মরনি অবাক হয়ে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে হুঁকা হাতে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে দবির। তার মাথায় কিছু ঢুকছেই না। তার মনে তখন অনেকগুলি প্রশ্ন। আমার মাইয়ায় এতকিছু হিগলো কবে? কার কাছে হিগলো? যেই মাইয়ায় কোনওদিন রান্নঘরে যায় না হেই মাইয়ায় এতকিছু জানলো কেমতে? অ্যাঁ?
মজনু বলল, আমার মনে অয় এই তরি যা যা কইছস বেবাকঐ ঠিক আছে। তয় বড় বড় দুইহান ভুল এরমইধ্যেঐ তুই কইরা হালাইছস নূরজাহান। ভুলডি অইলো…
মজনুর কথা শেষ হওয়ার আগেই নূরজাহান বলল, কোনও ভুল আমি করি নাই। তুমি তো নুনের কথা কইবা? নুন দিতে হয় পরে। যুদি গোস্ত খালি কইন্না খাইতে হয় তয় নুনডা মোশলা দেওনের লগে লগে দিলেঐ অয়। সুরাঅলা গোস্ত খাইলে নুন দিতে হয় পরে।
আর ওই যে গরম মোশলা?
এবার নূরজাহান লাজুক হাসল। হ, এই জাগায় ভুল ইট্টু অইছে। গরম মেশল্লাও তেল মোশল্লার লগে আগেঐ দিতে অয়।
মরনি মুগ্ধগলায় বলল, আর কিছু লাগবো না। আমার মায় ভালঐ মোরগ রানতে পারবো। রান মা, তুইঐ আইজ রান।
দবির আমতা গলায় বলল, এইডা ঠিক অইবো বুজি?
ঠিকঐ অইবো। আমি আছি না অর লগে! রানধুক না।
মজনু বলল, তয় আর পোলাওডা বাদ দিতাছো ক্যা? পোলাও ও রানধুক। আইজ অর হাতের রানধাই খাই। পোলাও কেমতে রানধে হেই পরীক্ষাড়াও লও।
নূরজাহান আগের চেয়েও অহংকারের গলায় বলল, পরীক্ষা লওন লাগবো না। পোলাও ভালঐ রানধুম। মা’রে রানতে দেখছি না।
দবির তখন আর কথা বলছে না। আবার তামাক টানতে শুরু করেছে। কাল দুপুরের পর থেকে বুকের ওপর চাপা ধরে আছে যে পাথর সেই পাথর এখনও আছে। তবে তার ওজন যেন একটু কম। নূরজাহানকে নিয়া এই বাড়িতে আসার পর, মরনি বুজি আর মজনু এই দুইজন মানুষকে পেয়ে, মোরগ জবাই, দুপুরে পোলাও মোরগের আয়োজন আর নূরজাহানের এইসব কৃতিত্ব, সব মিলিয়ে বুকে চাপা পাথর পানিতে ধীরে ধীরে ওজন হারাচ্ছে।
তারপর মোরগ পোলাও রান্না হয়েছে। নূরজাহান আর মরনি মিলেমিশেই করেছে। মূলকাজগুলি করেছে নূরজাহান, মরনি বসে থেকেছে তার সামনে। টুকটাক সাহায্য করেছে, এটা ওটা দেখিয়ে দিয়েছে, এগিয়ে দিয়েছে। একটা সময়ে ঘি মশলার গন্ধে ভরে গেছে। চারদিক। দু-তিনটা কাক এসে নেমেছিল উঠানে, একটা শালিক নেমেছিল। মোরগ মুরগিগুলি চরছিল এদিক ওদিক। কোনও কোনওটা রান্নাচালার কাছে, মরনি নূরজাহানের পায়ের কাছে চলে আসছিল খাদ্যের আশায়। কাকগুলি তালে ছিল যদি ঠোকরে ঠাকরে তুলে নেওয়া যায় কিছু। নিরীহ ধরনের শালিক পাখিটাও ছিল তার তালে। যদি সেও পায় কিছু। এইসব পাখপাখালির পেট যেন কখনোই পুরাপুরি ভরে না। কখনোই যেন খিদা মিটে না তাদের। মুখের কাছে চব্বিশঘণ্টা খাবার পেলে চব্বিশঘণ্টাই খাবে।
রান্নাবান্না শেষ হওয়ার পর মরনি আর নূরজাহান দুইজনে মিলে হাঁড়ি পাতিল নিয়া রেখেছে বড়ঘরে। মরনি সেই ফাঁকে তাড়া দিয়েছে মজনুকে। যা বাজান, তাড়াতাড়ি নাইয়া আয়। তর নাওয়া অইলে আমি নাইতে যামু। দোফর বইয়া যাইতাছে।
লুঙ্গি গামছা নিয়া ঘাটপারে রওনা দিয়েছে মজনু, হঠাৎ যেন মনে পড়েছে দবির গাছির কথা। দবির তখনও ছনছায় বসা। এখন আর তামাক টানছে না। হুঁকা রেখে দিয়েছে টিনের বেড়ার লগে ঠেকনা দিয়া।
মজনু বলল, আপনে নাইবেন না গাছিমামা?
না রে বাজান।
ক্যা? ও বুজছি। লুঙ্গি নাই। আমি লুঙ্গি দিমু নে। আহেন আমার লগে, নাইয়া হালাই।
না বাজান, বাইত্তে গিয়া নামু নে।
তয় তো নূরজাহানও নাইবো না। আপনেগ দুইজনের একঐ সমস্যা।
মরনি বলল, আমার কাপড়ও তো নূরজাহান ফিনতে পারে। কী রে নূরজাহান, ফিনবি?
আম্মা, আমিও বাইত্তে গিয়াঐ নামু নে।
বিয়াল অইয়া যাইবা না?
অউক। অসুবিদা নাই।
এই নিয়া আর কোনও কথা হয় নাই। মজনু চলে গিয়েছিল ঘাটপার। বর্ষার পানিতে দুপুরবেলায় রোদ তখন দেশ গ্রামের দুরন্ত কিশোরের মতন ঝাঁপিয়ে পড়েছে বর্ষার পানিতে। সেই পানিতে সাঁতার কেটে, ডুবাডুবি করে গোসল সারল মজনু। নূরজাহান তখন ঘাটপারে গিয়া দাঁড়িয়েছে। মজনু ডুবাডুবি করছে, ঘাটপারে রেখে গেছে প্লাস্টিকের গোলাপি রঙের সাবানের কেসে অর্ধেক ক্ষয় হওয়া লাইফবয় সাবান। ঘাটপারে বসে সেই সাবান দিয়া ভাল করে হাতমুখ ধুয়েছে, শাড়ির আঁচলে হাতমুখ মুছে বড়ঘরটায় এসে ঢুকেছে এমন ভঙ্গিতে, যেন এটা মজনুদের বাড়ি না, যেন এটা তার নিজেদের বাড়ি। দুপুর বয়ে গেলে মা যেমন করে তাড়া দেয় তাকে ঠিক সেই কায়দায় মরনিকে তাড়া দিয়েছে। নাইতে যান না আম্মা? তাড়াতাড়ি যান।
পুরানা শাড়ি গামছা হাতে তৈরিই ছিল মরনি। নূরজাহানের তাড়া খেয়ে বলল, হ রে মা, যাইতাছি।
দবিরকেও একই ভঙ্গিতে বলল নূরজাহান। তুমি বইয়া রইছো ক্যা? মুখহাত ধুইয়াহো।
দবিরও মরনির মতন বলল, যাইতাছি।
ঘাটপারে যেতে যেতে দবিরের মনে হয়েছিল, এই বাড়িতে যেন বিয়া হয়ে গেছে তার মেয়ের। অনেকদিন পর যেন মেয়ে জামাই বাড়িতে আসছে সে। এজন্য পোলাও মোরগ বেঁধেছে মেয়ে। সংসার পুরাটাই এখন মেয়ের হাতে। রান্নাবান্না শেষ করে জামাই শাশুড়িকে গোসলের তাড়া দিয়েছে সে, বাপকে দিয়েছে। যার যা কাজ এখন সেই কাজে তাদেরকে পাঠিয়ে নিজে ঢুকেছে ঘরে। তিনজন মানুষ তাদের কাজ সেরে এসে দেখবে খাবার সাজিয়ে বসে আছে মেয়ে। এখন খেতে বসলেই হয়।
