তখনই ঘোরটা দবিরের তৈরি হয়েছিল।
সে আর কোনওদিকে তাকায় নাই। হামিদা যে মেয়ে নিয়া বাড়ি থেকে বের হওয়া পছন্দ করবে না, একবারও ভাবে নাই সেই কথা। মেয়ে নিয়া নৌকায় চড়েছে। শরীরের যাবতীয় শক্তি দিয়া বইঠা বাইয়া আসছে। বইঠা বাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মনে হয়েছে মৃত্যুর আগ তরি এই বইঠা সে ছাড়বে না। মেয়ে নিয়া নৌকা বাইয়া চলে যাবে এমন এক দেশে যে দেশে মান্নান মাওলানা নাই। যে দেশে তার এইটুকু মেয়ের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জঘন্য কোনও পথ ধরবে না মেয়ের বাপের চেয়ে পনেরো-ষোলো বছরের বড় কোনও মানুষ!
মানুষ!
মান্নান মাওলানা মানুষ!
নূরজাহানের কান্না দেখে মজনু গেছে স্তব্ধ হয়ে, মরনি গেছে দিশেহারা হয়ে। দুইহাতে নূরজাহানের মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে মরনি তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। ওরে আমার সোনা রে! কান্দে না মা, কান্দে না। আমার অসুবিদার কথা আমি তরে কেমতে বুজামু মা? আমি একলা মানুষ। মজনু ছাড়া আর কেউ নাই সংসারে। মজনু থাকে ঢাকায়। বাইত্তে আমি একলা। এই বাড়ি হালাইয়া কেমতে আমি বাইত থিকা বাইর অই, ক? কেমতে তরে দেখতে যাই, ক? খালি বাড়ি হালাইয়া কোনওমিহি যাওন যায়? তয় মা, আমার কইলাম তর কথা খুব মনে অয়। রোজ মনে অয়। যেমতে আমার মজনুর কথা মনে হয়, ওমতেই আমার তর কথাও মনে অয়। মায় কি পোলা মাইয়া কেঐরে ভুইল্লা থাকতে পারে, ক?
নূরজাহান শিশুর মতন নাক টানল। গভীর অভিমানে, কান্নাভাঙা গলায় বলল, এই হগল কথা আমি বুঝি! আইজ আমি আইছি দেইখা আপনে এই হগল কথা কইতাছেন।
আরে না রে পাগল! আমি আমার মনের কথাই তরে কইলাম।
মজনুও সান্ত্বনা দিতে চাইল নূরজাহানকে। হ রে নূরজাহান, খালার মনের কথা আমি জানি। আমি যেই কয়বার বাইত্তে আইছি, খালায় তর কথা আমারে কইছে।
নূরজাহান চোখ মুছল। তুমি কথা কইয়ো না। তোমার উপরে আমার বেশি রাগ।
দবির টের পেল যেন কত আপন দুইজন মানুষের কাছে বহু বহুদিন পর ফিরা আসছে তার মেয়ে। যেন এই দুইজন মানুষের উপর বিশাল অধিকার তার।
আহা এইরকম এক বাড়িতে যদি জীবনটা কাটাতে পারত তার মেয়ে! যদি মরনির মতন একজন শাশুড়ি হত তার, যদি মজনুর মতন স্বামী হত!
মরনি তখন কথা ঘুরিয়েছে। নূরজাহানের গালে লেগে থাকা চোখের পানি ডানহাতে মুছে দিতে দিতে বলল, মাগো, তুই কইলাম আইজ সারাদিন আমগো বাইত্তে থাকবি।
লগে লগে কান্না অভিমান সব ভুলে গেল নূরজাহান। উচ্ছল গলায় বলল, আমি তো থাকতেঐ চাই।
তয় থাক। অসুবিদা কী?
বাবারে কন।
তর বাবায় তো হোনছে। সামনে ত্তো খাড়াইয়া রইছে। কী গাছিদাদা, হোনেন নাই?
দবির বলল, হুনছি।
মজনু বলল, একলা খালি নূরজাহানরে থাকতে কইতাছো ক্যা খালা? গাছিমামারেও কও।
হ কইতাছি। গাছিদাদা, আপনেও থাকেন। দোফরে খাইয়াদাইয়া তারবাদে যাইবেন।
না না আমার থাকনের কাম নাই। নূরজাহান থাউক। বিয়ালে আইয়া লইয়া যামু নে।
বাপের লগে তাল দিল নূরজাহান। হ বাবায় যাউকগা আম্মা। আমি থাকি।
মজনু বলল, না, গাছিমামায়ও থাকুক।
মজনুর কথা শুনে ভিতরে ভিতরে খুশি হল দবির। মনে মনে বলল, হ থাকনঐ ভাল। ওই বদমাইশটার কথা মরনি বুজিরে কইতে অইবো। অহনঐ ত্তো কওন যাইতাছে না। কইতে অইবো এমুন কায়দায়, নূরজাহানের কানে য্যান কথা না যায়, মজনুর কানে য্যান না যায়। কথা কওনের ওই ফাঁকটা পাওন লাগবো। হারাদিন থাকলে ফাঁক পাওয়া যাইবোঐ।
মরনি তখন মজনুর দিকে তাকিয়েছে। তর গাছিমামারে লইয়া কুঁকড়া জবো কইরা হালা বাজান।
মোরগ জবাইয়ের কথা শুনে দবির হা হা করে উঠল। আরে না, কুঁকড়া জবো করন লাগবো না। শাক ভাত যা হয় তাই খামু নে।
মজনু হাসল। আরে না মামা। আইজ আর শাক ভাত না। আপনেগো কপাল ভাল। খালায় আইজ পোলাও মোরগ রানবো। আপনেরা আহনের আগে থিকাই আমারে কইতাছে নূরা মামাগো ওইমিহি থিকা কেঐরে ডাইক্কা আইন্না মোরগহান জবো কইরা দিতে।
দবির কথা বলবার আগেই নূরজাহান বলল, পোলাও মোরগ না খাইলেও আমার কোনও অসুবিদা নাই। আমি হারাদিন আম্মার কাছে থাকতে পারুম এইডাঐ আমার আনন্দ।
দবির বলল, তয় আমারও একহান মতলব আছে।
মরনি বলল, আপনের আবার কী মতলব গাছিদাদা?
তোমার লগে কথা আছে।
অহন কইবেন?
আরে না। পরে কমু নে। অহন তামুক খাওনের ব্যবস্থা করি।
তামুকের ব্যবস্থা কই থিকা করবেন? আমার ঘরে তো উক্কা নাই?
জোগাড় করুম নে।
বুজছি, নূরাগগা ওইমিহি থিকা আনবোনে।
হ।
মজনুর দিকে তাকাল দবির। তয় লও বাজান মোরকহান জব কইরা হালাই।
লন।
মরনি বলল, মোরগ ধরতে অইবো। খাড়া বাজান, একমুঠ খুদ দিতাছি। উডানে ছিটাইয়া কুঁকড়াডি দৌড়াইয়া আইবো। হেই ফাঁকে থাবাদা ধরতে অইবো।
আরে ওই কায়দা আমি জানি। তুমি আগে খুদ ছিডাও আর আমারে দেহাই দেও কোনডা জবো করতে অইবো। দেইখখানে কেমতে আমি ধরি।
কথা বলতে বলতে নূরজাহানের দিকে তাকিয়েছে মজনু, তাকিয়ে দেখে নূরজাহান অদ্ভুত এক চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এরকম চোখে নূরজাহানকে কোনওদিন তার দিকে তাকাতে দেখে নাই মজনু। নূরজাহানের চোখে কী ছিল কে জানে, বুকের খুব ভিতরে আশ্চর্য এক শিহরন লাগল তার।
.
বুজি গো, তোমারে একহান কথা কইতে চাই।
খানিক আগে খাওয়াদাওয়া শেষ করেছে মরনি। মজনু আর দবির মিলে মোরগ জবাই করে দেয়ার পর সেই মোরগের ফইর ছাড়াতে দিয়েছিল নূরজাহানকে। তুই ফইর বাইচ্ছা হালা মা, আমি মোশলা বাটি। তর ফইর বাছা অইতে অইতে আমার মোশলা বাটা অইয়া যাইবো। তারবাদে আমি মোরগ বানামু নে। আর কোনও কাম তর করন লাগবো না।
