.
দবির গাছির কোষানাও ঘাটে লাগছে কি লাগে নাই পাগলের মতন একটা লাফ দিল নূরজাহান। লাফ দিয়া ঘাটের তক্তার উপর নামল। মরনি আর মজনু দাঁড়িয়ে আছে বড়ঘরের সামনে। মজনুকে খেয়ালই করল না নূরজাহান। অনেকক্ষণ না দেখা মা’কে হঠাৎকরে দেখলে যেমন করে। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে অবোধ শিশু ঠিক সেই ভঙ্গিতে মরনিকে এসে জড়িয়ে ধরল। আম্মা, ও আম্মা! আহা রে, কতদিন পর আপনেরে দেখলাম। আপনেরে একটু প্যাচাইয়া ধরলাম।
মরনির অবস্থাও অবোধ শিশুর মায়ের মতন। সেও এমন করে জড়িয়ে ধরেছে নূরজাহানকে, পারলে কোলে তুলে ফেলে। পারছে না বলে একহাতে নূরজাহানকে জড়িয়ে। ধরে অন্য হাতটা গভীর মমতায় বুলিয়ে দিচ্ছে তার মাথায় পিঠে। হ রে মা, তরেও আমি বহুতদিন বাদে দেখলাম। আমার সোনা, কত বড় অইয়া গেছস তুই!
মজনু তখন তাকিয়ে তাকিয়ে নূরজাহানকে দেখছে। মুখটা হাসিহাসি হয়ে আছে তার। নূরজাহানের ঘটনা সে সবই শুনেছে। সবই জানা। তারপর থেকে নূরজাহান যে আর বাড়ি থেকে বের হয় না, বাপ মায়ে যে তাকে আর বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না এইসব খবর সবই সে রাখে। এর মধ্যে তিনবার বাড়ি আসছে। কোনও কোনওবার ইচ্ছা করছে যায় একটু নুরজাহানদের বাড়িতে। তাকে একটু দেখে আসে। একটু কথা বলে আসে তার লগে। কোথা দিয়া কেটে গেছে সময়। কোন ফাঁকে ফিরা যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ফিরা গেছে খলিফাগিরির কাজে। নূরজাহানের লগে আর দেখাই হয় নাই।
একবছরও পুরা হয় নাই এর মধ্যেই যেন অনেকখানি বড় হয়ে গেছে নূরজাহান। আগের সেই চঞ্চলতা কিছুটা যেন কমেছেও। যদিও নৌকা থেকে যেভাবে লাফ দিয়া নামল, যেভাবে দৌড়াইয়া আইসা জড়ায়া ধরল মরনিকে এরকম ভঙ্গি তার আগেও ছিল। তবু যেন কোথায় সূক্ষ্ম একটা বদল।
বড়ইগাছের গোড়ার লগে কোষানাওটা ততক্ষণে বেঁধেছে দবির। মাজার কাছে লুঙ্গির লগে গিঁট দিয়া বাধা পুরানা গামছাখান। নৌকা বাঁধা শেষ করে গামছা মাজা থেকে খুলল। খুলে মুখ গলা মুছল। তারপর সেই গামছা একদিককার কাঁধে ফেলে হাসিমুখে এসে দাঁড়াল। মানুষ তিনজনের কাছাকাছি। নূরজাহান ব্যস্ত হয়েছে মরনিকে নিয়া, সে ব্যস্ত হল মজনুকে। নিয়া। কী গো বাজান, তুমি দ্যাশে আইছছা কবে?
মজনু আনন্দিত মুখে বলল, এইত্তো গাছিমামা, পশশু বিয়ালে আইছি।
থাকবানি দুই-চাইরদিন?
হ মামা থাকুম, আরও চাইর-পাঁচদিন থাকুম।
ভাল আছো তো?
হ মামা, আছি। ভাল আছি।
মরনিকে ছেড়ে নূরজাহান তখন মজনুর দিকে তাকিয়েছে। হঠাই কাইজ্জাকিত্তনের গলায় বলল, এই মজনুদাদা, তুমি এত খারাপ হইছো কেমতে?
মজনু থতমত খেল। খারাপ অইছি? কী খারাপ অইছি?
আমার এতবড় একহান বিপদ গেল আর তুমি একবারও আমার খবর লইলা না?
মজনু একটা হাঁপ ছাড়ল। ও এই কথা!
হ, তয় কী কথা? এর মইধ্যে তুমি দ্যাশে আহো নাই? আমি নাইলে বাইত থিকা বাইর অইতে পারি না, তোমার দশা কি আমার লাহান? আম্মায় কি তোমার হাত পাও বাইন্দা থুইছিলো? তুমি একবার আমগো বাইত্তে যাইতে পারতা না?
মজনু হাসল। হ পারতাম।
তয় যাও নাই ক্যা?
সমায় পাই নাই।
নূরজাহান মুখ ভেংচে বলল, ইস সমায় পাই নাই! কী আমার জজ বালিস্টার রে!
মরনিকেও একই রকম কথা বলল সে। মজনুদাদায় নাইলে ঢাকার টাউনে থাকে, আম্মা আপনে? আপনে তো দ্যাশেই থাকেন। আপনেও তো একবার আমার সমবাত লইতে যাইতে পারতেন। আমি বাঁইচ্চা আছি না মইরা গেছি আপনে আমার সমবাত লইবেন না?
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল নূরজাহান। আমি আপনেগো আপনা মনে করলে কী অইবো, আপনেরা আমারে আপনা মনে করেন না!
মেয়ের কান্না দেখে আর কথা শুনে দবিরের বুকটা তোলপাড় করে উঠল। কাল বিকাল থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা মনে পড়ল। নূরজাহানকে নিয়া হঠাৎ করেই নৌকায় চড়েছিল। এতটা পথ যেন একটা ঘোরের মধ্যে নৌকা বাইয়া আসছে। শ্রাবণ মাসের রোদ আজ সকালবেলাই চড়চড়ায়া উঠছে। বর্ষার পানি আর ধইনচা খেতের আড়াল আবডাল থেকে, চকের জলঘাস আর কচুরিপানায় রোদ পড়ে ঠিকরে উঠছিল। সেই ঠিকরানো রোদে কী ত্যাজ! গরমে ঘামে নাইয়া গেছে দবির। নূরজাহান বসেছিল নৌকার মাঝখানকার পাটাতনে। পরনের শাড়ি দিয়া মাথা ঢেকেছিল এমনভাবে যেন রোদ মাথায় না লাগে। তাও কম ঘামা ঘামে নাই মেয়েটা। দবির ঘেমেছে নৌকা বাইতে বাইতে আর নূরজাহান ঘেমেছে রোদ মাথায় বসে থাকতে থাকতে।
এক নায়ের দুইজন মানুষ ছিল দুইরকম ঘোরে। একজনের মনে বেদম ফুর্তি। এতদিন পর বাড়ি থেকে বের হয়েছে। মরনি আম্মাকে একটু দেখতে পাবে, তার লগে একটু কথা বলতে পারবে। তখনও সে জানে না মজনুদাদায়ও আছে বাড়িতে। তা হলে মনের ভিতরে হয়তো অন্য রকমের একটা দোলাও লাগত।
আর দবির গাছির ঘোরটা ছিল অন্যরকম।
ল্যাংড়া বসিরের মুখে ওসব কথা শোনার পর থেকে বুকে চেপে বসেছিল হাজার মন ওজনের পাথর। মেয়ে, মেয়ের মা কেউ সেই পাথরের কথা জানে না। আজ সকালে মেয়ে যখন বলল সে বাড়ি থেকে বের হতে চায়, মরনি আম্মার বাড়ি যেতে চায় তখন হঠাৎ করেই দবিরের মনে হল এই তো একজন মানুষ পাওয়া গেছে যাকে মন খুলে বলা যাবে কথাটা। হয়তো সেই সেদিনকার মতন মাওলানা মান্নানের হাত থেকে, চোখ থেকে মেয়েকে সে বুকের আড়ালে লুকিয়ে রাখবে। আরেকবার বাঁচিয়ে দিবে তার মেয়েটাকে।
