কইফফার ছাড়ার ওদিকটায় এসে পারের দিকে একটু এগিয়ে গেল দবির। পায়ের তলায় মাটি পেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। চাঁদের আলো তেরছা হয়ে পড়েছে এদিকটায়। ছাড়া বাড়ির কাছটায় জ্যোৎস্না পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে নাই। কিছুটা জায়গা আবছা মতন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে আঁজলা ভরে পানি তুলে তুলে চোখ মুখ ভাল করে ধুতে লাগল দবির। বেশ কিছুক্ষণ ধরে কাজটা সে করল। এই ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেওয়াও হল। এতটা দূর সতরে আসার ক্লান্তিটা কাটাবার চেষ্টা করল। তারপর বাড়ির দিকে মাত্র সাঁতার দিয়েছে, রাতদিন ছানা পাহারা দেওয়া কানিবক দুইটা ওয়াক। ওয়াক করে ডেকে উঠল। সাবধানি ভঙ্গিতে ডানা ঝাঁপটাল। পাখনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছানাগুলি চিঁ চিঁ করে উঠল। মা-বাবার লগে তারাও ভয় পেয়েছে, তারাও সাবধানি হওয়ার চেষ্টা করছে।
ছাড়া বাড়ি পেরিয়ে আসতে আসতে দবিরের মনে হল, আমার আর হামিদার জীবনডাও তো এই বক দুইহানের লাহান। পাখনার তলায় রাইখা বড় করছি মাইয়াডারে। কোনহানদা (কোনখান দিয়ে) কোন শত্রু আইয়া ক্ষতি করে মাইয়ার এর লেইগা সাবদানে থাকছি সব সমায়। তারবাদেও শত্রুর হাত থিকা বাঁচাইতে পারতাছি না মাইয়াডারে। মাওলানা হুজুরের লাহান বিরাট এক শত্রু আইয়া খাড়াইছে আমগো বাসার সামনে। হুজুর তো মানুষ না। হুজুর অইলো দাঁড়াইস সাপ। ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে সে আউন্নাইতাছে। তারে ঠেকান বড় কঠিন। কাছাকাছি আইয়া সে খালি একহান ঠোকর দিব। কানিবকের বাচ্চার লাহান এক ঠোকরে গিল্লা খাইবো নূরজাহানরে। আমি আর হামিদা চাইয়া চাইয়া দেহুম। কিছু করনের থাকবো না আমগো! বকপক্ষীর লাহান ওয়াক ওয়াক কইরা কান্দুম।
এসব ভেবে আবার কান্না পেল দবিরের। জোর করে কান্না আটকে রাখল। না, কান্দাকাটি আর করন যাইবো না। শক্ত থাকতে অইবো। বিরাট শক্ত। লোহা কাঠের লাহান শক্ত।
ততক্ষণে সাতরাতে সাতরাতে বাড়ির একেবারে সীমানায় এসে পড়েছে দবির। এদিক থেকে পরিষ্কার দেখা যায় বড়ঘরের জানালা। সেই জানালায় এখন মা-মেয়ে দুইজনের মুখ। তাদের পিছনে কুপির আলো, সামনে চাঁদের আলো। তবু পরিষ্কার দেখা যায় না মা মেয়ের মুখ। বোঝা যায় মানুষ দুইটি উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে এদিকে। একজন মানুষ এত রাতে সাঁতরে সাঁতরে আসছে বাড়ির দিকে, সংসারের অতিচেনা মানুষটা, তবু সেই মানুষটাকে তারা চিনতে পারছে না। কী করে চিনবে? এইভাবে, এতটা রাত করে সাঁতরে সাঁতরে কখনও কি বাড়ি ফিরেছে সে?
তারপরই দবিরের মনে হল, আইচ্ছা, বাইত্তে তো পুরুষপোলা কেঐ নাই। খালি মা আর মাইয়া। এই যে আমি হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া বাইত্তে যাইতাছি, অরা তো আমারে চিনতে পারতাছে না। তয় তো অরা ডরাইতাছে। মনে করতাছে কে না কে আইতাছে বাইত্তে। চোর ডাকাইতও অইতে পারে। এইডা কি ঠিক অইতাছে? আমি কি দূর থিকাই আজ দিমু, নূরজাহান রে, মা, মাগো, ডরাইচ না মা। আমি দবির, দবিরগাছি, তর বাপ। আমিঐ হাতরাইয়া আইছি। ডরাইচ না।
না, আওয়াজ দবির দেয় না। আজ দুপুর থেকে ঘটে যাওয়া পুরা ব্যাপারটা নিয়ে সে একটা রহস্য তৈরি করতে চায়। মনের ভিতরকার দুঃখ কষ্ট চেপে মজাদার একটা পরিবেশ তৈরি করতে চায়। মা-মেয়ে কাউকে কিছুই বুঝতে দিতে চায় না। এভাবে সাতরে সাঁতরে বাড়ি এসে সে একটা চমক দিবে। তারপর ঘটকাকে নিয়া বানাবে হাসির গল্প, ঠাট্টা মশকরার গল্প। সেই গল্প শুনে মা-মেয়ে যেন হাসতে হাসতে মরে।
তয় কী গল্প?
দবির গল্প খোঁজে, মনে মনে গল্প বানায় আর সাঁতরে আসে নিজ বাড়ির দিকে। বাড়ির সীমানায় এসে যখন পায়ের তলায় মাটি পেয়েছে, পানি ভেঙে হেঁটে হেঁটে উঠবে বাড়ির উঠানে, তখন দুইটা কাণ্ড ঘটল। হামিদা ভয়ার্ত ভঙ্গিতে দৌড়ে নামল চকি থেকে। চোখের পলকে দরজা বন্ধ করে কাঠের ভারী ডাসা তুলে দিল আর ছনছায় পাহারাদারের ভঙ্গিতে বসে থাকা কুকুরটা লাফিয়ে উঠে শত্রু ঠেকাবার ভঙ্গিতে তেড়ে গেল দবিরের দিকে। লগে প্রচণ্ড খেউক্কানি। ঘেউ ঘেউ।
কুকুর দেখে ভড়কে গেল দবির। আরে, আমার বাইত্তে কুত্তা আইলো কই থিকা? এইডা তো বিরাট পাজি কুত্তা। আমারে তো বাইত্তে উটতে দিব না।
বাস্তবিকই, কুকুরটা তখন মারমুখো ভঙ্গিতে দবিরকে ঠেকাবার চেষ্টা করছে। কিছুতেই বাড়িতে উঠতে দিবে না। দবির পানিতে আর কুকুরটা ডাঙায়, একেবারে মুখোমুখি। ভঙ্গিটা এমন, আঙিনায় পা দিলেই কুকুরটা দবিরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। খেউক্কানির লগে এমন মুখ খিচানি দিচ্ছে, চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে ভয়ংকর দাঁত।
দবির ভয় পেয়ে গেল। খাইছে আমারে। এই শালার পো শালায় তো আমারে বাইত্তে উটতে দিব না। আমার তো অহন নূরজাহানরে না ডাইক্কা উপায় নাই। চালাকিডা তো করন যাইবো না।
দবির তারপর তার সেই চেনা মায়াবী গলায় মেয়েকে ডাকতে লাগল। নুরজাহান, মা, মাগো। আমি মা, আমি। আমিঐ হাতড়াইয়া আইছি। দুয়ার খোলা মা, দুয়ার খোলো। আর এই কুত্তার হাত থিকা আমারে বাঁচাও মা।
.
হামিদা দাঁড়িয়ে আছে দরজার ডাসায় পিঠ চেপে।
ভঙ্গিটা এমন, যেন চাইলেই জোর করে কেউ বাইরে থেকে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতে না পারে। ঢুকতে হলে বহু চেষ্টাচরিত্র করতে হবে। ওরকম চেষ্টাচরিত্র শুরু হলে নুরজাহানও এসে মায়ের লগে শরীরের সর্বশক্তি দিয়া দরজায় পিঠ চেপে ধরবে। সাঁতরে সঁতরে আসা লোক দেখা গেছে একজন। একজন লোকের গায়ে যত জোরই থাক, একার চেষ্টায় দরজার এই ডাসা ভাঙা খুবই কঠিন হবে। কোনওরকমে যদি ভেঙে ফেলেও, মা-মেয়ে দুইজনের শক্তির কাছে পেরে উঠা সহজ হবে না। দুইজন প্রাণপণে দুইহাতে চেপে রাখবে দরজা। সেই ফাঁকে ছাড়বে গলা ফাটানো চিৎকার। কে কোনহানে আছো আউন্নাও। আমগো। বাইত্তে ডাকাইত আইছে।
