তয় কচ না ক্যা?
তোমারে কমু না। কমু বাবারে।
তারেঐ ক। আমিও হুনি।
আইচ্ছা হোনো। তয় তুমি কইলাম বাগড়া দিবা না।
কাঁধের দিকে একটা হাত দিয়া গভীর মমতায় মেয়ের পিঠটা ধরল দবির। না না, বাগড়া দিবো না। তুই ক। কী কবি ক মা।
আগেঐ কইলাম কইছি আমার কথা তোমার হোনন লাগবো।
হুনুম নে। তুই ক।
সত্যঐ হোনবা?
সত্যঐ হুনুম।
নূরজাহান একটু থেমে বলল, আমি আইজ বাইত থন বাইর অইতে চাই।
মুখের মউলকা শেষ করে আবার মউলকায় কামড় দিতে যাবে হামিদা, তার আগেই থেমে গেল। দবির কথা বলবার আগেই বলল, কী? কী করবি?
বাইত থন বাইর অমু।
কই যাবি?
মরনি আম্মাগো বাইত।
না না। বাইত থন বাইর অইতে পারবি না। বিয়াশাদি না দিয়া এই বাড়িত থন তরে আমি আর বাইর করুম না।
নূরজাহান কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, এইডা কোনও কথা অইলো? আইজ আষ্ট-দশ মাস বাইত থন বাইর অই না। শীতের দিন গেল, খরালি গেল, বইষ্যাকালের মাঝামাঝি সমায় অহন, এতদিন বাড়িতে। কোনওহানে বাইর অইতে পারি না। মনে অয় আমি একখান পাখি। আমারে তোমরা খাঁচায় আটকাইয়া রাখছে।
হামিদা গম্ভীর গলায় বলল, তর এই অবস্তার লেইগা তুইঐ দায়ী।
আরে হেইডা তো কত আগের কথা। হেইডা তো মিট্টাঐ গেছে। অহন কি আর আমার কোনও অসুবিদা আছে? হুজুরে তো আমারে মাপঐ কইরা দিছে।
দবির মনে মনে বলল, না রে মা, না। মাপ তরে হেয় করে নাই। যেইডা করছে হেইডা অইলো শয়তানি। খাড়া শয়তানি। শয়তানি কইরা মাইনষেরে বুজাইছে নাদান মাইয়া একহান ভুল কইরা হালাইছে। আল্লাহপাকে কইছে নাদানরে মাপ কইরা দিয়ো। আমি অরে মাপ কইরা দিলাম। এই হগল কইয়া হেয় আছিলো অন্যতালে। মোতাহারের মায় না। মরলে কোন তাল ধরতো কে জানে। হেয় মরছে দেইক্কা বিয়ার তাল ধরছে। মোতাহারের মা বানাইতে চাইতাছে তরে।
হামিদা বলল, যা ইচ্ছা করুক। আমি তরে বাইত থনে বাইর অইতে দিমু না। দবিরের গলা ধরে একটা ঝাঁকানি দিল নূরজাহান। কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, তুমি কথা কও না ক্যা বাবা? এই বাইত্তে থাকতে থাকতে আমি পাগল অইয়া যাইতাছি। আমারে ইট্ট বাইত থনে বাইর অইতে দেও। তুমি নিজে গিয়া আমারে মরনি আম্মার বাইত্তে দিয়াহো। বিয়ালে তুমি গিয়া লইয়াইয়ো। ওই বাইত থনে আমি আর কোনওহানে যামু না। কতদিন। মরনি আম্মারে আমি দেহি না। গেরামের কোনও মাইনষেরে দেহি না। আর কেঐরে দেহনের আমার কাম নাই। আমি খালি ইট্টু মরনি আম্মারে দেহুম। বাবা, ও বাবা। মা রে বুজাও। আমারে বাড়িত থনে বাইর অইতে দেও।
মেয়ের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে আনল দবির। তারপর উঠে দাঁড়াল। ল।
আচমকা এভাবে রাজি হয়ে গেছে দবির, নূরজাহান তো থতমত খেলই, তারচেয়ে অনেক বেশি থতমত খেল হামিদা। হাতে শেষ মউলকাটা ধরা, সেই অবস্থায় দবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কও কী তুমি? ও নূরজাহানের বাপ, আরে কও কী তুমি? মাইয়া কইলো আর তুমি রাজি অইয়া গেলা?
দবির গম্ভীর গলায় বলল, হ, অইলাম। মরনি বুজির বাইত্তে গেলে অসুবিদা কী? তোমার মনে নাই হুজুরের মুখে ছ্যাপ দেওনের পর মরনি বুজি অরে কেমতে হামলাইয়া রাখছিল। মরনি বুজি বহুত ভাল মানুষ। হের বাইত্তে গেলে আমার মাইয়ার কোনও ক্ষতি অইবো না।
নূরজাহানের হাত ধরল দবির। ল মা, ল।
নূরজাহান একটা লাফ দিল। যেন জীবনে এত আনন্দিত কোনওদিন হয় নাই। দবিরের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে গিয়া কোষানাওয়ে চড়ল। তাদের পিছন পিছন দৌড়ে গেল কুকুরটা। সে আর নাওয়ে চড়ল না। পারে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে লাগল।
বর্ষার পানিতে রোদ পড়ে ভারী মনোরম একটা পরিবেশ চারদিকে। আম কদম, হিজল বউন্না আর বাঁশঝাড় স্তব্ধ হয়ে আছে শ্রাবণ দিনের রোদে। কইফফার ছাড়ায় এইমাত্র বাবা কানিবক ঠোঁটে করে দুইটা চেলামাছ নিয়া বাসায় ফিরেছে। এখন আদর করে ছানাদের খাওয়াবে। এই ফাঁকে মা কানিবক যাবে খাবার আনতে। সে না ফিরা তরি বাপ বসে বসে পাহারা দিবে।
মানুষের লগে পাখিদের বিস্তর ফারাক, আবার বিস্তর মিলও। পাখিরা ওড়ে, কখনও কখনও মানুষও ওড়ে। এই এখন যেমন নূরজাহান উড়ছে। বসে আছে কোষানাওয়ে, বাপ নৌকা বাইছে, তবে মনে মনে উড়ছে নূরজাহান। ওদিকে বাপ মেয়ের কাণ্ড দেখে রান্নাচালায় পাথর হয়ে আছে হামিদা। শেষ মউলকার অর্ধেকখানি তখনও হাতে।
.
পাটাতন ঘরের দরজার সামনে আসনপিড়ি করে বসেছে মজনু।
পরনে নীল ডোরাকাটা লুঙ্গি। খালি গায়ে গলার কাছে মাফলারের মতন ফেলে রেখেছে পুরানা গামছা। সামনে একটা জলচৌকি। জলচৌকিটা রেখেছে কপাটের লগে ঠেস দিয়া যাতে হঠাৎ ছুটে আসা বাতাসে কপাট নড়াচড়ার সুযোগ না পায়।
জলচৌকির উপর মুখ বানানোর (গোঁফ দাড়ি কামানোর) জিনিসপত্র রেখেছে মজনু। টিনের ছোট সাইজের বাটিতে অর্ধেক ক্ষয় হওয়া লাক্স সাবান, অ্যালুমিনিয়ামের মগে আধামগ পানি। সামনে কপাটের লগে ঢেলান দিয়া দাঁড় করাইছে একটা হাত আয়না। এই আয়নাটা বহুকালের পুরানা। লাল রঙের বিঘত পরিমাণ লম্বা আর বিঘতের সামান্য কম পরিমাণ চওড়া কাঠের ফ্রেমে আটকানো আয়না। সেই আয়নার আবার কায়দার অন্ত নাই। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নাই এটা আয়না। দুইহাতে টেনে খুললে দেখা যায়। কাঠের একদিকে মুখ দেখার আয়না বসানো, অন্যদিকটা, মাটিতে বা যে কোনও জায়গায় আয়না যাতে স্থির হয়ে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা। আজকাল এই ধরনের আয়না আর দেখা যায় না।
