লুঙ্গি চিপড়ে আবার ঠিকঠাক মতন পরছে দবির। পরতে পরতে একটু যেন বেশিরকম আমুদে গলায় বলল, কইফফার ছাড়ার ওই মিহি আইয়াই তগো মা-মাইয়ারে আমি জানালার সামনে খাড়াইয়া থাকতে দেখছি। বাইরে চান্দের আলো, ঘরে কুপির আলো। বোজলাম, তরা চিন্তা করতাছস, এত রাইত্রে হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া কেডা আইতাছে আমগো বাড়ি মিহি। একবার চাইলাম চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া কই, নূরজাহান রে, ডরাইচ না মা। আমিঐ। হাতড়াইয়া আইতাছি। কইলাম না, তগো ইট্টু ডর দেহানের লেইগা। দেহি আমারে এমনে হাতড়াইয়া আইতে দেইক্কা কেমুন করচ তরা।
নূরজাহান বলল, আমরা বিরাট ডরান ডরাইছি বাবা। মায় তো ফাল দিয়া গিয়া দুয়ার দিছে। দুয়ারে ডাসা লাগাইয়া পিঠ দিয়া চাইপ্পা ধরছে। ডরে মুকচুক হুগাইয়া গেছে। আর আমি তো ডরে চকি থিকা নামতেঐ পারি নাই।
তয় তগো বাঁচাইয়া দিছে কুত্তাডায়। এইডার খেউক্কানিতে উপায় না দেইক্কা আমি তরে ডাক দিছি। নাইলে বাইত্তে উইট্টা তগো আইজ বিরাট ডর দেহাইতাম। খিক খিক।
দবিরের হাসি দেখে নূরজাহানও হাসল। হামিদা গম্ভীর। স্বামীর একটানা এত কথা বলা, এই হাসি কোনওটাই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কী হয়েছে কী দবিরের আজ? এমন করছে কেন লোকটা?
দবির তখন কুকুরটার দিকে তাকিয়েছে। তয় এই শালার পো শালার কারবার তো বুজলাম না। এইডা আইলো কই থিকা?
নূরজাহান বলল, কইতে পারি না। তুমি ঘটকার লগে বাইর অইলা, ধইনচা খেতের ভিতরে থিকা টাবুর টুবুর করতে করতে কুত্তা আইয়া বাইত্তে উটলো। মা’য় চলা লইয়া
এমুন দৌড়ানি দিল, বাইত্তে থিকা বাইরই অইলো না। এমুন আহ্লাদ জুইড়া দিল, য্যান আমগো বাইত্তে বহুতদিন ধইরা আছে। মা’র লগে আমার লগে বিরাট খাতির অইয়া গেছে। তোমারে চিনতে পারে নাই দেইখা এমুন করছে।
তয় এইডা আইলো কই থিকা? কোন বাড়ির কুত্তা?
হেইডা কইতে পারি না।
যে বাড়ির কুত্তাঐ হউক, এইডা একহান কুত্তাঐ। সাই (বিরাট) পাজি। আমগো বাইত্তে আইয়া উটছে, এইডা একহান কামের কাম অইছে। দেখ থাকেনি বাইত্তে, না কয়দিন বাদে আবার অন্য কোনওমিহি ম্যালা দেয়।
না হেইডা মনে অয় দিব না। মনে হয় আমগো বাইত্তে থাকবো। আমি মনে মনে কুত্তাডার একহান নাম ঠিক করছি।
কী নাম?
ভাদাইম্মা (বাউন্ডুলে)।
ভাদাইম্মা? এইডা কেমুন নাম অইলো?
এইডা তো ভাদাইম্মা পদেরঐ কুত্তা। কইত থিকা কই আইয়া পড়ছে। আবার একদিন কইত থিকা কই যাইবো গা। অর লেইগা ভাদাইম্মা নাম ঠিক।
এই এতক্ষণে প্রথম কথা বলল হামিদা। তোমরা কি উডানে খাড়াইয়া খাড়াইয়াই রাইত কাবার করবা, নাকি ঘরে যাইবা? ভাতপানি খাওন লাগবো না?
হামিদার কথা শুনে ব্যস্ত হল দবির। হ হ লও। ঘরে লও। ভাত দেও। বহুত খিদা লাগছে। হাতড়াইলে দুইন্নাইর খিদা লাগে। বাপ রে, যেই হাতড়ান হাতড়াইছি।
হামিদা আরেকবার তীক্ষ্ণচোখে দবিরের মুখের দিকে তাকাল। চাঁদ আর কুপির আলোয় মুখটা দেখতে পেল, চোখ পরিষ্কার দেখতে পেল না। মনের মধ্যে সন্দেহটা তার রয়েই গেল। আসলেই কি ঘটকার কোষানাওয়ের তলি ভোগলা হয়ে গেছে? আসলেই কি কোষা ডুইব্বা গেছে দেইখা হাতড়াইয়া বাইত্তে আইছে গাছি, নাকি ঘটনা অন্য? আর কীরলেইগা ঘটকায় গাছিরে বাজারে ডাইক্কা নিল? কী কথা কওনের লেইগা নিল? গাছি তো হেই হগল কথার কিছুই কইলো না! তয় কি নূরজাহানের বিয়ার সমঐ আনছে? ভাল সমন্দ? হেই সমন্দ গাছির পছন্দ অইছে দেইক্কাঐ কি এমুন আমদে আছে সে? নূরজাহানের সামনে কি এই হগল প্যাচাইল পাড়তে চাইতাছে না? পরে পাড়বো? নূরজাহান ঘুমাইয়া যাওনের পর?
হামিদা মনে মনে অপেক্ষা করতে লাগল।
.
রান্নাচালায় বসে কুড়ুক কুড়ক করে তামাক টানছে দবির।
এখনও ভোরের আলো ঠিক মতন ফোটে নাই। পদ্মার ঘোলা পানির মতন আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। গাছপালায় লেগে আছে অন্ধকার। শ্রাবণমাসের আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। আকাশের ভাবগতিক দেখে বোঝা যায় আজকের দিনটাও আগের দিনগুলির মতনই হবে। এই মেঘ, এই রোদ। হঠাৎ খা খা রোদ, হঠাৎই কোদাইল্লা বৃষ্টি। ধইনচাখেতের ওদিককার অন্ধকার একদমই কাটে নাই। বাঁশঝাড়, আম কদম আর হিজল বউন্নাগাছের পাতাদের ঘুম মাত্র ভাঙতে শুরু করেছে। ছনের ঘরের চালায় দুইটা কাক এসে বসছে। মাত্র গলা খুলতে শুরু করছে তারা। প্রায় নিজের সমান হয়ে উঠেছে এমন। একটা মাত্র ছানা নিয়া শালিক পাখিটা আমগাছের খোড়ল থেকে মাত্র নেমেছে উঠানে। বাচ্চাটা চিড়িক চিড়িক করে ডাকছে আর মায়ের পিছন পিছন ছুটছে। পুকুরের ওপারকার ডুমুরঝোঁপ থেকে এইমাত্র উড়ে এল দোয়েল পাখিটা। বাঁশঝাড়ের ওদিককার আবছা আলো আঁধারিতে এখন খাবার খুঁজবে আর পিরিক পিরিক করে লেজ নাচাবে। ঝিঙাকফির আঁকার তলার অন্ধকার এখনও কাটে নাই। আকাশ থেকে নামতে শুরু করা আলোয় বর্ষার পানি একটু একটু ধরছে পানির রং। কইফফার ছাড়ার ঝোঁপঝাড় নীরব। কানিবকের ছানাদের ঘুম ভাঙে নাই।
এত সকালে দবিরের কেন ঘুম ভেঙেছে?
কোন ফাঁকে বড়ঘরের দুয়ার খুলে হুঁকা আর তামাক টিকা নিয়া সে চলে গেছে রান্নাচালায়। এত সকালে এমন মনোযোগ দিয়া তামাক টানছে কেন?
নূরজাহান এখনও গভীর ঘুমে। হামিদার ঘুম ভেঙেছে। ঘুম ভেঙেছে দবিরের তামাক টানার শব্দে। স্বামী যে কোন ফাঁকে পাশ থেকে উঠে গেছে, তামাকের টুমটাম নিয়া দুয়ার খুলে বের হয়ে গেছে, উদিস পায় নাই। এখন ঘুমের ভিতর থেকে উদিস পেল, বাইরে, রান্নাচালার দিকে গুড় গুড়ক একটানা শব্দ উঠছে।
