’রেই আমি কইতাম। মাইয়ার মায় কইতো মাইয়ারে। সমডা ওই পদের না।
