বাড়ির পুব উত্তর দক্ষিণে কাছাকাছি কোনও বাড়ি নাই। পশ্চিম দিককার পুকুরের ওপারে আছে মাঝিবাড়ি। আর কেউ শুনুক না শুনুক মাঝিবাড়ির লোকজনরা সেই চিৎকার শুনবে। মাঝিরা সাহসী লোক। বাড়িতে জুয়ান মর্দ পুরুষপোলা অনেক। তারা বেবাকতে এক লগে ঝাইক্কইর দিয়া (ঝক দিয়ে) বাইর অইবো। হাতে লাডি সড়কি থাকবো বেবাকতেরঐ, জুতি আর কুরবানি দেওনের ছুরি থাকবো। একলা একজন ডাকাইত মাঝিবাড়ির এত মাইনষের লগে জুত করতে পারবো না। কোনমিহি দা হাতর দিব নে! দিকপাশ না পাইলে ধইনচা খেতের ভিতরে গিয়া হান্দাইবো। তন্নতন্ন কইরা বিচড়াইয়াও ডাকাইতের পোরে আর বিচড়াইয়া পাওন যাইবো না।
তারপরও হামিদার মুখচোখ ভয়ে চুন হয়েছে। নূরজাহান ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে চকির ওপর। দৌড়ে নেমে মায়ের লগে গিয়া যে সেও পিঠ দিবে দরজায় সে কথা মনে নাই।
বাইরে সামনে খেউক্কাচ্ছে কুকুরটা। কুকুরের খেউক্কানি ছাপিয়ে তারপর শোনা গেল দবিরের গলা। নূরজাহান, মা, মাগো। আমি মা, আমি…
বাবার কথা শুনে লাফ দিয়া চকি থেকে নামল নূরজাহান। দিশাহারা গলায় বলল, বাবায় তো মা, বাবায় তো। দুয়ার খোলো।
ততক্ষণে হামিদার কানেও গেছে দবির গাছির গলা। আমিঐ হাতড়াইয়া আইছি। দুয়ার খোলো মা, দুয়ার খোলো। আর এই কুত্তার হাত থিকা আমারে বাঁচাও।
হামিদা পিঠ আলগা করবার আগেই মা’কে আবার তাড়া দিল নূরজাহান। কী অইলো? দুয়ার খোলো না ক্যা? বাবার গলা তুমি চিনতে পারতাছো না?
এবার দরজা থেকে পিঠ সরাল হামিদা। চটপটা হাতে দরজা খুলল। গাছা থেকে থাবা দিয়া কুপিটা নিল নূরজাহান। প্রায় লাফ দিয়া পড়ল উঠানে। দৌড়ে গেল পুবদিকার ঝিঙ্গা কহির (চিচিঙ্গা) ঝকার সামনে। সেখানে হাঁটু পানিতে লুঙ্গি কাছা মেরে দাঁড়িয়ে আছে। দবির। নীল শার্ট শক্ত করে বাধা মাথায়। কুকুরটা ডাঙায় দাঁড়িয়ে আছে দবিরের একেবারে মুখামুখি। দবির যেদিক দিয়া বাড়িতে উঠতে চায় কুকুরটা সেইদিকে গিয়াই তার মুখামুখি দাঁড়াচ্ছে। কিছুতেই বাড়িতে উঠতে দিবে না তাকে। এমন সুরে খেউক্কাচ্ছে আর দাঁত খিচানি দিচ্ছে, বাড়িতে উঠলে আর রক্ষা নাই। প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
নূরজাহানের পিছু পিছু হামিদাও দৌড়ে আসছে উঠানে। চাঁদের আলোয় ফকফক করছে চারদিক। বর্ষার পানিতে ধইনচা খেত আর বাড়ির গাছপালায় ঝিম ধরে আছে যে নির্জনতা, কুকুরটার খেউক্কানিতে সেই নির্জনতা হারিকেনের চিমনির মতন ভেঙে পড়ছে।
নূরজাহানকে দেখে দবির বলল, আমগো বাইত্তে কুত্তা আইলো কই থিকা? এইডা তো বিরাট পাজি কুত্তা। আমার বাইত্তে আমারেঐ উটতে দেয় না।
কেমতে উটতে দিবো? কুত্তায় তোমারে চিনে নি?
তারপরই কুকুরটাকে তাড়া দিল সে। এই সর সর! এইডা আমার বাবায়। সর, সর। বাবারে বাইত্তে উটতে দে। সর।
নূরজাহানের তাড়া খেয়ে একটু সরে গেল কুকুরটা কিন্তু খেউক্কানি থামাল না। দূরে দাঁড়িয়েই আগের মতন সমানে খেউক্কাতে লাগল। সেই ফাঁকে পানি ভেঙে উঠানে উঠল দবির। কুকুরটা একবার তার দিকে তেড়ে আসতে চাইল। নূরজাহান আবার কুকুরটাকে তাড়া দিল। এই থামলি? কইলাম না আমার বাবায় আইছে। চোপ চোপ।
নূরজাহানের তাড়া খেয়ে আবার কিছুটা দূর দৌড়ে গেল কুকুরটা।
হামিদা এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে তাকিয়ে স্বামীকে দেখছিল। এবার কথা বলল সে। তোমার এই দশা ক্যা? কইথনে হাতড়াইয়া আইলা?
প্রথমে মাথায় প্যাঁচিয়ে রাখা শার্টটা খুলল দবির। খুলে হামিদার হাতে দিল। আগে এইডা ধরো। তারবাদে কইতাছি। দেহো তো শার্টের কোনাকানছি ভিজছে নি?
হামিদা হাতিয়ে হাতিয়ে শার্টটা দেখল। না ভিজে নাই।
তয় ভাল। বহুত চেষ্টা করছি শাটটারে লইয়া।
যাতে না ভিজে?
হ।
লুঙ্গির কাছা খুলে নীচের অংশটা দুই-তিন মোচড়ে চিপড়ে নিল দবির।
কুকুরটার খেউক্কানি কিছুটা কমেছে ততক্ষণে। সে তার বুদ্ধি বিবেচনা দিয়া বুঝে গেছে মানুষটা শত্রু না। এই বাড়িরই। সুতরাং তার খেউক্কানির দরকার নাই। শরীরের ভঙ্গি স্বাভাবিক করে সে তিনজন মানুষের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। আদর ভালবাসার কুঁই কুঁই শব্দ করছে।
হামিদা যে প্রশ্নটা করেছিল নূরজাহান এবার ঠিক সেই প্রশ্নটাই করল দবিরকে। তোমার অইছে কী বাবা? হাতড়াইয়া বাইত্তে আইলা ক্যা? ঘটকায় না বলে তোমারে বাইত্তে দিয়া যায়?
হ, হেই কথাইত্তে আছিলো।
তয়?
মাওয়ার বাজারে চা মিষ্টি খাইয়া মেলা দিছি। ঘটকার কোষাড়া অইলো পুরান। বন্নিছাড়ার ওই মিহি আইয়া তলি খুইল্লা গেল।
কী?
আরে হ। কথা নাই বারতা নাই, কোষার তলি খুইল্লা ভোগলা (বড় ছিদ্র) অইয়া গেল। এমুন ভোগলা, ভর ভরাইয়া পানি ওডে। আমি আর ঘটকায় দুইজনে মিল্লা এইচ্চা (সেচে) হারতে পারি না। চোক্কের নিমিষে (পলকে) কোষা ডুইব্বা গেল। তার আগেঐ বুদ্ধি কইরা আমি একহান কাম করছিলাম, শাটহান খুইল্লা মাথায় বানছি, লুঙ্গিহান শক্ত কইরা কাছা দিছি। ঘটকায় আর ফইজু হাতড়াইয়া উঠছে হালদার বাইত্তে। ল্যাংড়া পাও লইয়া হাতড়াইতে বহুত কষ্ট অইছে ঘটকার। আমারেও কইছিলো ওই বাইত্তে উটতে। আমি উডি নাই। আমি বাড়ি মিহি হাতর দিছি।
তীক্ষ্ণচোখে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল হামিদা। চাঁদের আলোয় চারদিক ফকফক করলেও মানুষের চোখের দৃষ্টি পুরাপুরি দেখা যায় না, বোঝা যায় না। দবিরের দৃষ্টিও পুরাপুরি বুঝতে পারছিল না সে। তবে দবিরের কথা কেন যেন বিশ্বাস হল না তার। মনে হল সত্যকথা দবির বলছে না। ঘটনা এরকম না। ঘটনা অন্যরকম। কীরকম, সেটা সে অনুমান করতে পারছে না।
