হেইডা বুজলাম। তয় মাইয়ার জীবনে কোনও সাধ আহ্লাদ থাকবো না। ওই বুইড়া বেডায় মাইয়ার সাধ আহ্লাদ মিটাইবো কেমতে?
হেইডা কেঐ ভাবে না। ভাবে খালি ভাত কাপড়ের কথা। মাইয়া য্যান খাইয়া পইরা বাঁইচ্চা থাকে, খালি ওইডাই চিন্তা করে।
আমরা ওইডা চিন্তা করুম না। আমগো ছোট্ট একহান বাড়ি আছে, দশগন্ডা জমিন আছে। একহান মাত্র মাইয়া। কিছু টেকাপয়সাও মাইয়ার লেইগা জমাইছি, এই হগল। বেবাক দিয়া দিমু মাইয়ারে। দরকার অইলে জামাইরে ঘরজামাই রাখুম। দরকার অইলে একওক্ত খাওয়াইয়া রাখুম মাইয়ারে, দরকার অইলে না খাওয়াইয়া রাখুম, তাও বুইড়া ধুইরার কাছে মাইয়া বিয়া দিমু না।
দবির তামাক টানতে টানতে আবার উদাস হয়ে গেল। মনে মনে বলল, নূরজাহানের মা গো, এই হগল মিছাকথা হুইন্নাঐ তুমি এমুন কথা কইতাছো? যুদি আসল কথা হোনো তয় তো দাপড়াইয়া মইরা যাইবা। আসল কথা আমি তোমারে কইঐ নাই। ওইডা হোনলে। তুমি দাপড়াইয়া মরবা, কাইন্দা মরবা। আমার মতন মুলাম মানুষও হেই কথা সইজ্জ করতে পারি নাই। হেই কথা হুইন্না ঘটকার নাওয়ে উঠতে আমার ঘিন্না লাগছে। নৌকার তলিমলির কথা হাছাকথা না, মিছাকথা। আমি ওই কথা হুইন্না অর নাওয়েই উডি নাই। মাওয়ার বাজার থিকা এই মেদিনমণ্ডল তরি পুরাডা রাস্তা হাতড়াইয়া আইছি। তোমরা। ডরাইবা দেইখা আসল কথা কই নাই। তোমার মাইয়ার বিয়ার লেইগা কার সমন্দ আনছে ঘটকায় হোনবা? ওই বান্দরডার। ওই শুয়োরের পোর। শুয়োরের পোর নাম অইলো মান্নান। আবদুল মান্নান। নামের লগে মাওলানা কথাডাও আছে। ওর মতন শুয়োরের নামের লগে মাওলানার মতন পাক পবিত্র কথাটা কওন উচিত না। এর লেইগা আমি কইতাছি না।
মনে মনে এসব কথা বলে দবির আরও উদাস হয়।
আকাশ তখন আরও ফরসা হয়েছে। বাঁশঝাড়, আম কদমের গাছ, হিজল বউন্নার গাছ থেকে ধীরে ধীরে কাটছে অন্ধকার। ধইনচাখেতের ভিতরকার অন্ধকার সরিয়ে ঢুকতে শুরু করেছে আকাশ থেকে নেমে আসা আলো। দবিরের উঠান পালানে কাক চরছে, শালিক চরছে। দোয়েল পাখিটা আলো দেখে ফিরে গেছে পুকুরের ওপারকার ডুমুরঝোপে। কইফফার ছাড়ার ওদিকে কানিবক দুইটা ব্যস্ত হয়েছে ছানাদের আহার জোটাতে। একটা উড়ে যাচ্ছে আহার আনতে, আরেকটা পাহারা দিচ্ছে। আহার নিয়া ফিরে আসার পর অন্যটা উড়াল দিচ্ছে একই কাজে। দুইটা অবোধ পাখি কী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ছানাদেরকে বাঁচাবার জন্য।
দবির মনে মনে বলল, আর আমি? আর হামিদা? আমরা দুইজনও তো চেষ্টা করছি আমগো একটা মাত্র সন্তানরে ওই বদমাইশটার হাত থিকা বাঁচাইতে। বদমাইশটা তো ক্ষুধার্ত দাঁড়াইস সাপ। ধীরে ধীরে আগাইতাছে আমগো বাসার দিকে। ছোবল দেওনের সব পথ সে তৈয়ার কইরা ফালাইছে। এখন শুধু ছোবলটা দিবো।
দবির কী করে ঠেকাবে সেই ছোবল? হামিদা কী করে ঠেকাবে?
পিছন থেকে দবির গাছির গলা জড়িয়ে ধরে নূরজাহান বলল, ও বাবা, আইজ আমার একখান কথা তোমার হোননই লাগবো।
দবির আগের জায়গায়ই বসে আছে। এখন আর তামাক টানছে না। তামাক টিকার মালশা রাখা আছে পাশে। হুঁকা দাঁড় করিয়ে রাখা রান্নাচালার খুঁটির লগে। খুঁটিটা বাশের। একটু পুরানা, একটু নড়বড়া। তবু কায়দা করে সেই খুঁটির সঙ্গে হুঁকা দাঁড় করিয়েছে দবির। একটুখানি ধাক্কা বা মাটির মৃদু কাঁপনেই গড়িয়ে পড়বে হুঁকা। নূরজাহান খেয়াল করে নাই। চার-পাঁচখান কাজির মউলকা খেয়ে পেট মন দুইটাই ভরে গেছে। ভারী একটা আমুদে ভাব আসছে শরীরে। এই অবস্থায় বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে। ফলে হুঁকা দাঁড় করিয়ে রাখা খুঁটিটায় একটু ধাক্কা লাগল। হুঁকা গড়িয়ে পড়ল রান্নাচালার মাটিতে। কলকিটা বসানোই ছিল কার মাথায়। সেই কলকিসহ দুই-তিনখান গড়ান খেল হুঁকা, তারপর স্থির হল ঠিকই তবে কার পানি বুরুক বুরুক করে পড়তে লাগল। কাজির তীব্র গন্ধের লগে হুঁকার পানির গন্ধ মিলেমিশা অদ্ভুত একটা গন্ধ ছুটল চারদিকে।
হাতের পাঞ্জা সাপের ফণার মতন করে খাদা চেঁছে শেষ কাজিবাটাটুকু খোলায় দিয়েছে হামিদা। খোলাটা চিতনা। মাটির তৈরি ঠিকই তবে অনেকটাই লোহার তাওয়ার মতন। পুরানা ভাতের হাঁড়ি কায়দা করে ভেঙে চিতনা খোলাটা নিজেই বানিয়ে নিয়েছিল হামিদা। এই ধরনের খোলায় মউলকা, চিতইপিঠা এসব ভাজতে খুব সুবিধা।
এখন চিড়বিড়ায়া উঠছে সকালবেলার রোদ। সেই কোন ভোরে উঠে কাজি বাটতে বসেছিল হামিদা। বাটা শেষ করে খাদায় রেখে কাজির পানি মিশিয়েছিল। ওদিকে চুলায় জ্বলে গেছে আগুন, ভোলা বসে গেছে তিনমাথার চুলায়। নারকেলের আইচা দিয়া তৈরি করা হাতায় করে তপ্ত খোলায় ঢালা হয়েছে কাজিবাটা। চকচকা বড় একখান ঝিনুকের একটা পিঠ বহুবছর ধরে মউলকা বানাবার কাজে ব্যবহার করে হামিদা। সেই ঝিনুক দিয়া তারপর খোলার কাজিবাটা উঠান লেপার মতন করে লেপে দিয়েছে। অতি দ্রুত হাতে করা কাজ তাতেও মিশে ছিল গভীর যত্ন। ফলে পলকেই চড়চড় করে ভাজা হল মউলকা। পিয়াজ কাঁচা মরিচের কুচি একটু কাঁচা কাঁচা, মউলকা পুরাপুরি ভাজা। দারুণ একখান গন্ধ ছড়িয়ে ছিল চারদিকে!
এসব কাজের ফাঁকে ফাঁকেই চলছিল নূরজাহানের বিয়ের কথাবার্তা।
টিনের পাতলা খুন্তি দিয়া মাত্র প্রথম মউলকা তুলে পুরানা কুলায় রেখেছে হামিদা, ঘুমভাঙা চোখে নূরজাহান এসে দাঁড়াল বড়ঘরের দরজায়। ওই অতটা দূর থেকেই দেখতে পেল প্রথম মউলকা খোলা থেকে নামছে। আর দিকপাশ তাকায় নাই, ছুঁইটা আসছে রান্নাচালায়। প্রায় থাবা দিয়া নিছে মউলকা।
