ঠ্যাং পাখনাও আগুনে পোড়াতে হয়। হাত দিয়া ধরে বেশ কায়দা করে চুলার আগুনে মোরগের ঠ্যাং পাখনা পোড়াল নূরজাহান। একের পর এক এত নিখুঁত ভঙ্গিতে করে গেল কাজগুলি, দবির তো অবাকই, মরনিও অবাক! আরে, আমার মা’য় দেহি বেবাক কাম পারে! এই হগল কাম তুমি কবে হিগলা মা?
নূরজাহান হাসিমুখে বলল, হিগি নাই তো?
তয়?
মা’রে করতে দেখছি না!
দেইক্কা দেইক্কা হিগছো?
হ। আর মোরগ বানানো সোজা আছে। রান্দন মনে অয় আরও সোজা। আপনে কইলে মোরগ আমি রাইন্দাও দিতে পারি।
শুনে দবির ভয় পেয়ে গেল। না না, খবরদার! বুজি, অরে তুমি মোরগ রানতে দিয়েন। কোনওদিন রান্দে নাই। রান্দন ভাল অইবো না। নুনকাট্টা হইয়া যাইবো, তেল মোশলা ব্যাশকম অইয়া যাইবো। এত কষ্টের জিনিস মুখে দিতে না পারলে…
নূরজাহান বাপের দিকে তাকিয়ে হাসল। তুমি খালি খালি ডরাইতাছো বাবা। কিছু অইবো না। মা’রে আমি রানতে দেখছি। আমার রান খারাপ অইবো না।
না মা, না। রানতে অইলে আমগো বাইত্তে একদিন রানদিছ। আমি খাইয়া দেখুম নে। এই বাইত্তে না।
মজনু হাঁটাহাঁটি করছিল উঠানে। নূরজাহানের মোরগ বানানো সে খেয়াল করে দেখেছে। খালার লগে নূরজাহানের কথাবার্তা, গাছিমামার লগে কথাবার্তা সবই শুনছে, শুনেই নূরজাহানের পক্ষে চলে গেল। আপনে অরে না করতাছেন ক্যা গাছিমামা? আমার মনে অয় ও ভালই রানতে পারবো।
দবির মজনুর দিকে তাকাল। না রে বাজান। রানতে বইয়া দেহা গেল বেবাক ছ্যাড়াভ্যাড়া কইরা হালাইছে। খাওনডাই নষ্ট।
আরে না। কাম করতে না দিলে আপনে বুজবেন কেমনে কামডা ও পারে। খলিফাসাবেও পয়লা পয়লা কাম করতে দিত না আমারে। হাত দিয়া ধইরা ধইরা বেবাক কাম হিগাইছে। ঠিকঐ, তয় মিশিনে বইতে দেয় না। মিশিন আমারে চালাইতে দেয় না। কয় সুঁই ভাইঙ্গা। হালাবি। আমি কই, না ভাঙ্গুম না খলিফাসাব। আপনে আমারে বইতে দেন। মিশিন চালাইতে দেন। হেয় দিবো না। খালি আমারে দিয়া হাতের কাম করায়। সুঁইয়ের মইধ্যে সুতা ভইরা আমি শাটের বুতাম আছে না, ওই বুতাম লাগানের ঘরডি সিলাই। বহুতদিন করলাম এই কাম। এইডা কোনও কাম অইলো কন। আমার আর ভাল্লাগে না। একদিন গেলাম চেইত্তা। আইজ আমি মিশিনে বমুঐ। যুদি মিশিনের সুই ভাইঙ্গা হালাই তয় সুইয়ের দাম আপনে আমার বেতন থিকা কাইট্টা রাইখেন। তাও খলিফাসাবে তেড়িবেড়ি করে। দোকানের অন্য কর্মচারীরা আমার পক্ষে। তারা কইলো, হ খলিফাসাব, পুঁই ভাঙ্গলে অর বেতন থিকা সুঁইয়ের দাম কাইট্টা রাইখেন। শ্যাষ পইর্যন্ত খলিফাসাবে রাজি অইলো। আমি বিসমিল্লা বইলা মিশিনে বইলাম। কীয়ের সুঁই ভাঙ্গা, পাকা খলিফার মতন মিশিন চালাইলাম। খলিফাসাবে বিরাট খুশি। অহন আমি অন্য কর্মচারীগো থিকা বহুত বেশি ভাল কাম করি।
নূরজাহান মুগ্ধ হয়ে মজনুর কথা শুনছিল। মরনিও শুনছিল। শোনার ফাঁকে ফাঁকে হলুদ আদা রসুন, জিরা ধইন্না সবই বেটে ফেলেছে। হাতের কাছে তেল ঘিয়ের বোতল বয়াম, বাটিতে রাখা কয়েকটা তেজপাতা, এলাচ লবঙ্গ দারচিনি। এখন শুধু রান্না বসানোই বাকি। নূরজাহান মোরগ রানতে চাইছে আর ওই নিয়া দবিরের আপত্তি, মজনু আছে নূরজাহানের পক্ষে, সব মিলিয়ে বেশ একটা আমোদ ফুর্তির পরিবেশ। এই অবস্থায় মরনি করে কী? দিমুনি মোরগটা আইজ নূরজাহানরে রানতে? আমি তো সামনে আছি। দেহি না কেমুন পারে? ভুল অইলে আমি ঠিক কইরা দিমু নে! আমার মজনু যহন মিশিনে বইয়া সুঁই ভাঙ্গে নাই, নূরজাহানও রানতে বইয়া খারাপ রানবো না।
মরনি ঠিক করল মোরগটা নূরজাহানকে দিয়াই রান্না করাবে। তার আগে নূরজাহানের একটা পরীক্ষা নিবে।
বাটা মশলা টিনের একটা থালে সাজিয়ে রেখেছে। অ্যালুমিনিয়ামের জগে একজগ পানি। পোলাওর চিনিগুড়া চাউল রাখা আছে কালো রঙের খাদায়। ভারী সুন্দর গন্ধ আসছে সেই চাউল থেকে। ঘাটপারে গিয়া চট করে চাউল ধুইয়া আনল মরনি। এসেই নূরজাহানকে বলল, মোরগ আইজ তুইঐ রানবি।
মরনির কথা শুনে তামাক টানতে ভুলে গেল দবির। হাঁ করে মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মজনু হাসিমুখে বলল, হ খালা, অরে দিয়াঐ রানধাও। দেহি কেমুন রানধে।
নূরজাহান বেশ একটা অহংকার নিয়া বলল, ভালঐ রানধুম আল্লার রহমতে।
মরনি বলল, তয় আমি যা যা জিগাই হেইডার জব দে।
জিগান।
মোরগ রানতে অইলে পয়লা কী করতে হয়?
মোরগের ফইর মইর ছাড়াইয়া, মোরগ বানাইয়া গোস্তডি ভাল কইরা ধুইতে অয়।
হ। হেইডা তুই করছস। তারবাদে?
মজনু বলল, রানধনের কথা ক। করবি কেমতে?
কড়াই পয়লা চুলায় দিমু। কড়াই গরম অইলে পরিমাণ মতন তেল দিমু। তেল গরম অইলে দিমু পাঁচপদের মোশলা। হলুদ মরিচ আদা রসুন ধইন্না জিরা।
নূরজাহান মশলার নাম বলছিল আর মজনু কড় গুনছিল। গোনা শেষ করে হাসিমুখে বলল, মোশলা অইলো ছয়পদের।
নূরজাহান লাজুক হাসল। হ ছয়পদের।
মরনি বলল, ঠিক আছে। লগে আর কী দিবি?
পিঁয়াইজ। ওই যে আপনে পিঁয়াইজ কুচি কুচি কইরা কাটছেন ওই পিঁয়াইজ দিমু। পিঁয়াইজ আর তেল মোশলা কষাইয়া তারবাদে মোরগের গোস্ত দিয়া দিমু কড়াইতে। দিয়া হাতা দিয়া একটু নাড়াচাড়া কইরা হরা দিয়া ঢাইক্কা দিমু। এইভাবে কতক্ষুন পর দেহা যাইবো গোস্ত থিকা পানি বাইর অইয়া গোস্ত সিদ্দ হইতে থাকবো। মাঝে মাঝে হরা উড়াইয়া দেখতে অইবো গোস্ত সিদ্দ অইতাছে কি না? তারবাদে একসমায় দেহা যাইবো গোস্ত থিকা যেই পানি বাইর অইছিল হেই পানি হুগাইয়া গোস্ত কষাইন্না অইয়া গেছে। অনেক মাইনষে এই কষাইন্না গোস্তঐ খায়। তয় পোলাওর লগে কষাইন্না গোস্ত খাইতে আরাম লাগে না। সুরাঅলা (ঝোল দেয়া) গোস্ত খাইতে ভাল্লাগে। লগে গোলালু দিলে হেই গোলালু খাইতেও ভাল্লাগে। এর লেইগা গোস্ত কষাইন্না অইয়া গেলে পরিমাণ মতন পানি দিয়া, গোলালু দিয়া আবার ঢাইক্কা দিতে অয়।
