ততক্ষণে মজনুর কাজ শেষ। গালে গলায় কানের লতিতে, নাকের কাছটায় সাবানের ফেনাফোনা লাইগা আছে। গলায় ঝুলানো গামছায় মুখটা ভাল করে মুছল সে। একদম সাফ সুতরা হয়ে গেল। আহা, মুখটা যে এখন কী সুন্দর দেখাচ্ছে ছেলেটার। এইরকম মুখের দিক থেকে চোখ ফিরানো যায় না।
মরনি তবু চোখ ফিরিয়ে রাখল। মনে মনে বলল, আল্লা মাপ কইরো। আল্লা মাপ কইরো। পোলার উপরে য্যান আমার নজর না লাগে!
মজনু তখন রেজার গ্লাসের পানিতে ধুয়ে ব্লেড খুলছে। কাগজের মোড়কটা রাখা আছে আগের জায়গায়। অতিযত্নে ব্লেড মোড়কে ভরল। গ্লাসের পানি ছুঁড়ে ফেলল উঠানের দিকে। আয়না বন্ধ করে রাখল। তার আগে ব্রাশ ধুয়েছিল মগের পানিতে। সাবান বাটিতেই আছে। সেটা বাটি থেকে তুলে গামছায় সুন্দর করে মুছল। তারপর খালার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। সবকাম শেষ। খালা, আমারে কেমুন লাগতাছে?
মরনিও হাসল। মাশাল্লা। আমার পোলায় বিরাট ডাঙ্গর অইয়া গেছে।
মজনুর সাবান রাখার বাটি আর পানির মগ হাতে নিল সে। ব্লেডখোলা রেজার আর ব্রাশের দিকে হাত বাড়াল। দে।
মজনু অবাক। এইডি দিয়া কী করবা?
ভাল কইরা ধুইয়া লইয়াহি।
খালি মগ আর বাড়ি ধুইলেই অয়। রেজার ব্যারাস তো আমিঐ ধুইছি।
ধোওয়া ভাল অয় নাই। দে আমি ভাল কইরা ধুইয়া আনি।
বাড়ির চারদিকে বর্ষার পানি। পুব আর দক্ষিণের ভিটির ঘরের মাঝখানে, পুব দক্ষিণ কোণে বড়ইগাছটার গোড়ায় এখন ঘাটলা। হাত চারেক লম্বা, আর দেড়হাত পরিমাণ চওড়া, ভারী একখান তক্তা ফেলে ঘাটলা হয়েছে। সেই ঘাটলায় গিয়া চট করেই জিনিসগুলি ধুইয়া আনল মরনি। মজনু তখনও আগের জায়গায় বসে আছে। জিনিসগুলি এনে মজনুর হাতে দিল সে। মজনু এবার উঠল। ঘরের ভিতর দিকে গিয়া জায়গা মতন সব রেখে ঘর থেকে বের হল। উঠানে দাঁড়িয়ে দুইহাত দুইদিকে ছড়ায়া শরীর টানা দিয়া আরামের একটা শব্দ করল।
ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে রান্নাচালার দিকে মেলা দিল মরনি। একটু গিয়াই আবার ফিরা আসল। ইকটু নুরুগো ঐমিহি যা বাজান। পুরুষপোলা কেঐরে ডাইক্কা লইয়ায়।
মজনু অবাক। ক্যা, পুরুষপোলা ডাকতে অইবো ক্যা? কী অইছে?
কিছু অয় নাই। একহান কুঁকড়া জবো করন লাগবো।
কুঁকড়া জবো করন লাগবো?
হ।
ক্যা? আথকা কুঁকড়া জবো করবা ক্যা?
তর লেইগা? তরে আইজ মোরগ পোলাও খাওয়ামু।
কও কী?
হ। সেন্টুর দোকান থিকা ঘি আনাইয়া রাখছি। একটা কুঁকড়াও বাইচ্ছা রাখছি। ওইডারে আইজ জবো করুম।
পোলাওর চাউল আনাইছো কার দোকান থিকা?
রমেশের দোকান থিকা। দিনাজপুরের কালীজিরা চাউল। যা ঘেরান। যা বাজান যা, কেঐরে ডাইকা লইয়া আয়। কুঁকড়া জবো কইরা দে। জবো করনের পর ফইর মইর পয়পরিষ্কার করতে সময় লাগবো। অহন না করলে দেরি অইয়া যাইবো রান বাড়ন শেষ অইতে।
আরে না, বেশি দেরি অইবো না। দোফরে আমি আইজ দেরি কইরাই খামু। বিয়ানে এত বড় বড় তিনডা ভাপা পিডা খাওয়াইছো। বিয়ালের আগে খিদাই লাগবে না।
যহন খিদা লাগে তহনঐ খাইচ। আমি আমার কাম শুরু করি।
সব জেনে বুঝেও খালার লগে তারপর একটা মজা করল মজনু। অন্য কেঐরে ডাক দেওনের কাম কী? লও তুমি আমিঐ কুঁকড়া জবো কইরা হালাই।
মরনি আঁতকে উঠল। তোবা, তোবা। মাইয়াছেইলারা কোনও কিছু জবো করতে পারে।
ক্যা?
মাইয়াছেইলারা কোনও কিছু জবো করলে হেই জিনিস হালাল অয় না।
কে কইছে তোমারে?
আমি জানি। ছোডকাল থিকা দেইখা আইতাছি। মাইয়াছেইলাগো অনেক অসুবিধা। অনেক কামঐ তারা করতে পারে না। নিষুদ আছে।
আমি এইসব জানি।
তয় আবার কচ ক্যা?
কইলাম আর কী? খালা, একহান কথা কও তো আমারে। ধরো কোনও একহান গেরামে কোনও পুরুষপোলা নাই। খালি মাইয়াছেইলা। ধরো তাগো আথকা কুঁকড়া জবো করন লাগতাছে। তহন তারা কী করবো?
এতকিছু বাজান আমি কইতে পারুম না।
দুইজন মাইয়াছেইলায় কি দুই মিহি দিয়া ধইরা কুঁকড়া জবো করতে পারবো না?
না পারবো না।
ক্যা?
নিয়ম নাই।
নিয়ম থাকবো না ক্যা? দুইজন পুরুষপোলায় যেই কাম পারবো দুইজন মাইয়াছেইলায় হেই কাম পারবো না ক্যা?
পারবো না। এইডা আল্লার নিষুদ।
একটু থামল মরনি। এত প্যাচাইল পারিচ না। যা, কেঐরে ডাইকা আন।
খাড়াও যাইতাছি।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে মজনু বলল, ও খালা, তোমার ওই কুঁকড়াডা কো?
কোনডা রে বাজান?
ওই যে চিলের মুখ থিকা না ধুরকাউয়ার (দাঁড়কাক) মুখ থিকা জানি আমগো উডানে পড়ছিল। তুমি লাইল্লা পাইল্লা ডাঙ্গর করছিলা…
আর কইচ না বাজান। চইত মাসের দোরবেলা বাড়ির নামা থিকা মোরগটারে হিয়ালে লইয়া গেল।
কও কী?
হ।
আহা রে! ওইডা একহান সাই (দারুণ) কুঁকড়া আছিলো।
হ রে বাজান। ভাল কুঁকড়া আছিলো। কুঁকড়াডার কথা আমার খুব মনে অয়। চিলের মুখ থিকা যেমতে আইয়া পড়ছিলো আমগো বাইত্তে, ঠিক অমতেই আবার হিয়ালে লইয়া গেল। কই থিকা আইলো কই গেল গা!
মরনির একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। খালার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে তার দিকে ফিরে তাকাল মজনু। তোমার মন এত মুলাম খালা। একহান কুঁকড়ার লেইগাও তোমার মন কান্দে।
মরনি কথা বলল না। অন্যমনস্ক হয়ে গেছে।
এই অবস্থা কাটাবার জন্যই কথা ঘুরাল মজনু। খালা, একহান কথা কও তো?
কী কথা?
আমি দেখতে কার লাহান অইছি? মা’র লাহান না বাবার লাহান?
মরনি কথা বলবার আগেই তাদের বাড়ির ঘাটে এসে লাগল দবির গাছির কোষানাও।
