কবে, কত কত বছর আগে কালীরখিলের গলুইয়া থেকে দুইআনা দিয়া কিনা আনছিল মরনি। দিন চলে গেছে, জিনিসটা রয়ে গেছে।
মজনুর হাতে সস্তা ধরনের একটা সেভিংব্রাশ। প্রথমে মগের পানিতে ব্রাশটা একটু ভিজিয়ে বাটিতে রাখা সাবানেব্রাশ ঘসল সে। সেই ঘসায় লাক্স সাবানে ফেনা হল ভালরকম। বাটির খানিকটা ভরে গেল ফেনায় আর ব্রাশে তো সাবান যতটা লাগার লাগলই। ব্রাশটা তারপর গালে গলায় ঘসতে লাগল মজনু। দেখতে দেখতে সাদা ফেনায় মাখামাখি হয়ে গেল মুখ। জলচৌকির একপাশে পাতলা কাগজের মোড়কের ভিতর নতুন একখান ব্লেড, অল্পদামি একটা রেজার। মুখে ফেনা মাখা শেষ করে অতিযত্নে ব্লেড খুলল মজনু, রেজার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলল। ব্লেড বসালো সাবধানে। আবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বন্ধ করল রেজার। এখন সব রেডি। মুখ একটু নিচু করে আয়নার দিকে তাকাল মজনু, বাঁ দিক থেকে রেজার টানতে লাগল।
মরনি বসে আছে দরজার অদূরে তক্তায়। বসে অপলক চোখে মজনুকে দেখছে। মুখটা পুরাপুরি দেখা যাচ্ছে না ছেলের, দেখা যাচ্ছে পিঠ। ঢাকার টাউনে থাকতে থাকতে, দিনরাত দোকানে বসে খলিফাগিরি করতে করতে ফরসা হয়ে গেছে মজনু। দেশগ্রামের মতন খোলা রোদ হাওয়া পায় না। আর দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই গায়ে আছে শার্ট গেঞ্জি, খালি গা গোসলের সময় ছাড়া হয়ই না। এই অবস্থায় ফরসা তো হবেই। চাপাপড়া ঘাসও তো কিছুদিন পর সবুজ রং হারিয়ে ম্যাড়ম্যাড়া সাদা রং ধরে।
তবে মজনুর রংটা ম্যাড়ম্যাড়া না। পিঠ দেখে মনে হচ্ছে দুধের লগে কাঁচা হলুদ বাটা মিশালে যে রং হবে অবিকল সেই রং মজনুর পিঠের। বুক পিঠের তুলনায় মুখ একটু কম সাদা, কনুয়ের কাছ থেকে বাকি হাত একটু কম সাদা। অর্থাৎ এই জায়গাগুলি খোলা থাকে। রোদ হাওয়া কখনও কখনও একটু আধটু লাগে।
মাথার চুল সুন্দর ছেলেটির! এবার বাড়ি আসার পর যেন আরও বড় লাগছে তাকে। হঠাৎ করে যেন পুরুষ হয়ে গেছে। এই যে এখন মুখ কামাচ্ছে, দেখতে ভাল লাগছে।
মুগ্ধ হয়ে ছেলেকে দেখতে দেখতে মরনি হঠাৎ একটু চমকাল। হায় হায় এইডা আমি কী করতাছি? আমি মজনুর খালা অইলেও আসলে অইলাম মা। খালি পেট থিকা অরে আমি জন্ম দেই নাই, আর তো সবই করছি। ও তো আমারই পোলা। আপনা পোলারে মা বাপে। নজর কইরা দেখলে, তারে সোন্দর কইলে, মনে মনে কইলেও বদনজর লাগে পোলার শইল্লে। হায় হায় ওইরকম নজর লাগলে আমার পোলার তো ক্ষতি হইবো।
মজনুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল মরনি।
আয়নার ভিতর থেকে ব্যাপারটা খেয়াল করল মজনু। গালে গলায় রেজার টানা বন্ধ করে মরনির দিকে তাকাল। কী অইলো খালা?
মরনি আগের মতনই অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কী অইবো?
আমি দেখলাম তুমি আমার মিহি চাইয়া রইছো, তারবাদে আথকা মুখ ঘুরাইয়া ফালাইলা?
মরনি মজনুর দিকে তাকাল। তুই দেখলি কেমতে? তুই না মুখ বানাইতাছস?
তারবাদেও দেখছি।
কেমতে দেখলি হেইডা কচ না ক্যা?
আয়নার ভিতরে থিকা দেখছি।
বুজছি। আগে তর কাম শেষ কর তারবাদে কমু নে।
না অহনঐ কও।
অহন কইলে তর মুখ বানাইতে দেরি অইবো। মুখে সাপানের ফেনা হুগাইয়া যাইবো।
না যাইবো না। তুমি কথা কইবা আর হেই ফাঁকে আমি সেপ করুম।
না হেইডা করন যাইবো না বাজান।
ক্যান করন যাইবো না?
আথকা হাইসা হুইসা ফালাইলে বেলেডে মুখ কাইট্টা যাইবো।
আরে না। তুমি কও।
মরনি হাসল। তোর মুখ বানান দেইখা, তর শইল দেইখা তরে মনে অইলো তুই জুয়ান মর্দ অইয়া গেছস। সোন্দরও অইছস। আপনা পোলা সোন্দর অইলে মা’র হেইডা দেখতে অয় না। দেখলে নজর লাগে। আর মুখ দিয়া পোলার সোন্দর অসোন্দরের কথা কইলে লাগে মুখ। তরে দেখতে দেখতে এই হগল মনে অইতাছিল আমার। এর লেইগা তর দিক থিকা মুখ ফিরাইয়া নিছি।
রেজার নামিয়ে আবার খালার দিকে তাকাল মজনু। যাতে আমার উপরে তোমার নজর লাগে?
হ বাজান।
তার অর্থ অইলো, তোমার চোক্ষে আমি সোন্দর?
মরনি হাসল। আল্লার রহমতে।
তয় একহান কাম করো খালা, আমার কপালে একহান কালা টিপ দিয়া দেও।
ক্যান?
কালা টিপ দিলে নজর লাগবো না।
এত বড় পোলার কপালে কালা টিপ দেওন যায় না। ছোটকালে রোজঐ তর কপালে আমি কালা টিপ দিছি।
একবার শেভ করে ফেলেছে মজনু। দ্বিতীয় বার করবার জন্য আবার আগের কায়দায় ব্রাশে সাবান মাখাল, গ্লাসে রাখা পানিতে রেজার চুবিয়ে চুবিয়ে পরিষ্কার করল, আবার শেভ করতে লাগল।
মরনি অবাক। আবার করতাছস ক্যা?
সেপ দুইবারঐ করতে অয়।
ক্যা?
একবারে গোড়া থিকা দাড়িমোচ কাড়ে না। গোড়াগাড়ি থাইকা যায়। এর লেইগা দুইবার করতে হয়।
বুজছি। তয় সাবধানে বাজান। গাল গোল কাইট্টা হালাইছ না।
আরে না। আমি সেপ করি অনেকদিন অইয়া গেছে। পয়লা পয়লা দুই-চাইরবার ইকটু ইকটু কাটছে। অহন আর কাটে না। শিখা ফালাইছি।
তারবাদেও আমার খুব ডর করে বাজান।
ডরের কিছু নাই।
আবার হাতের কাজ থামিয়ে মরনির দিকে তাকাল মজনু। খালু মুখ বানাইতো না?
হ বানাইতো। তয় তর লাহান এমতে না।
তয় কেমতে?
আষ্ট-দশদিন পর মাওয়ার বাজারে যাইতো। নিতাই নামে একটা নাপতা আছিলো, নিতাই তার মুখ বানাইয়া দিতো।
হ আগের দিনের মাইনষে তো ওমতেই মুখ বানাইতো। নাপিত দিয়া। নিজেরা করতো।
হ।
আষ্ট-দশ দিনে দাড়িমোচ বড় অইয়া যাইতো না?
হ। ম্যালা বড় অইতো। মনে অইতো মুখে দুবলা অইছে। আমগো মতন বাড়ির পুরুষপোলারা মুখ বানাইতে বাজারে যাইতো। দুই পয়সা, এক আনা লাগতো মুখ বানাইতে। যারা ধনী মানুষ, ধর খাইগোবাড়ির মানুষরা, তারা কইলাম বাজারে গিয়া, খোলা জাগায় জলচকিতে বইয়া মুখ বানাইতো না। নাপতারা বাইত্তে আইয়া তাগো মুখ বানাইয়া দিয়া যাইতো।
