হামিদা তার স্বভাব মতন খ্যাচ খ্যাচ করে উঠল। দেখছো, দেখছো নি করে কী? ঘুম থিকা উইট্টা হাতমুখ না ধইয়া, দাঁতৰ্দোত না মাইজ্জাঐ মউলকা ধরলো? এই ছেমড়ি তো দুইন্নাইর গিদর (গিধর, শুকুর)।
নূরজাহান মউলকায় কামড় দিয়া হি হি করে হাসল। হাতমুখ পরে ধুমু। দাঁত মাজুম পরে।
ক্যা, পরে ক্যা? বাহি (বাসি) মুখে কেউ কিছু মুখে দেয়?
কাজির জিনিস বাহিমুখেঐ খাইতে অয়।
হামিদা পরের মউলকা খোলায় দিচ্ছে, নূরজাহান দুইহাতে মউলকা ধরে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। মুখে কচর কচর শব্দ আর গভীর তৃপ্তি। মেয়ের এই মুখ খেয়াল করবার সময় নাই হামিদার। সে আছে তার কাজে।
দবির খেয়াল করল।
অনেকক্ষণ তামাক টেনে, মেয়ের মা’র লগে নানান পদের কথা বলে এখন সে আবার আগের মতন চুপচাপ, উদাস। ভোরের সেই কাজির পানির মতন আলো কেটে গিয়ে। কখন রোদ উঠল, কখন কাজিবাটা শেষ করে মউলকা ভাজতে শুরু করল হামিদা, কখন। ঘুমভাঙা নূরজাহান ছুটে এল রান্নাঘরে কিছুই আসলে চোখে পড়ে নাই তার। সে আছে তার নিজের মধ্যে। মাওয়ার বাজার থেকে সাঁতরে এসে দুনিয়ার ক্লান্তি ছিল শরীরে। ভাতপানি খেয়ে শুয়ে পড়েছিল ঠিকই, নাকও ডাকাতে শুরু করেছিল তবে সেই নাক ডাকানো আসল ডাকানো না। মেয়ের মা’কে বুঝ দেওয়া, দেখো গো নূরজাহানের মা, হুইয়া পড়নের লগে লগেঐ ঘুমাইয়া গেলাম। এতাহানি জাগা হাতড়াইয়া শইল্লের আর কিছু নাই।
আসলে একফোঁটা ঘুমও কালরাতে ঘুমায় নাই দবির। চেষ্টা করেছে, ঘুম আসে নাই। মনের মধ্যে সারারাত উথাল পাথাল করেছে ল্যাংড়া বসিরের কথা, মান্নান মাওলানার কথা। শেষতরি এই রাস্তা ধরল শালার পো শালায়! আমার মাইয়ার উপরে শোধটা হেয় এইভাবে লইবো? ঘরের বউ কইরা? তাও পোলার বউ করলে নাইলে একহান কথা আছিলো! নিজের বউঐ করতে চায় আমার এতড়ু মাইয়াডারে! আর একবার যুদি কারবার হেয় করতে পারে, তয় আমার নূরজাহানের কী অইবো? মাইয়াডা বাঁচবো কেমতে? অরে নানানপদের অইত্যাচার কইরা মারবো! মুখে ছ্যাপ দেওনের শোদহান লইবো না?
এইডা গেল একটা দিক, আরেকদিকে আমার নূরজাহানের জীবনের সাদআহ্লাদ, জামাইর কাছে মাইয়ারা যা চায় তার কী পাইবো ওই বুইড়া খাডাসের কাছ থিকা! খালি শাড়ি আর গয়না, জাগা সম্পত্তি থাকলেই কি মাইয়ারা খুশি অয়? আরও কিছু চায় না তারা?
একদিকে ঘুমের ভান করে নাক ডাকাচ্ছে দবির, আরেকদিকে মনের ভিতর চলছে। এইসব ভাবনা। হাতের কাজ শেষ করে হামিদা এসে শুয়েছে বাপমেয়ের মাঝখানে। মেয়ে গভীর ঘুমে, বাপও নাক ডাকাচ্ছে, তারপরও স্বামীর বুকে হাত রেখেছে হামিদা। হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিস করে স্বামীকে ডেকেছে। ঘুমাইলা? ও নূরজাহানের বাপ, ঘুমাইলা?
দবির শুনল সবই, মেয়ের মায়ের হাতের ছোঁয়ায় অন্যান্য দিনের মতনই আরামটা লাগল। শরীরে তয় সেই আরামে বুকের ভিতর থেকে ঠেলে উঠতে চাইল অতিকষ্টের এক কান্না। দুইজন মানুষের কত মায়া মমতার ফল, কত আদর সোহাগের ফল একটি মাত্র মেয়ে। সেই মেয়ের কপালে এত বড় বড় বিপদ কেন লিখে দিলেন আল্লাহপাক! মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ ছিটায়া দিয়া একটা গুনাহ না হয় করে ফেলেছিল নাদান মেয়েটি। সেই গুনার। ফল আর কত ভাবে ভোগ করবে মেয়ে? পাখির মতন উড়ে বেড়ানো মেয়েটার তো বাড়ি থেকে বের হওয়াই বন্ধ হয়ে গেছে। বনের পাখি হয়ে গেছে খাঁচার পাখি। তারপরও তার গুনাহ মাফ হয় না!
মেয়ের মায়ের হাতের ছোঁয়ায় যখন উথলে উঠতে চাইল কান্না, যেন ঘুমের ঘোরেই পাশ ফিরছে দবির, এমন করে পাশ ফিরল। আসলে কান্না সামাল দিল। তারপর আবার সেই আগের মতনই নাক ডাকানো।
হামিদা বুঝল, এই ঘুম এখন আর ভাঙবে না গাছির। থাক, ঘুমাক। ল্যাংড়া বসির কেমন সমন্দ আনল সেকথা শোনার অনেক সময় আছে।
হামিদা তারপর নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে।
স্ত্রীকন্যার গভীর ঘুম রাতভর টের পেয়েছে দবির। দু’জন ঘুমন্ত মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দে বুঝেছে এই ঘুম সকালের আগে ভাঙবে না। তাদের পাশে শুয়ে যে একজন মানুষ ঘুমের ভান করে পড়ে আছে, মনের ভিতর যে তার চলছে অতিকষ্টের এক কায়কারবার এক আল্লাহমাবুদ ছাড়া কেউ তা টের পাচ্ছে না।
এই করে করে রাতটা দবির কাটিয়েছে।
খাইগোবাড়ির মাইক থেকে যখন ভেসে আসছে ফজরের আজান, সেই শব্দে তারপর উঠেছে সে। হুঁকা তামাকের মালশা হাতে ঘর থেকে বের হয়েছে। ছনছায় শুয়ে ছিল কুকুরটা। দবিরকে দেখে খেউক্কানি দিল। তার পিছন পিছন হেঁটে গেল রান্নাচালা তরি। দবির বসল তামাক সাজাতে, কুকুরটা অদূরে, উঠানের কোণে বসে লেজটা দিয়া রাখল দবিরের দিকে। মাথা চক বরাবর। যেন কঠিন এক পাহারাদার সে। এই বাড়ির দিকে চোর ডাকাত বালা মুসিবত কোনও কিছুই আসতে দিবে না। সব ঠেকায়া রাখবো।
তামাক সাজাতে সাজাতে কুকুরটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে দবির বলেছিল, যেই বিপদ এই বাড়িমিহি আইতাছে, ভাদাইম্মারে, বাজান, হেই বিপদ তুই আমি কেঐ ঠেকাইতে পারুম না। মান্নান মাওলানা মানুষ না। ওই শালার পো শালায় অইলো ইবলিস। ইবলিস শয়তান। অরে ঠেকাইতে পারে একমাত্র আল্লাহমাবুদে।
তারপর ধীরে ধীরে আলো ফুটল। হামিদা উঠে তার কাজকাম শুরু করল, রাতের কথাগুলি দিনের ফুটে ওঠা আলোয় জানতে চাইল। দবির অবিরাম মিথ্যাকথা বলে গেল। একটা মনই দুইটা ভাগ হয়ে গেল তার। একমন মিথ্যা বলে, মেয়ের মা’কে প্রবোধ দেয় আর অন্যমন হায় হায় করে, না না করে। নূরজাহানের মা গো, আমি যা কইতাছি বেবাক মিছাকথা। বেবাক। একটাও হাছাকথা না। ঘটকায় যার লেইগা তোমার মাইয়ার সমন্দ আনছে হেই শালার পো শালার নাম মান্নান মাওলানা।
