হামিদা একবার কুকুরটার দিকে তাকাল। তারপর রান্নাচালা ছাড়িয়ে ছনের ঘরের ওদিকে তাকাল। আম কদমের গাছগুলি, হিজল বউন্নার গাছগুলি ছাড়িয়ে ওপাশের ধইনচা খেতের দিকটায় জ্যোৎস্না আর অন্ধকারের খেলা। হাওয়া বইছে ঝিরঝির করে। ক ক করে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল একটা রাতপাখি। অনেকক্ষণ পর নিজের ভিতরকার সেই উত্তেজনা আবার টের পেল হামিদা। কোন মতলবে আইছে ঘটকায়? নূরজাহানের লেইগা সমন্দ আনছেনি? হেই কথা কওনের লেইগাঐ কি গাছিরে লইয়া গেছে বাজারে? বাইত্তে বইয়া সমন্দর কথা কইলে অসুবিদা আছিলো কী? মা-মাইয়ায় হুইন্না হালাইবো? হোনলে কী অইছে? মাইয়া ডাঙ্গর অইলে বিয়া তো অইবোই, বাইত্তে ঘটক তো আইবোই! হেইডা হোনন না-হেননের কী আছে?
না ঘটকার পোর মতলবটা হামিদা বোজতেই পারছে না। গাছিই বা এতক্ষণ বাজারে করে কী? ঘটকার কথা কি ফুরায় নাই? বিয়ার সমন্দ আনলে হেই কথা কইতে কতক্ষুন। লাগে?
এসময় আস্তে করে মা’কে ডাকল নূরজাহান। মা।
উঠানের দিক থেকে চোখ ফিরাল না হামিদা। বলল, কী অইছে?
আমার খিদা লাগছে। ভাত দেও।
আর ইট্টু সবুর কর। তর বাপে আহুক। দুইজনরে একলগেঐ দিমু নে।
বাবায় আইবো কুনসুম?
এলা আইয়া পড়বো।
এত দেরি করতাছে ক্যা?
এ কথার জবাব দিল না হামিদা।
নূরজাহান আবার ডাকল। মা।
এবার হামিদা একটু চেতল। কী অইছে, এত মা মা করতাছস ক্যা? কইলাম না তোর বাপে আইলে ভাত দিমু।
নূরজাহান সরল গলায় বলল, আমি তোমার কাছে ভাত চাই নাই?
তয়?
একহান কথা কমু।
কী?
কাইল বিয়ানে আমারে কাজির মউলকা বানাইয়া দিয়ো। আমার কাজির মউলকা খাওনের ইচ্ছা অইতাছে।
এবার খুবই রুক্ষ গলায় মুখ ঝামটাল হামিদা। ইস, কাজির মউলকা খাওনের ইচ্ছা অইতাছে। মাগির মোখে খালি খাওনের কথা। খালি পটি পটি (মজার মজার) খাওন! কাজি পাতি নাই। মউলকা বানাইতে পারুম না।
মিছাকথা কও ক্যা? ঠিল্লা ভরা দিহি কাজির চাউল। আমি দেখছি না!
দেখলে দেখছস। আমি বানাইতে পারুম না।
হামিদার ভঙ্গিতেই মুখ ঝামটাল নূরজাহান। তুমি কেমুন মা? একহান খালি মাইয়া তোমার, হেই মাইয়ারে ইট্ট মউলকা বানাইয়া খাওয়াইতে চাও না?
চুপ কর মাগি। প্যাচাইল পারলে থোতা ভাইঙ্গা হালামু।
নূরজাহান কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই কইফফার ছাড়ার ওদিককার হিজল ডুমুরের ঝোপে ওয়াক ওয়াক করে ডেকে উঠল কানিবক দুইটা। সাবধানি ভঙ্গিতে ডানা ঝাঁপটাল। সেই শব্দে জানালা দিয়া বাড়িটার দিকে তাকাল নূরজাহান। চাঁদের আলোয় দেখতে পেল ছাড়া বাড়িটার ঝোঁপঝাড়ের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে সাঁতরে আসছে একজন মানুষ। দুপুরের পর যেভাবে বাড়িটার আড়াল থেকে হঠাৎ করেই বের হয়ে আসছিল ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও এখনও যেন ঠিক সেভাবেই বের হয়ে আসছে সাঁতার কাটা মানুষটা। মাথায় কী যেন একটা প্যাচানো।
নূরজাহান খুবই উত্তেজিত হল। দিশাহারা গলায় মা’কে ডাকল। মা ওমা, দেইক্কা যাও, কে জানি আমগো বাড়ি মিহি হাতড়াইয়া আইতাছে।
কচ কী?
হ। তাড়াতাড়ি আহো, দেইক্কা যাও।
মেয়ের মতনই উত্তেজিত হল হামিদা। পা না ধুয়ে কখনও চকিতে ওঠে না সে। এখন পা ধোয়ার কথা মনে হল না। লাফ দিয়া চকিতে উঠল। জানালার কাছে এসে মেয়ের কাঁধে হাত দিয়া দাঁড়াল। সত্যঐ তো কে জানি হাতড়াইয়া আইতাছে! কে? কেডা আহে এই বাড়ি মিহি? এত রাইত্রে হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া কেডা আহে?
.
কইফফার ছাড়ার ওদিকটায় এসে দবিরের মনে হল কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুইটা ফুলে গেছে। বেশ কয়েকদিনের না কামানো গালে, বর্ষার পানি সরে যাওয়ার পর মাঠঘাট খেতখোলায় যেভাবে গজিয়ে ওঠে দূর্বাঘাস সেভাবে গজিয়েছে দাড়িমোচ। চোখের পানিতে চটচটা হয়ে আছে সেই দাড়িমোচ। মুখটা ভাল কইরা না ধুইলে মাইয়া আর মাইয়ার মায় বুইজ্জা যাইবো আমি কাইন্দা ভাসাইছি। তহন জোরাজুরি শুরু করবো। নূরজাহান দুইহাত দা (দিয়ে) গলা প্যাঁচাইয়া ধইরা জিগাইবো, কী অইছে বাবা, কও আমারে। কানছো ক্যা? এত কান্দনের কী অইছে? মাইয়ারে আমি হাছাকথা কমু কেমতে?
তারবাদে আছে মাইয়ার মায়। মাইয়ায় ঘুমাইয়া যাওনের পর মাইয়ার মা’য় ধরবো। কও তো নূরজাহানের বাপ অইছে কী? কাইন্দা কাইট্টা মুখচুখ ফুলাইয়া হালাইছো। ঘটকায় কী কইছে তোমারে? নূরজাহানের লেইগা কার সমন্দ আনছে? ঘটনা কী?
মাইয়ার মা’রেই বা হাছাকথাডা আমি কেমতে কমু? কইলে তো হেয় খালি আমার লাহান কাইন্দা ভাসাইবো না, কানতে কানতে পাগল অইয়া যাইবো। হের কান্দাকাটি দেইখা নূরজাহান বুইজ্জা যাইবো কী জানি কী ঘইট্টা গেছে সংসারে। মাইয়াডা আমার বিরাট একটা চিন্তার মইদ্যে পইড়া যাইবো। তারবাদে যহন অর কানেও যাইবো যে ঘটকায় অর লেইগা মাওলানা হুজুরের সমন্দ আনছে তহন মাইয়াডাও তো কান্দাকাটি শুরু করবো। পয়লা পয়লা কানবো, তারবাদে ডরাইবো। ডরে ডরে অসুকবিসুক অইয়া যাইবো। হুজুরের মোখে ছ্যাপ দিয়া যেমুন ডরাইছিল অমুন ডরে আবার মরবো। এই হগল কিছুই বুজতে দেওন যাইবো না নূরজাহান আর হামিদারে। তাগো দুইজনের লগে বিরাট একহান চালাকি করন লাগবো। ঘটকারে লইয়া চালাকি করন লাগবো, কান্দাকাটি আর মাওয়ার বাজার থিকা হাতড়াইয়া বাইত্তে আহন, বেক কিছু লইয়াঐ চালাকি করন লাগবো। মিছাকথার পর মিছাকথা কওন লাগবো। ভোলার লাহান মন খারাপ কইরা থাকলে অইবো না। উলটা পথ ধরতে অইবো। পয়লা মাইয়া আর মাইয়ার মা’রে ঠিক রাখন লাগবো, তারবাদে অন্যকথা।
