ঘুম ভাঙার পর শুয়ে থাকার অভ্যাস নাই হামিদার। লগে লগেই উঠল সে। নূরজাহানের উঠতে এখনও অনেক দেরি। এই একটা সুযোগ পাওয়া গেছে স্বামীর লগে কথা বলার। ভেবেছিল কাল রাতে বলবে। নূরজাহান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর স্বামীর বুকে হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিসা গলায় জানতে চাইবে, ঘটকায় ক্যান তোমারে এত আহ্লাদ কইরা মাওয়ার বাজারে লইয়া গেল? চা রসোগোল্লা খাওয়াইলো কী মনে কইরা? মাইয়া ডাঙ্গর অইছে। ঘটকায় কি অর লেইগা সমন্দ আনছে? কেমুন সমন্দ? পোলায় করে কী? বাড়ি কোন গেরামে? আর তুমি যে হাতড়াইয়া আইলা, আসলেই কি ঘটকার নাওয়ের তলি খুইল্লা গেছিলো, নাকি ঘটনা অন্য?
এসবের কিছুই জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পায় নাই হামিদা। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে নূরজাহান চট করে চলে গেছে তার জায়গায়। সে শোয় জানালা ঘেঁষে। তারপর। হামিদা, তারপর দবির। ঘরে একটাই বড় চকি। তিনজন মানুষ হাত পা মেলেই শুতে পারে। জায়গার অভাব হয় না। তারপরও বর্ষাকাল বলেই এক চকিতেই শোয় তিনজন। খরালিকাল হলে শুত না। খরালিকালে ঘরের মেঝে থাকে খটখটে শুকনা। হোগলা পাইতা। ল্যাড়ল্যাড়া বালিশ শিথানে দিলেই বেভোর (বেঘোর) ঘুম। বর্ষাকালে মেঝেতে শোয়া যায় না। মেঝের মাটি থাকে স্যাঁতস্যাতা। চারদিকে বর্ষার পানি। বাড়িঘরের তলায় এসেও দাঁড়ায় সেই পানি। উপরের দিকে ঠেলে ঠেলে উঠতে থাকে। পুরাপুরি উঠতে পারে না ঠিকই তবে ঘরবাড়ির মাটি স্যাঁতস্যাঁতে করে দেয়। হোগলা বিছিয়ে সেই মাটিতে শোয়া যায় না। হোগলা ভিজা যায়, বালিশ ভিজা যায়। আর বুকে পিঠে চেপে বসে ঠান্ডা। সর্দি কাশি ছেড়ে যেতেই চায় না। পুরা বর্ষাকাল খুকুর খুকুর কাশি লেগে থাকে। কফের রং হয় পোলাপানের বিষ্ঠার মতন।
কালরাতে দবিরের লগে একটা কথাও বলা হয় নাই। যা যা ভেবেছিল তার কিছুই জানা হয় নাই। চৌকিতে উঠে মাত্র সটান হয়ে শুয়েছে গাছি, তারপরই তার আর কোনও খবর নাই। ঘোঙর ঘোঙর করে নাক ডাকতে শুরু করেছে। স্বামী মেয়ে শুয়ে পড়ার পরও টুকটাক কিছু কাজ হামিদার থাকে। সেসব শেষ করে কুপি নিভিয়ে বাপ মেয়ের মাঝখানে শুয়েছে ঠিকই, শুয়ে স্বামীর বুকে হাতও দিছে, তয় গাছির কোনও খবর নাই। হতাশ হয়ে হামিদাও একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে।
এখন এসব কথার লগে আরেকটা কথাও মনে পড়ল হামিদার। নূরজাহান কাইল কাজির মউলকা খাইতে চাইছিল। একহান মাত্র মাইয়া। ডাঙ্গর হইয়া গেছে। বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করছে ঘটক। কবে বিয়াশাদি অইয়া যাইবো। কোন গেরামে কার বাড়ির বউ অইয়া। যাইবো। হেই বাড়ির মানুষজন কেমুন অইবো কে কইবো! ইচ্ছা করলেই কাজির মউলকা। মাইয়াডা আর খাইতে পারবো কি না কে কইবো! বাপের বাড়িত থিকা সাধ আহ্লাদ মিটাইয়া না যাইতে পারলে হেই সাধ আহ্লাদ জিন্দেগিতেও হয়তো আর পূরণ অইবো না। দেই মাইয়াডারে কহেকখান কাজির মউলকা বানাইয়া। কয়ডা বেশি কইরা বানাইলে মাইয়ার বাপেও খাইতে পারবো নে। আমিও এক-দুইহান খাইলে বিয়ানে আর কিছু খাওন লাগবো না।
প্রথমে পাটাপুতা নিয়া রান্নাচালায় রেখে এল হামিদা।
সেই ফাঁকে আড়চোখে একবার দবিরের দিকে তাকাল। দবির তার দিকে তাকালই না। কীরকম উদাস, কীরকম মনমরা ভঙ্গিতে তামাক টেনে যাচ্ছে। হুঁকায় তামাক আছে বলে মনে হয় না। তবু টেনে যাচ্ছে। ধুমা বের হচ্ছে ঠিকই তয় তামাকের গন্ধ আর পাওয়া যাচ্ছে না। তামাক পুড়ে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
তবু কেন এভাবে হুঁকা টানছে গাছি?
এমন উদাস, এমন মনমরা হয়ে আছে কেন?
কী হয়েছে?
কালরাতে সাঁতরে বাড়ি ফেরার পরও যে মানুষটার এত উৎসাহ, এত আমোদ প্রমোদ দেখা গেল আজ সকালবেলা তার এই অবস্থা কেন?
হামিদা যে তাকে আড়চোখে দেখল, খেয়াল করল এটা তরি দেখল না দবির। হামিদার দিকে সে তাকালই না। বাঁশঝাড়ের ওদিক দিয়া ধইনচাখেতের মাথার উপরকার আকাশের দিকে তাকিয়ে তামাক টানছে। কুকুরটা খুবই আপনভঙ্গিতে বসে আছে তার পায়ের কাছে। দবির হামিদার দিকে তাকাল না ঠিকই, কুকুরটা তাকাল। পলকের জন্য হামিদাকে দেখে আবার আগের মতনই মুখ ঘুরাল অন্যদিকে।
হামিদা আবার বড়ঘরে এল। কাজির ঠিলা থেকে আধসের পরিমাণ কাজির চাউল তুলল একটা খাদায়। কাজিরচাউল পানিতে খাদার অর্ধেকটার বেশি ভরে গেল। ওই নিয়ে রান্নাচালায় এল। খোলাটা চুলার পাড়েই আছে। মাটির খোলা। এই জিনিস চুরি করতে আসবে না কোনও চোর।
নূরজাহান তখনও আগের মতনই ঘুমাচ্ছে। মুখটা বন্ধ জানালার দিকে।
কাজির মউলকার লগে ফালি ফালি করে কেটে দিতে হয় পিঁয়াজ, খাড়াখাড়ি চারফালি করে দিতে হয় কাঁচামরিচ। কেউ কেউ কাঁচামরিচ দেয় কুচি কুচি করে। নূরজাহান কুচি কুচি করে দেওয়া পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ দেওয়া কাজির মউলকাই পছন্দ করে। ওসব জিনিস চুলার পারে রাখা থাকে না। ওই জিনিস নিতে আরেকবার বড়ঘরে এল হামিদা।
দবির গাছির অবস্থা তখনও আগের মতনই।
এতক্ষণে আর একটু ফরসা হয়েছে চারদিক। ভোরবেলার আলো এখন কাজির চাউলের লগে খাদায় উঠে আসা পানির মতন।
সবকিছু গুছিয়ে হামিদা তারপর কাজির চাউল বাটতে বসল। আশ্চর্য ব্যাপার দবির তখনও ফিরা তাকায় নাই স্ত্রীর দিকে।
চাউল বাটতে বাটতে দবিরের দিকে তাকাল হামিদা। আচমকা বলল, কী অইছে। তোমার?
