বাড়িতে এই ধরনের কাজ করতে দিলে নূরজাহান নানান পদের তালবাহানা করে। কাজ করতে তার ভাল্লাগে না। এই নিয়া হামিদার কী বকাবাজি! মেয়ের গালে ঠোকনাটা চটকানাটা মারে, বেশি রাগলে গুম গুম করে কিলও মারে পিঠে। মার খেলে কাজে ফাঁকি দেওয়ার অছিলা পায় নূরজাহান। চিৎকার কান্নাকাটি করে, গাল ফুলিয়ে বাঁশঝাড়টার দিকে গিয়া বসে থাকে। রান্নাচালার দিকে, বড়ঘরের দিকে আর আসেই না। খাওয়ার সময় হলে দবির তাকে আদর আহ্লাদ করে, পিঠ মাথা দোয়াতে দোয়াতে (আদর স্নেহের ভঙ্গিতে হাত বুলানো) ঘরে নিয়া যায়। বাপ মেয়ের ভাতের থাল সামনে দিয়া হামিদা থাকে গম্ভীর হয়ে। নূরজাহানের মুখ তখনও গোমড়া। দবির আগের মতনই মাথায় পিঠে হাত বুলায়। খাও মা, খাও। ভাত সামনে লইয়া বইয়া থাকন ভাল না। আল্লায় গুনা দেয়।
নূরজাহান তবু থালের দিকে তাকায় না। ভাত মুখে দেয় না।
হামিদা মুখঝামটা দিয়া বলে, ইস, গোলামের ঝির কুয়ারা কত? ওই, তাড়াতাড়ি ভাত মুখে দে, নাইলে অহন পিছা দা পিডামু! কামকাইজ করন লাগবো না? জামাই বাইত্তে গিয়া কোনও কাম না পারলে তো মুখে গু উড়াইয়া দিবো।
হামিদাকে ধমক দেয় দবির। এই তুমি চুপ করো। এত বকবা না মাইয়াডারে।
তারপর আবার মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলায়। খাও মা, খাও। এই নেও আমি তোমারে খাওয়াইয়া দিতাছি।
নিজের থালের দিকে না তাকিয়ে মেয়ের থালের ভাত তরকারি মাখায় দবির। একহাতে মেয়ের থুতনি ধরে অন্যহাতে ভাত তুলে দেয় মুখে। হাঁ করো মা, হাঁ করো।
মেয়ের লগে লগে নিজের অজান্তে নিজেও হাঁ করে ফেলে দবির।
হামিদার চোখেমুখে তখন দুনিয়ার বিরক্তি। বাপ মেয়ের এইসব আহ্লাদ সব সময় তার ভাল্লাগে না। তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা। ঘরসংসারের কাম কিচ্ছু হিগতাছে না নূরজাহান। জামাই বাইত্তে গিয়া উপায় অইবো কী মাইয়ার? হৌর হরি, দেওর ননদগ খোডা (খোটা) খাইয়া মরবো না? জামাই কইবো কী?
সেই নূরজাহান আজ মরনির পাশে বসে এত সুন্দর করে মোরগের ফইর ছাড়াল! মেয়ের কাজ দেখে দবির মুগ্ধ। মোরগ জবাই করে দিয়াই সে চলে গিয়েছিল নুরুদের সীমানায়। একটা হুঁকা আর অল্প একটু তামাক যদি জোগাড় করা যায়!
নুরুর বাবা ভাসান মাঝি খানিক আগে বিল থেকে ফিরেছে। তামাকের নেশায় পাগল। হওয়া মানুষ। বিলে গিয়েছিল গোরুর ঘাস তুলতে। নৌকার ডরা ভরে ঘাস নিয়া ফিরাই সেই ঘাস আথালে বাঁধা গোরুগুলির সামনে ভুর করে রাখতে রাখতে ছোটমেয়ে সাহিদাকে চিৎকার করে বলেছে, তাড়াতাড়ি তামুক হাজা।
লুঙ্গির কাছা খোলার কথাও মনে হয় নাই, আথালে বাধা গোরুগুলি মুখের সামনে বিলের তাজা ঘাস পেয়ে যেভাবে হামলে পড়েছিল ঠিক সেইভাবে ভাসান মাঝিও হামলে পড়েছিল হুঁকার ওপর। দবির গিয়া দেখে বড়ঘরের ছেমায় বসে করুক করুক করে তামাক টানছে ভাসান মাঝি। টানার ভঙ্গি এমন, কতক্ষণ চলবে এই টানা, আল্লাহ মালুম!
এই ধরনের গিরস্তবাড়িতে একটার বেশি হুঁকা থাকে না। ওই এক হুঁকায়ই বাড়ির যাদের যাদের তামাক টানার সবাই টানে। ভাসান মাঝি এখন যে কায়দায় টানা শুরু করেছে এই অবস্থায় তার কাছে হুঁকা দবির কেমনে চায়?
দবিরকে দেখে তামাক টানার ফাঁকে ভাসান মাঝি বলল, খবর কী গাছি? আছো কেমুন?
দবির তার স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বলল, ভালঐ আছি দাদা।
কী মনে কইরা আইলা?
আইছি দাদা মরনি বুজির কাছে।
হেইডা বুজছি। তয় আমার সীমানায়…
কথা শেষ করল না ভাসান মাঝি, তামাক টানতে লাগল।
দবির বলল, আইছিলাম দাদা উক্কাডা নিতে। তয় আপনে টানতাছেন, নিমু কেমতে?
হ। উক্কা পাইবা না। এককাম করো, তামুক যতাহানি লাগে লইয়া যাও। টিক্কাও লইয়া যাও যেই কয়ডা লাগে।
উক্কা না থাকলে তামুক টিক্কাদা কী করুম?
বুদ্দি হিগাইয়া দেই। রহামাইন্না গেছে দিগলি। ফিরতে সন্দা অইয়া যাইবো। অগো উক্কা নেও গা।
শুনে দবির মহাখুশি। এইডা ভাল বুদ্দি দিছেন দাদা।
আইচায় (নারকেলের মালা) করে অনেকখানি তামাক আর বেশ কয়েকটা টিকা ভাসান মাঝির কাছ থেকে নিয়েছে দবির। নিয়া গেছে রহমানদের সীমানায়। রহমানের মা’র কাছ থেকে হুঁকা নিয়া তামাক সাজায়া মজনুদের বড়ঘরের সামনের তক্তার উপর বসে টানতে শুরু করেছে। টানতে টানতে দেখে মেয়ে তার মজনুদের রান্নাচালায় বসে কী সুন্দর করে মোরগের ফইর ছাড়াচ্ছে। পাটাপুতায় ঘসর ঘসর করে হলুদ বাটছে মরনি, নূরজাহান সেদিকে তাকিয়েও দেখছে না। মন দিয়া হাতের কাজ সারছে। মরনি যখন বলল, তুই খালি ফইর ছাড়া, মোরগ আমি বানামু নে। শুনে নূরজাহান বলল, ক্যা, আমি মোরগ বানাইতে পারি না? এই মোরগ আপনের আর ধরতে অইবো না আম্মা, মোরগও আমি বানাইতাছি।
ফইর ছাড়িয়ে অতি নিপুণ হাতে মোরগের ছাল ছাড়াল নূরজাহান। ধারালো বঁটি এক পা দিয়া চেপে ধরে দুইহাতে মোরগের রান পাখনা আলাদা করল। বুক পেট ফেঁড়ে নাড়ি আর কলিজা গিলা বের করল। গিলার ভিতর সকাল থেকে খাওয়া খুদকুঁড়া জমে শক্ত হয়ে আছে। সেই জিনিস বের করল। দেখতে দেখতে মাটির খাদা ভরে উঠল বানানো মোরগের টুকরা টাকরা মাংসে।
মাংস ধুতে যাওয়ার আগে কুলায় করে ফইরগুলি ফেলে এল পায়খানার ওদিককার ছাইগাদায়। ধোয়া মাংসের খাদার পাশে তখন শুধু মোরগের ছাল, পা দুইখান আর ডানার মাথার দিককার অংশ দুইটা। যত সুন্দর করে, যত নিখুঁত করেই পরিষ্কার করা হোক না কেন, মোরগ মুরগি বানানোর পর এইসব অংশে ফইরের গোড়াগাড়ি থেকেই যায়। পায়ের হাড়ে সাপের ছুলুমের (খোলস) মতন চামড়াটা থেকেই যায়। এই জিনিস পরিষ্কারের পথ অন্য। লোহার হাতা খুন্তির মাথায় চুল ঝুলিয়ে চুলার আগুনে ধরলে ফইরের গোড়াগাড়ি পুড়ে পরিষ্কার হয়। বোটকা একটা গন্ধ অবশ্য ছোটে। তাতে কী? ছালটা তো রান্নার উপযোগী হল।
