দবির চমকাল। ধইনচাখেতের উপরকার আকাশ থেকে চোখ ফিরাল হামিদার দিকে। তামাক টানা বন্ধ হল। কী অইবো? কিছু হয় নাই?
মিছাকথা কইয়ো না।
কীয়ের মিছাকথা?
কিছু না অইলে এত বিয়ানে ঘুম থিকা উঠছে ক্যা?
ঘুম ভাইঙ্গা গেছে।
এত বিয়ানে ঘুম ভাঙলো ক্যা?
এইডা কেমুন কথা কও? ঘুম ভাঙতে পারে না?
হ পারে। তয় ওইডা শীতের দিনে। শীতের দিকে এত বিয়ানে উইট্টা তুমি রস পাড়তে যাও। অন্য দিনে এত বিয়ানে তোমার কোনওদিন ঘুম ভাঙ্গে না।
আইজ ভাঙছে।
কীর লেইগা ভাঙছে?
হেইডা কেমতে কমু। ঘুম ভাঙ্গনের লগে লগে উটতে চাই নাই। অনেকক্ষুন হুইয়া রইছিলাম। তারবাদে এমনু তামুকের নিশা ধরল, উইট্টা গেলাম।
দবির একটু হাসির চেষ্টা করল, হাসিটা তেমন ফুটল না। কথা ঘুরাবার চেষ্টা করল। তুমি আথকা কাজি বাটতে বইলা ক্যা?
তোমার মাইয়ায় মউলকা খাইতে চাইছে।
তাইনি?
হ।
তয় বানাও মউলকা। মাইয়ায় খাইবোনে, আমিও খামুনে। কাজির মউলকা আমারও বহুত সাদ লাগে।
ওইডা আমি আগেঐ চিন্তা করছি। আইজ বিয়ানে বেবাকতেই আমরা মউলকা খামু। তয় তোমার অইছে কী হেইডা কও। আমার কাছে কিছু ছুপায়ো না।
কী ছুপামু তোমার কাছে, কও?
আসলে কী অইছে হেইডা কও।
কইলাম তো কিছু অয় নাই।
তামাক সাজাতে ব্যস্ত হল দবির। মালসা থেকে পরিমাণ মতন তামাক নিয়া কলকিতে ঠেসে দেওয়ার আগে জ্বলে প্রায় শেষ হয়ে আসা টিকাটা মাটিতে ফেলল। কলকিতে তামাক দেওয়ার পর সেই জ্বলন্ত টিকা কায়দা করে কলকিতে দিয়া গুড়ক গুড়ক করে টানতে লাগল। কয়েক টানের মাথায় তামাকের নেশা ধরানো একটা গন্ধ ছুটল। সেই গন্ধে মন। চনমন করে উঠল দবিরের, মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
হামিদা বলল, ঘটকায় তোমারে মাওয়ার বাজারে ডাইক্কা নিছিলো ক্যা?
দবির জানে এই প্রশ্নটা উঠবেই। কালরাতে সঁতরে আসার বানোয়াট গল্প বলে, খিদার কথা বলে, দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে হামিদার এসব প্রশ্ন সে এড়াতে পেরেছে। এখন আর এড়াবার পথ নাই।
মনে মনে বহু রকমের মিথ্যা কথা বলবার জন্য তৈরি হয়ে গেল সে। সাঁতরে বাড়ি আসার পর যেমন চটপটা হয়ে গিয়েছিল হঠাৎ করে আবার তেমন হল। বোঝো নাই ঘটকায় কীর লেইগা আমারে এমুন খাতি কইরা বাজারে লইয়া গেল? কীর লেইগা চা মিষ্টি আর সিকরেটের পর সিকরেট খাওয়াইলো?
বুজছি।
কী বুজছো কও তো?
নূরজাহানের লেইগা সমন্দ আনছে।
হ।
কেমুন সমন্দ?
সমন্দ খারাপ না। তয়…
তয় কী?
আমার মনে অয় হেই সমন্দ তোমার পছন্দ অইবো না।
ক্যা, অইবো না ক্যা? পোলা ভাল না?
পোলা ভালই।
তয়?
দোজবর।
কাজির চাউল বাটতে বাটতে চমকাল হামিদা। দোজবর?
হ।
সতিন আছে?
না। সতিন নাই। সতিন মইরা গেছে।
পোলাপান আছে না?
আছে।
তয় পোলার বস ম্যালা অইবো।
হ হেইডা অইবো।
পোলায় করে কী?
গিরস্তি করে।
পোলাপান কয়ডা?
তিনপোলা দুই মাইয়া। বড় পোলাড়া মইরা গেছে।
অবস্থা কেমুন?
বিরাট অবস্থা, বিরাট। জাগাজমিন আছে ম্যালা। মাইয়াগো বিয়াশাদি দিয়া হালাইছে।
বাড়ি কোন গেরামে?
দবির হামিদার দিকে তাকাল। এইহানে ঘটকার পোয় একহান চালাকি করছে।
কেমুন চালাকি?
পোলা যে কোন গেরামের হেইডা কয় নাই।
ক্যা?
বুজলাম না।
তুমি জাননের চেষ্টা করো নাই?
ম্যালা চেষ্টা করছি। কাম অয় নাই। কয়, গাছিদাদা, আগে আপনে রাজি হন, তারবাদে আমি আপনেরে বেক কথা কমু।
এইডা কেমুন কথা? পোলা না দেইক্কা, তার বেবাক কিছু না জাইন্না কেউ মাইয়া বিয়া দিতে রাজি অয়নি?
হ। আমিও ঘটকারে ওই কথাই কইছি।
তারপর অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করল হামিদা। তোমার কী মতলব?
কীয়ের মতলব?
যেই পোলার পাঁচহান পোলাপান, দুই মাইয়ার বিয়া দিয়া হালাইছে, বুঝাই যায় হেই পোলার ম্যালা বস। তোমার মতন বস অইবো…
আমার থিকা বড়ও অইতে পারে।
হ। তয় অমুন পোলার লগে তুমি কি তোমার মাইয়া বিয়া দিবা?
তামাক টানা থামিয়ে আবার হামিদার দিকে তাকাল দবির। তোমার কী মনে অয়?
আমার যেইডাঐ মনে হোক, তুমি তোমার কথা কও।
না, আমি আগে তোমার হুনুম।
কাজিরচাউল অনেকখানি বাটা হয়ে গেছে। সেই বাটা চাউল পাটা থেকে কাচিয়ে কাচিয়ে অন্য একটা খাদায় রাখল হামিদা। তারপর বাকি চাউলটুকু পাটায় নিয়া বাটতে বাটতে বলল, মইরা গেলেও দিমু না। আমার মাইয়ার যদি জিন্দেগিতেও বিয়া না অয় তাও দিমু না। দরকার অইলে হারাজীবন আবিয়াত থাকবো, তাও অমুন বুইড়ার কাছে বিয়া দিমু না।
দবির গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে মুখের এমন একটা ভঙ্গি করল যেন সেও হামিদার লগে একমত। বলল, ঠিক, একদোম ঠিক। আমিও হেইডাই কই। সারাজীবন আবিয়াত থাকলেও অমুন পোলার কাছে নূরজাহানরে বিয়া দিমু না। ওই বেডার মাইয়ার ঘরের নাতিনরাই অইবো আমার নূরজাহানের বসসি।
শেষ দুইমুঠ চাউল বাটতে বাটতে হামিদা খুবই চেতল। ঘটকার পো ঘটকায় আমার মাইয়ার লেইগা এইরকম সমন্দ আনলো কেমনে? ওরে তুমি জুতাদা দুইডা বাড়ি দেও নাই ক্যা?
দবির ম্লান মুখে হাসল। আমি যদি বড় গিরস্ত অইতাম তয় ঘটকার পো ঘটকারে ঠিকঐ জুতার বাড়ি মারতাম। তখন অয় এইরকম সমন্দ লইয়া আমার কাছে আহনের সাহস পাইতো না। আমরা গরিব মানুষ, নূরজাহান গরিব গাছির মাইয়া, এর লেইগা শালার পো শালায় সাহসটা পাইছে। অনেক গরিব মানুষ আবার আছেও, পাঁচ-দশখান পোলাপান আছে, বড় গিরস্ত, বেডার বস অইবো সইত্তর-আশি, তাও ষোলো বইচ্ছইরা মাইয়া বিয়া দিয়া দেয়। কী করবো কও। মাইয়ার জীবন তো বাঁচাইতে অইবো।
