বাস্তবিকই বড়ঘরে ঢুকে সেই দৃশ্য দেখতে পেল দবির।
পাটাতনের উপর পুরানা একটা ছপ (মাদুর) বিছিয়েছে নূরজাহান। ছপের সামনে টিনের দুইখান সুন্দর থাল, অ্যালুমিনিয়ামের দুইখান গ্লাস। সে বসে আছে হাঁড়ি পাতিলের সামনে। সামনে পোলাওয়ের জন্য একটা বড়সাইজের গামলা, মোরগের জন্য মাঝারি সাইজের গামলা। পোলাও বাড়ার বড় চামচ রাখা আছে গামলায়, মোরগের গামলায়ও ওই মাপেরই আরেকটা চামচ। অর্থাৎ সবই রেডি। দবির আর মজনু ছপে এসে বসলেই হাঁড়ি থেকে খাবার বের করে সামনে দিবে। যে যার ইচ্ছা মতন তুলে খাবে। দরকার হলে সেও তুলে দিবে।
এই দৃশ্য দেখে সবচাইতে অবাক হয়েছিল মরনি।
ঘাটপারে গিয়া সেও নেমে গিয়েছিল পানিতে। অন্যান্যদিন একটু সময় নিয়া গোসল সারে। আজ আর সেই সময় হয় নাই। চার-পাঁচ ডুবে গোসল সেরে, চটপটা হাতে শাড়ি বদলেছে। ভিজা শাড়ি গামছা কোনওরকমে ঘাটপারে তক্তার উপর কয়েকটা খচা দিয়াই ধুইয়া ফালাইছে। উঠানের তারে সেই শাড়ি গামছা মেলে ঘরে ঢুকেই দেখে এই দৃশ্য। তার হাতের কাজ প্রায় সবই সেরে রেখেছে নূরজাহান। এখন হাড়ি পাতিলের সামনে বসে আছে। এমন ভঙ্গিতে যেন সেই বাড়ির গিন্নি।
লগে লগে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল মরনির। নূরজাহানের যদি বিয়া হয় তার মজনুর সঙ্গে তা হলে মজনু যখন বাড়ি আসবে তখনকার প্রতিটা দুপুর আর রাতের খাবারের দৃশ্যটা তো এমনই হবে।
মুখে এই অনুভূতির কথা আনা যায় না।
মরনি মুগ্ধগলায় বলল, আরে, আমার মায় দেহি বেবাক কামঐ আউন্নাইয়া রাখছে। তয় দুইহান থাল দিছো ক্যা মা? তুমি খাইবা না?
আমি আপনের লগে খামু আম্মা। তারা দুইজন আগে খাউক।
তয় ঠিক আছে মা। তয় কইড়া হালাও।
দবির আর মজনু আসনসিঁড়ি করে বসেছে ছপে। দুইজনেই অ্যালুমিনিয়ামের জগ থেকে সামান্য পানি নিয়া থাল ধুয়েছে। ধুয়ে থালের পানি দরজা দিয়া ছুঁড়ে ফেলেছে উঠানে। যদিও ধোয়া পরিষ্কার থাল, তবু গিরস্তবাড়ির লোক খেতে বসে এই কায়দায় থাল একবার ধোয়।
নূরজাহান যেন বহুবার করেছে এই কাজ এমন পাকা হাতে পোলাও মোরগ বেড়ে দিয়েছে। তুলে তুলে দিয়েছে দবির আর মজনুর পাতে। দবিরের চেয়ে মজনুর পাতে দিচ্ছিল বেশি। দেখে মরনি বলেছে, খালি মজনুরে দেছ ক্যা মা, তর বাপরেও দে।
বাবায় লইয়া খাইবো নে।
মজনু খুবই বুদ্ধিমান ছেলে। বলল, গাছিমামারে তুমি উঠাইয়া দেও খালা। নূরজাহান মনে অয় শরম পাইতাছে।
কীয়ের শরম।
অন্য বাইত্তে আইয়া হেই বাড়ির খাওনদাওন বাপের পাতে উঠাইয়া দিতে অর শরম করনের কথা।
হ বাজান এইডা ঠিকঐ কইছস।
দবিরের পাতে খাবার তারপর মরনিই তুলে দিয়েছে। একটু যেন বেশি বেশিই দিয়েছে। দবির নানারকম কাকুতি মিনতি করে তাকে থামিয়েছে। এত না বুজি, এত না। এত খাইতে পারুম না।
খান গাছিদাদা, খান।
দবির খাচ্ছিল ঠিকই তবে চোখের ভিতরে তার খেলা করছিল সেই স্বপ্ন। যদি এই বাড়ির বউ হত নূরজাহান! লগে লগে মনে পড়েছে সেই জালেমের কথা। মান্নান মাওলানা। বুকে চেপে থাকা ভারী পাথর নড়েচড়ে উঠেছে। গোপনে নষ্ট হয়েছে খাওয়ার রুচি। তবে রান্নাটা হয়েছিল চমৎকার। এত স্বাদের খাবার বহুকাল মুখে দেয় নাই দবির।
এই রান্না কি নূরজাহানের জন্য হয়েছে? সে হাত লাগিয়েছিল বলে? নাকি মরনি বুজির রান্নার গুণই এমন!
খাওয়াদাওয়া শেষ করে আবার তামাক নিয়া ছনছায় গিয়া বসছে দবির। মরনি আর নূরজাহান সেই ফাঁকে খেয়ে নিয়েছে। খাওয়ার পর গিরস্তবাড়ির বউঝিদের কিছু কাজ থাকে। ধোয়া পাকলার কাজ। মরনির লগে হাত লাগিয়ে সেই কাজ শেষ করেছে নূরজাহান। ঘাটপারে গিয়া সেই কাজ সেরে এই তো এখন ওই যে ওই, বাড়ির পশ্চিম দক্ষিণ দিককার আমগাছের তলায় গিয়া দাঁড়ায়া আছে। লগে আছে মজনু। দুইজনে হাসিমুখে গল্পগুজব করছে।
ঘরের ভিতর পানের ডাবর নিয়া বসেছে মরনি। এখন আর কোনও কাজ নাই। এখন আয়েশ করবার সময়। মরনিকে ওভাবে বসতে দেখে হুঁকা হাতে তার সামনে উঠে আসছে দবির। তারপর ওই কথা। বুজি গো, আপনেরে একহান কথা কইতে চাই।
ডাবরের ভিতর থেকে আধখান পান নিছে মরনি।
তিন-চারদিন আগে মাওয়ার বাজার থেকে দুইগন্ডা পান আনিয়েছিল। সেই পানের শেষ দুইখানা আছে। মজনু কাল বাজারে গেলে আবার দুইগন্ডা আনাবে। তবে ডাবরের ভিতর থাকতে থাকতে শেষদিকে এসে পানপাতা শুকিয়ে যায়। আগের মতন তাজা থাকে না। তবু স্বাদ কমে না পানের। সুপারি খয়ের চুন দিয়া, ভাত পানি খাওয়ার পর আধখান পান পুঁটলি করে মুখে দিলেই দুনিয়ার শান্তি। চাবাতে চাবাতে মনে হয়, আহা জিন্দেগিডা যুদি খালি পান মুখে দিয়া কাড়াইয়া দেওন যাইতো! পান চাবাইতে চাবাইতে মইরা যাইতে পারলে মরণডাও বড় শান্তির অইতো!
মরনি এখন ধীর শান্ত ভঙ্গিতে আধখান পানের উপর রেখেছে ছোরতা (সুপরি কাটার কাঁচির মতো এক ধরনের যন্ত্র) দিয়া কুচি কুচি করে কাটা এক চিমটি সুপারি। খয়েরটা নরমই ছিল। দিনে দিনে মুশুরি দানার মতন শক্ত হয়ে গেছে। ওরকম তিন-চারটা দানা সুপারির পাশে রাখল। একটুখানি চুন আঙুলের আগায় নিয়া মাখায়া দিল পানে। তারপর পুঁটলি করে মুখে দিল। আঙুলের আগায় আবার নিল একটুখানি চুন। এই চুন এখন আঙুলেই থাকবে। পান চাবাতে চাবাতে, থেকে থেকে একটুখানি জিভে ছোঁয়াবে। তাতে পানের স্বাদ আরও বাড়বে।
