ভয় আতঙ্ক কেটে দবিরের তারপর অদ্ভুত এক কষ্ট শুরু হয়। আমি তো কোনওদিন কেঐর কোনও ক্ষতি করি নাই। জাইন্না শুইন্না কেঐর মনে কষ্ট দেই নাই, কোনও গুনার কাম করি নাই। তয় আমার মাইয়ার জীবনডা এমুন অইলো ক্যা? মা-বাপের গুনা পোলাপানের উপরে পড়ে। আমি আর নূরজাহানের মা’য় কী এমুন গুনা করছি যেই গুনা পড়লো আমার নূরজাহানের উপরে? যেই গুনায় নূরজাহানের জীবনে একটার পর একটা ফাড়া (বিপদ) আইতাছে? এক ফাড়াথিকা অরে আল্লায় বাঁচাই দিছে, উপরে আল্লাহতালা নীচে মানুষের অছিলা, বড় একহান ফাড়া কাটছে নূরজাহানের। হায় হায়, বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবার কোন ফাড়া আইলো মাইয়াডার? এই ফাড়াত থন অরে আমি অহন কেমতে বাঁচামু? এইবার আমি কার কাছে যামু? নূরজাহানের মা’য় এই কথা হোনলে পাগল অইয়া যাইবো, নূরজাহান। ডরে মরবো? হায় হায়, আমি অহন কী করুম আল্লাহ, আমি অহন কী করুম?
চাঁদের আলো তখন আরও প্রখর হয়েছে, নদী থেকে ভেসে আসা হাওয়া হয়েছে আরও জোরালো। বর্ষার খোলা চকমাঠ আর মাথার উপরকার শ্রাবণ রাতের আকাশ যেন গভীর আনন্দে ভরে গেছে। প্রকৃতির এই মনোরম আনন্দে এক অসহায় দুঃখী মানুষ টেটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কোনওরকমে বেঁচে থাকা শোলমাছের মতন ভাসতে ভাসতে যায় তার ঘরগিরস্তির দিকে। সেই মানুষের চোখের পানি মিলেমিশে যায় বর্ষার পানির লগে।
৩.২ বাবায় অহনতরি আইতাছে না
ওমা, বাবায় অহনতরি আইতাছে না ক্যা? রাইত অইয়া গেল তো!
চকির কোণে পা ঝুলিয়ে বসে আছে নূরজাহান। পা দোলনার মতন দোলাচ্ছে। কথার তালে দুলুনিটা একটু বাড়ল।
হামিদা মেয়ের দিকে তাকাল না। সে বসে আছে কপাটে ঢেলান দিয়া। ঘরগিরস্তির টুমটামের (আসবাবপত্র) পাশে সাঁ সাঁ করে জ্বলছে পিতলের কুপি। সন্ধ্যা হওয়ার লগে লগে কুপি জ্বেলে গাছার উপর রেখেছে। কুপির আলোর খানিকটা গিয়া পড়ছে হামিদার মুখের একপাশে। সেই আলোয় মুখটা চিন্তিত দেখাচ্ছে।
নূরজাহান তীক্ষ্ণচোখে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। কথা কও না ক্যা মা? কী চিন্তা করো?
এবার মেয়ের দিকে তাকাল হামিদা। কিছু চিন্তা করি না।
তয় আমার কথার জব দেও।
কোন কথার জব দিমু?
ওই যে কইলাম, বাবায় অহনতরি আইতাছে না ক্যা?
এই কথার আমি কী জব দিমু? আমি জানি কীর লেইগা আইতাছে না তর বাপে?
মেয়ের পা দোলানি খেয়াল করল হামিদা। এই অভ্যাস একদমই পছন্দ করে না সে। গম্ভীর গলায় বলল, ওই ছেমড়ি, পাও ঝুলাইছ না।
পাও ঝুলাইলে কী অয়?
এইডা বদঅব্যাস! ডাঙ্গর মাইয়ার এইরকম বদঅব্যাস ভাল না। জামাইবাড়ি গেলে হৌর হরি কইবো, এই মাইয়া আদাব লেহাজ জানে না! বেদ্দপ।
চকিতে বইয়া পাও ঝুলাইলে মানুষ বেদপ অইয়া যায়?
হ যায়! পাও ঝুলান বন্ধ কর।
নূরজাহান অসহায় গলায় বলল, এমনে বইলে আমি পাও না ঝুলাইয়া পারি না মা। পাও দুইখান এমতে এমতেই ঝুলতে থাকে। আমি উদিস পাই না।
মেয়ের চালাকিটা বুঝল হামিদা। কঠিন গলায় বলল, আমার লগে ফাইজলামি করিছ না নূরজাহান। উদিস না পাইলে উদিস কইলাম পাওয়াইয়া দিমু।
নূরজাহান হাসল। কেমতে পাওয়াইবা?
পাও ঝুলাইলে লাডি দিয়া পাওয়ে বাড়ি দিমু।
লাডি পাইবা কই? আমগো ঘরে তো লাডি নাই।
মেয়ের কথার লগে হামিদাও সমানে তাল দিতে লাগল। লাডি জোগাড় করন বহুত সোজা। রানঘরের ওই মিহি থিকা চলা লইয়া আমু। যেই চলা কুত্তাডারে ফিক্কা মারছিলাম, ওইডা দিয়া তর পাওয়ে বাড়ি দিমু।
হেইডা আর অহন পারতাছো না।
ক্যা, অহন পারুম না ক্যা?
তুমি অহন চলা আনতে রানঘর মিহি গেলেই পাও ঝুলান থামাই দিমু আমি। পাও ঝুলান থামাইলে তো আর পায়ে বাড়ি দিতে পারবা না।
এইবার হামিদা বিরক্ত হল। অইছে, এত প্যাচাইল পারিচ না। পাও ঝুলান থামা।
মায়ের কথা শুনল না নূরজাহান। আগের মতনই পা দোলাতে দোলাতে বলল, চেষ্টা করতাছি, তাও থামাইতে পারতাছি না মা। কী করুম, কও?
চোখ গরম করে মেয়ের দিকে তাকাল হামিদা। গম্ভীর গলায় বলল, দেখ নূরজাহান, কথা না হোনলে সত্যঐ তর পায় বাড়ি দিমু। ফিরি ফিক্কা মারুম পায়।
নূরজাহান হি হি করে হাসল। মারো, মারো দেহি ফিরি ফিক্কা।
নিজে যে পিঁড়িতে বসে আছে সেই পিঁড়িটাই টেনে বের করতে চাইল হামিদা, সেই পিঁড়িটাই ছুঁড়ে মারতে চাইল মেয়েকে। তার আগেই পা দোলানো বন্ধ করল নূরজাহান। চট করে পা তুলল চকির ওপর। চকির ওপাশে, জানালার কাছে চলে গেল।
জানালাটা খোলা।
জানালার বাইরে থইথই করছে বর্ষার পানি। সন্ধ্যাবেলার চাঁদ এখন আর আগের জায়গায় নাই। আকাশের বেশ কিছুটা উপরে উঠে আসছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না পড়ছে। বর্ষার পানিতে। মৃদু মোলায়েম হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় জ্যোৎস্নামাখা বর্ষার পানি ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। কইফফার ছাড়ার নিবিড় গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়ের তলার দিকে পৌঁছাতে পারে নাই চাঁদের আলো। মাথার দিকটায় লেগে আছে। কীরকম নিঝুম লাগছে ওদিকটা। নূরজাহান সেই নিঝুমতার দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভিতর তার ফিরে এল বসির ঘটককে বাড়িতে দেখার পরের সেই অনুভূতি। বিয়ার সমন্দ লইয়ানি আইলো ঘটকায়? পোলা কোন গেরামের? করে কী? দেখতে কেমুন? লাম্বাচুড়া, নাকি বাইট্টা?
ওদিকে মেয়েকে জানালার দিকে সরে যেতে দেখেই থেমে গিয়েছিল হামিদা। শরীরের তলা থেকে পিঁড়িটা আর বের করে নাই। এখন সেও নূরজাহানের মতনই নিঝুম হয়েছে। উদাস চোখে খোলা দরজা দিয়া উঠানের দিকে তাকিয়ে আছে। কুপির আলো দরজা ছাড়িয়ে বাইরের দিকে তেমন আগাতে পারে নাই। চৌকাঠ পেরিয়েই থেমে গেছে। ছনছার দিকটা আবছা আলোআঁধারি মাখা। গেরুয়া রঙের উঠান সাদা হয়েছে চাঁদের আলোয়। হঠাৎ করে বাড়িতে আসা কুকুরটা পাহারাদারের ভঙ্গিতে বসে আছে ছনছায়। মুখটা উঠানের দিকে, লেজ ঘর বরাবর। মুখের কাছটায় পড়েছে চাঁদের আলো, লেজের দিকটা অন্ধকার।
