হয়তো কথাবার্তা আরও কিছু হত দুইজনের, নূরজাহান এসে মউলকা মুখে দেওয়ার পর কথাবার্তা অন্যদিকে ঘুরে গেল। হাতমুখ ধধায়া নিয়া মা-মেয়ে লেগে গেল আর সেই ফাঁকে দবির আবার গেল উদাস হয়ে।
নূরজাহানকে দেখেই কুকুরটা উঠে দাঁড়িয়েছিল। কুকুরদের চিরকালীন কায়দায় শরীর একবার টানা দিল তারপর নূরজাহানের অদূরে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়াতে লাগল। মুখটা আদুরে ভঙ্গিতে নূরজাহানের দিকে ফিরানো। ভঙ্গিটা এমন, যেন নূরজাহানকে বলছে, তুমি একলা খাইতাছো ক্যা? আমারেও ইট্টু দেও। বিয়ান অইছে, আমারও তো খিদা লাগছে!
কুকুরটার দিকে ফিরাও তাকাল না নূরজাহান। মউলকা খেতে খেতে মা’র লগে তর্কাতর্কি লাগায়া দিল। কাজির জিনিস মুখ না ধুইয়া খাওন ভাল। কাজিতে যা গন্দ, হারাদিন মুখ থিকা হেই গন্দ যায় না। এর লেইগা কাজি খাইয়া ছাই আর নাইলে কয়লার গুঁড়া দিয়া দাঁত মাজন লাগে। অনেকক্ষুন ধইরা দাঁত মাজলে তয় গন্দ কমে। আমপাতা প্যাঁচাইয়া দাঁতে ঘসলেও গন্দ কমে।
হামিদা মুখঝামটা দিয়া বলল, এত প্যাচাইল পারবি না মাগি। খাইতাছস খা।
মেয়ে আসার পর এই প্রথম কথা বলল দবির। তাও মেয়েকে না, মেয়ের মা’কে বলল, এমুন করতাছো ক্যা মাইয়াডার লগে? ও খাউক না অর মতন।
হামিদা দবিরের দিকে তাকাল। অরে আমি খাইতে না করছি? কইছি হাতমুখ ধুইয়া খা।
অহন খাউক। পরে ধুইবো নে।
ততক্ষণে পরের মউলকাটা তৈরি। নূরজাহান সেটাও দুইহাতে ধরে কামড় দিয়েছে।
এসময় কুকুরটা একটা খেউক্কানি দিল। কুকুরটার দিকে তাকাল নূরজাহান। হাসিমুখে বলল, কী রে ভাদাইম্মা, খেউক্কাছ ক্যা? খিদা লাগছে?
ভাদাইম্মা আবার খেউক্কানি দিল।
আর খেউকান লাগবে না। বুজছি তরও খিদা লাগছে।
নিজের মউলকা থেকে একটুখানি ছিঁড়ে ভাদাইম্মার দিকে ছুঁড়ে দিল নূরজাহান। ভাদাইম্মা। ঝাঁপিয়ে পড়ে টুকরাটা মুখে দিল। দিয়ে চাবাতে চাবাতে কৃতজ্ঞ চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
এভাবে নূরজাহান যতক্ষণ খেল, কুকুরটাকেও দিল একইভাবে। চার-পাঁচখান মউলকা খেয়ে পরিতৃপ্ত মুখে নূরজাহান চলে গেল ঘাটপারে। যাওয়ার আগে আমগাছের একটু পরিষ্কার ধরনের দুইটা পাতা ছিঁড়ল। সেই পাতা একত্রে প্যাঁচায়া দাঁতনের মতন করল। তারপর দাঁতে ঘষতে ঘষতে ঘাটপারের দিকে চলে গেল। ভাদাইম্মাও গেল তার পিছন পিছন। কাল বিকালে কোথা থেকে যে এল কুকুরটা। এসেই বাড়ির মেয়েটার বাধুক হয়ে গেল। যেন এই বাড়ি তার বহুদিনের পরিচিত। যেন বাড়ির মেয়েটা তার খুবই আপন।
নূরজাহান দাঁত মেজে, হাতমুখ ধুয়ে ফিরা আসার ফাঁকে তিনটা মউলকা খেয়েছে দবির। হামিদা ভেজে দিয়েছে আর সে খেয়েছে। একটাও কথা বলে নাই। চার নম্বর মউলকাটা। দেওয়ার সময় শুধু বলছে, আর খামু না।
হামিদা অবাক। ক্যা?
পেড ভইরা গেছে।
কও কী?
হ।
মাইয়ায় খাইলো পাঁচহান মউলকা আর তুমি তিনডা? তিনডায় পেড ভইরা গেল?
হ ভরছে। অহন যেই কয়ডা হয় তুমি খাও।
পুরানা একটা ঠিলা থাকে রান্নাচালায়। পানি ভরাই থাকে। বর্ষার পানিই। তবে একটুকরা ফিটকারি ঠিলায় সবসময় ফেলে রাখে হামিদা। তাতে পানিটা পরিষ্কার থাকে। ফিটকারির গুণে পানির ভাসমান ময়লা গুড়াগাড়ি সব গিয়া জমে তলায়। আর ঠিলার মুখে ছোট্ট একটা সরা উলটা করে বসিয়ে রাখে। বাইরের ধুলা ময়লা কিছুই ঢুকতে পারে না ঠিলায়।
অ্যালুমিনিয়ামের যে মগে বছরের প্রথম দিনকার রস খায় নূরজাহান সেই মগটা ঠিলার পাশে। ঠিলা কাত করে আধামগ পানি খেল দবির। এখন আবার তামাকের নেশা ধরছে। এখনই তামাক সাজাবে কি সাজাবে না ভাবছে, নূরজাহান পিছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরল। তারপর ওই কথা, ওই কাণ্ড!
মেয়ের কথা পাত্তা দিল না হামিদা, হুঁকা গড়ায়া পড়ছে, হুঁকার পানি সব পড়ে যাচ্ছে দেখে মহা বিরক্ত হল। দাঁত মুখ খিচায়া বলল, ইস, এই মাগি যা অইছে। এমুন আজদাহা। মাগি জামাই বাইত্তে গিয়া টিকবো কেমতে? মাগির কাম কাইজ তো…
হামিদার কথা শেষ হওয়ার আগেই দবির বলল, অইছে। সব সময় মাইয়াডারে বকাবাজি কইরো না।
নূরজাহানকে ছেড়ে এবার দবিরকে ধরল হামিদা। তোমার আহ্লাদে আহ্লাদে এমুন অইছে মাইয়াডা। ডাঙ্গর মাইয়ার চলন বলন এমুন অইবো ক্যা? মরদা বেডাগো মতন আপরাইয়া দাপড়াইয়া চলে। মাইয়াগো চলন বলন অইবো নরম সরম। অর চলন বলন তো নরম সরম না।
দবির কথা বলবার আগেই নূরজাহান বলল, মা, তোমার মউলকা পুইড়া গেল। তাড়াতাড়ি উড়াও।
আসলে মায়ের মন অন্যদিকে ঘুরাবার জন্যই কথাটা বলল নূরজাহান।
একথায় কাজ হল। হামিদা মন দিল খোলার দিকে। শেষ মউলকাটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলল। আগের একখান মউলকা পড়ে আছে কুলায়। তারপাশে শেষটা রাখল। এই দুইটা তার ভাগের। চুলা থেকে খোলা নামিয়ে, সবকিছু গুছগাছ করে মউলকায় কামড় দিল সে। হুঁকার পানি তখনও বুরুক বুরুক করে পড়ছে।
নূরজাহান বলল, তুমি চিন্তা কইরো না বাবা। যোক্কার পানি আমি ভইরা দিতাছি। আর এই পানিডা পইড়া ভাল অইছে। দেখছো পানি কেমুন হইলদা অইয়া গেছে। এই পানি এমতেই বদলানো উচিত।
দবির না, হামিদা বলল, অইছে বুজছি। অহন বাপরে কী কবি হেইডা ক। তোর তো এক কথার লগে পাঁচপদের কথা।
দবিরের গলা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতন দোল খেতে খেতে নূরজাহান বলল, না, অহন পাঁচপদের কথা না। অহন কথা একপদেরঐ।
