এখনও তেমন হল। হাসতে হাসতে চোখ পানিতে ভরে গেল। হাসির চোটে ফেটে যেতে যেতে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল।
মজনু আবার বলল, কী অইছে? হাসতে হাসতে মইরা যাইতাছস দিহি!
হাসির চোটে তখনও কথা বলতে পারছে না নূরজাহান। আঙুল তুলে ছাপড়া ঘরের ওদিকটা দেখাল। মজনু তাকাল ঠিকই কিছুই বুঝতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল, ওই মিহি কী দেহাচ? ওহেনে হাসনের কী দেকলি?
খয়েরি চাদর পরা লোকটা তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে আগের জায়গায়। মজনু ভাবল ওই লোকটাকে দেখে বুঝি হাসছে নূরজাহান। এমন করে বসে থাকা একটা লোককে দেখে হাসার কী হল! যে ভঙ্গিতে বসে আছে, দেখেই বোঝা যায় অসহায় মানুষ। একে দেখে হাসি পাওয়ার কথা না, মায়া লাগার কথা।
নূরজাহানকে ধমক দেওয়ার জন্য তৈরি হল মজনু। ঠিক তখনই নূরজাহান বলল, আপনে অহনতরি বোজেন নাই আমি কীর লেইগা হাসতাছি।
মজনু গম্ভীর গলায় বলল, না।
কনটেকদারের মিহি চান।
মজনু আবার তাকাল, এবারও কিছু বুঝতে পারল না।
নূরজাহান বলল, অহনও বোঝেন নাই?
না।
ধুরো আপনে একখান বলদ (বোকা অর্থে), দেকতাছেন না কনটেকদারের মাথার উপরে ছাতি মেইল্লা (মেলে) ধরছে এক বেডায়।
হ দেকতাছি।
অহন কি রইদ আছে না ম্যাগ অইতাছে যে ছাতি লাগবো!
এবার ব্যাপারটা বুঝল মজনু। বুঝে হাসল। ও এর লেইগা হাসতাছস?
হাসুম না? এইডা তো হাসনেরঐ জিনিস।
আর আমি মনে করছি ঐ যে চাইদ্দর গায়দা (গায়ে দিয়ে) বইয়া রইছে ঐ বেডারে দেইক্কা হাসতাছস।
ভুরুর অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে মজনুর দিকে তাকাল নূরজাহান। ঐ বেডারে দেইক্কা হাসুম ক্যা? ঐ বেডা কি হাসনের জিনিস! দেকলে তো মায়া লাগে!
মজনু আনমনা গলায় বলল, হ।
লন ঐ ঘরডার সামনে যাই, ঐ বেডারে দেইক্কাহি আর হাজের সমায় ছাতি মাথায় দেওয়া কনটেকদাররে ইট্টু খোঁচাইয়াহি (খুঁচিয়ে আসি)।
মজনু গম্ভীর গলায় বলল, না।
নূরজাহানের উৎসাহে ভাটা পড়ল। ক্যা?
চিনাজানা নাই এমুন মাইনষের লগে খোঁচাখুচি করতে যাওন ঠিক না। কাইজ্জা কিত্তন লাইয়া যাইবো। এমতেঐ আউজকা মান্নান মাওলানারে চেতাইয়া দিছস। অহন আবার লাগাইতে চাইতাছস আরেক ভেজাল। আমি যামু না।
নূরজাহান হাসল। কনটেকদার সাবরে আমি চিনি। বহুত খাতির আমার লগে। হের লগে কত ফাইজলামি করি। হেয়ও করে। মুখের ভিতরে সোনায় বানদাইন্না দাঁত আছে হের। একদিন হাসতে দেইক্কা কইছিলাম আপনে যহন হাসেন মনে অয় ব্যাটারি লাগাইয়া হাসতাছেন।
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল নূরজাহান। মুখের ভিতরে কেউ চান্দা ব্যাটারি লাগাইতে পারে, কন?
এবার মজনুও হাসল। ইস তুই যে কী মাইয়ারে!
লগে লগে নূরজাহান বলল, তয় অহন লন।
মজনু অবাক হল, কই?
কনটেকদারের ঘরের ওহেনে।
তারপর মজনুকে আর কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে তার হাত ধরে হঠাৎ করেই নামার দিকে দৌড় দিল নূরজাহান। এমন আচমকা দৌড়, তাল সামলাতে না পেরে মজনুও দৌড় দিল। খাড়া ঢাল বেয়ে চলে এল ছাপড়াঘরটার সামনে। তবে তাল সামলাতে খুব একটা বেগ পেতে হল না। যেমন আচমকা মজনুর হাত ধরে দৌড় দিয়েছিল নূরজাহান ঠিক তেমন আচমকাই দৌড় থামিয়ে স্থির হল। কী করে যে পারল, কে জানে। বোধহয় এরকম দৌড়াদৌড়ির অভ্যাস তার অনেক দিনের। অভ্যাসে সব হয়।
নূরজাহানকে দেখবার জন্যই, নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলবার জন্যই ছাপড়াঘর থেকে বেরিয়েছে আলী আমজাদ। বেরিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেছে। সেই বেকায়দার নাম হেকমত। এমন ভঙ্গিতে আলী আমজাদের মাথার উপর ছাতি মেলে আছে, এমন উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের মুখের দিকে একটা কথাও পড়তে দেবে না তার আগেই কথা মতো কাজটা করে ফেলবে। ট্যান্ডলরা যে বিরক্তির কারণও হয় এই প্রথম আলী আমজাদ তা বুঝতে পারল। বুঝেও তার এখন কিছু করার নাই। অকারণে গম্ভীর হয়ে থাকতে হল। আড়চোখে নূরজাহান এবং মজনুর দিকে একবার তাকিয়ে জবুথুবু হয়ে বসে থাকা লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল। পেটের অনেক ভিতর থেকে শব্দ করে করে বলল, বাড়ি কবে?
প্রশ্নটা যে তাকে করা হয়েছে লোকটা প্রথমে বুঝতে পারল না। পেটের অনেক ভিতর থেকে শব্দ বের করেছে বলে আলী আমজাদের স্বর হয়ে গেছে জলদগম্ভীর। একে ওরকম শব্দ তার ওপর কোথায়কে বলছে কবে, আলী আমজাদের কায়দা কানুনের সঙ্গে যারা পরিচিত না, কথাবার্তার সঙ্গে যারা পরিচিত না তাদের পক্ষে এসব বোঝা মুশকিল। তবে কন্ট্রাক্টর সাহেবকে নিজের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে লোকটা ভড়কে গেছে। চোখে মুখে বেশ একটা চাঞ্চল্য। দিশাহারা গলায় বলল, আমারে জিগাইলেন?
আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই হেকমত বলল, তয় আবার কারে? এহেনে তুমি ছাড়া আর আছে কে?
লোকটা কাঁচুমাচু গলায় বলল, কথাডা বোজতে পারি নাই। কী জানি জিগাইলেন?
ঠিক আগের মতো করেই আলী আমজাদ বলল, বাড়ি কবে?
লগে লগে হেকমত বলল, বাড়ি কই?
জ্বে কামারগাও সাহেব।
হেকমত ধমকের গলায় বলল, কামারগাওর মানুষরা কি আদব লেহাজ (কায়দা) জানে না? সাবের সামনে যে বইয়া বইয়া কথা কইতাছো? উডো, উইট্টা খাড়ও।
লোকটা জড়সড় হয়ে উঠে দাঁড়াল। ভুল হইয়া গেছে সাব, মাফ কইরা দিয়েন।
লোকটার দিকে আর তাকাল না আলী আমজাদ তাকাল নূরজাহান এবং মজনুর দিকে। মুখে বেশ একটা প্রশান্তির ভাব। লোকটার ওপর হেকমতের হামতাম (হম্বিতম্বি) বেশ পছন্দ করেছে সে। ট্যাণ্ডলদের এরকমই হওয়া উচিত। সাহেবরা যা ভাববেই না। আগ বাড়িয়ে সেই ধরনের কিছু একটা করে সাহেবদের মন জিততে না পারলে সে আবার কিসের ট্যাণ্ডল! লোকটাকে আদব কায়দা শিখিয়ে ঠিক এই কাজই করেছে। হেকমত। তবে আলী আমজাদ যখন নূরজাহানের দিকে মন দিয়েছে, মাত্র কথা শুরু করবে, হেকমত বলল, সাব, কথাডা কন।
