ভিতরে ভিতরে খুবই বিরক্ত হল আলী আমজাদ কিন্তু প্রকাশ করল না। নির্বিকার চোখে তাকাল হেকমতের দিকে। কোন কথা?
নতুন মাইট্টাল কামে লওনের কথা।
ও।
তারপর আবার লোকটার দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল, মাইট্টাল অইবা?
জ্বে সাহেব। এর লেইগাঐ বইয়া রইছি।
য়োড়া আছে?
না।
তয়?
য়োড়া যোগার কইরা লমুনে
কেমতে? য়োড়া আনতে আবার কামারগাও যাইবা?
না। এই গেরামে আততিয় (আত্মীয়) বাড়ি আছে। তাগো কাছ থিকা আনুম।
থাকবা কই?
থাকনের বেবস্তা অইবনে। কইয়া বুইল্লা (বলে কয়ে) ঐ আততিয় বাইতঐ থাকতে পারুম। নাইলে ভিনদেশি মাইট্টাইলরা যেমতে থাকে, তাগো লগে থাকুম। ছাড়া বাইত্তে, ইসকুলে।
এবার আসল কথাটা বলল আলী আমজাদ। আমার কামের রোজ জানো?
না সাহেব, তয় অন্যরে যা দেন আমারেও তাই দিয়েন।
হেইডা দিমু না।
ক্যা?
আমার এহেনকার এহেক মাইট্টালের এহেক রকম রোজ। কেঐর পনচাইশ কেঐর চল্লিশ। সইত্তর আশিও আছে। মাইট্টাল বুইজ্জা রোজ। শইল বুইজ্জা রোজ। তোমার যা শইল, চল্লিশ টেকার বেশি পাইবা না। করলে কাইল বিয়ানে য়োড়া লইয়া আইয়ো। ফয়জরের আয়জানের লগে লগে কামে লাগবা, দুইফরে আধাঘণ্টা টিবিন (টিফিন) তারবাদে মাগরিবের আয়জান পইরযন্ত কাম। সপতায় একদিন টেকা পাইবা। শুক্কুরবার।
কথাগুলি বলে লোকটার দিকে আর তাকাল না আলী আমজাদ, তাকাল হেকমতের দিকে। কেমতে কথা কইলাম খ্যাল করছো?
হেকমত বিগলিত ভঙ্গিতে হাসল। করছি সাব। এরবাদে আমিই পারুম। আপনেরে আর লাগবো না।
লোকটা তখন কাতর চোখে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে যখন দেখল আলী আমজাদ আর তার দিকে তাকাচ্ছেই না বাধ্য হয়ে বলল, আমার একখান কথা আছিলো সাহেব।
তবু লোকটার দিকে তাকাল না আলী আমজাদ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি কও। কাম আছে।
পয়লা সপতাডা রোজকার পয়সা রোজ দেওন লাগবো।
ক্যা?
আমার কাছে একখান পয়সাও নাই। রোজ না পাইলে খামু কী? তয় পয়লা সপতার পর আর কোনওদিন লাগবো না।
আলী আমজাদ হেকমতের দিকে তাকাল। হেকমত, কইয়া দেও, অইবো না, নিয়ম নাই।
তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথার ওপর মেলে ধরা ছাতি একহাত দিয়ে সরিয়ে দিল। অদূরে দাঁড়ান নূরজাহান খিলখিল করে হেসে উঠল। কয়েক পা হেঁটে আলী আমজাদ এসে নূরজাহানের সামনে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, হাসো ক্যা?
নূরজাহান হাসতে হাসতে বলল, আপনেরে ছাতি মাথায় দেইক্কা। রইদ নাই ম্যাগ নাই মাথায় ছাতি দিয়া আছেন ক্যা?
আমি দেই নাই। মাথার উপরে ছাতি ধরছে আমার ম্যানাজারে। অগো কামঐ এমুন। রইদ ম্যাগ বোজে না। মালিক দেখলেই তার মাথায় ছাতি মেইল্লা ধরে।
ঐ বেডায় আপনের ম্যানাজার?
হ। বড় কনটেকদার অইলে একজন ম্যানাজার লাগে। আমি অহন বড় কনটেকদার। ম্যানজার রাখছি।
মজনু দাঁড়িয়ে আছে নূরজাহানের পাশে কিন্তু আলী আমজাদ একবারও তাকাচ্ছে তার দিকে। নূরজাহানকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। চোখের দৃষ্টি ভাল না লোকটার। খানিক আলী আমজাদকে দেখেই বিরক্ত হয়ে গেল মজনু। সেই বিরক্তি কাটাবার জন্য নূরজাহানকে কিছু না বলে হেকমত আর চাদরপরা লোকটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। হেকমত কী বলছে, লোকটা মন দিয়ে শুনছে। মজনু গিয়ে সামনে দাঁড়াবার পর হেকমতকে যেন ভুলে গেল সে, হেকমতকে যেন আর চিনতেই পারল না। ঘোরলাগা চোখে মজনুর দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রথমে দুই একবার চোখ সরিয়ে নিল মজনু তারপর সেও কেমন তাকিয়ে রইল। চোখ সরাতে পারল না।
ওদিকে নূরজাহান তখন আলী আমজাদকে বলছে, অনেকক্ষণ ধইরা খাড়ইয়া রইছি ছাতির কথাডা আপনেরে কমু, এমুন প্যাচাইল আপনে ঐ বেডার লগে আরম্ব করলেন আর শেষঐ অয় না। কথাও কইতে পারি না যাইতেও পারি না।
নূরজাহানের কথা শুনে আলী আমজাদ যেন আকাশ থেকে পড়ল। কও কী? তুমি আমার লগে কথা কওনের লেইগা খাড়ইয়া রইছো? হায় হায় আমি তো বুঝি নাই। লও ঘরে লও। ঘরে বইয়া কথা কই। আমারও কথা আছে তোমার লগে।
ঘরে যে আতাহাররা বসে আছে সেই কথা যেন মনেই রইল না আলী আমজাদের, একদম ভুলে গেল।
কিন্তু আলী আমজাদের কথা পাত্তা দিল না নূরজাহান। বলল, ধুরো, ঐ ঘরে মানুষ যায়নি। রাইত অইয়াইলো। আমি অহন বাইত যামু।
মজনুকে ডাকল নূরজাহান। ও মজনু দাদা, তাড়াতাড়ি আহেন। রাইত অইয়াইলো। বাইত্তে যামু না?
নূরজাহানের ডাকে চমক ভাঙল মজনুর। লোকটার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত নূরজাহানের দিকে পা বাড়াবে, লোকটা বলল, খাড়াও বাজান। তোমার নাম মজনু?
হ।
এই গেরামেঐ বাড়ি?
হ।
কোন বাড়ি?
হালদার বাড়ি।
লোকটা আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে তার আগেই নূরজাহান রাগি ভঙ্গিতে এসে হাত ধরল মজনুর। কানে বাতাস যায় না? কইলাম যে রাইত হইয়া যাইতাছে। লন।
মজনুর হাত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে সড়কে উঠল নূরজাহান। পিছন দিকে আর ফিরেও তাকাল না।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে মজনু বার বারই পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। লোকটাকে দেখছিল। সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে দূর থেকে লোকটার চোখ দেখা যায় না, পরিষ্কার দেখা যায় না মুখ। তবে সে যে তখনও ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে মজনুর দিকে এটা বোঝা যায়।
কে, লোকটা কে?
এই সড়কে যে মাটিয়ালের কাজ করতে এসেছে এটা আলী আমজাদ হেকমত এবং লোকটার কথা শুনে বুঝেছে মজনু। কিন্তু সে গিয়ে সামনে দাঁড়াবার পর সব ভুলে এমন করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কেন? চলে আসার সময় নাম ধামই বা জিজ্ঞাসা করল কেন? এখন এই যে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে মজনু এসময় কেন তার বার বার ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করতাছে লোকটার দিকে।
