তয় দবির এখন বাড়ি যাবে কী করে? এই এতটা পথ, নৌকা ছাড়া উপায় কী?
বসির ডাকাডাকি করছিল পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ওরকমই কথা ছিল। যে পাত্রের জন্য নূরজাহানের সমন্ধ আনছে শালার পো শালায়, মইরা গেলেও অর নাওয়ে আমি উড়ুম না। অর মুখ আমি আর দেহুম না। দরকার অইলে পানি ভাইঙ্গা বাইত্তে যামু, হাতরাইয়া যামু, তাও বইচ্ছা শুয়োরের পো’র লগে যামু না।
শার্ট খুলে পাগড়ির মতন মাথায় বাঁধল দবির। বেশ শক্ত করে বাঁধল। লুঙ্গি খুলে নতুন করে বাঁধল মাজায়, তারপর যতটা শক্ত করে কাছা দেওয়া যায়, দিল। দিকপাশ আর তাকাল না, খলবল খলবল করে ভাঙনের পানিতে নামল।
এটা ঘুরপথ। ঘুরপথেই যাবে দবির। মালেক দরবেশের বাড়ির ওদিক দিয়া গেলে পথ অনেকটা কমত। না ওদিকে যাবে না সে। ওদিকটায় ঘটকার কোষানাও লইয়া বইয়া রইছে। ফইজু। ফইজুর সামনে কোষায় না উইঠা পাইনতে নামছে দবির, হাতাইয়া বাইত যাইবো, ফইজু মনে করবো কী? ওয় তো আর ঘটনা জানে না। দবিররে পাইনতে নামতে দেখলেঐ চিল্লাচিল্লি শুরু করবো। করতাছেন কী গাছিদাদা? ওডেন, নায়ে ওডেন। ঘটকে না কইলো আপনেরে আমরা বাইত্তে দিয়ামু!
বর্ষার পানিতে দবিরের তখন হাঁটু ডুবছে, মাজা ডুবছে। মাজা ছাড়িয়ে বুক, বুক ছাড়িয়ে গলা। পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে মাটি। পানি, শরীরের তিনদিকে শুধু পানি। মাথার উপরকার পরিষ্কার আকাশ যেন তাকিয়ে আছে দবিরের দিকে, চাঁদ যেন টর্চলাইটের মতন জ্যোৎস্নাটুকু ফেলেছে শুধুই দবিরের উপর।
দবির আস্তে ধীরে সাঁতরাতে লাগল। অনেকটা দূরপথ, আস্তে ধীরে না সাঁতরালে শরীর ক্লান্ত হবে, অচল হবে। বাড়ি তরি যাইতে জান বাইর অইয়া যাইবো।
দিনভর তেমন রোদ ছিল না বলে, এই খানিক কোদাইল্লা বৃষ্টি, এই একটুখানি রোদ, আবার আকাশের মুখ গোমড়া, আকাশ আর মেঘের এইসব কায়কারবারে বর্ষার পানি গরম হওয়ার সুযোগ পায় নাই। শীতকালের দুপুরবেলার মতন কোমল মোলায়েম পানি। এই পানিতে শার্ট প্যাচানো মাথাটা শুধু জাগিয়ে দবির ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে। সড়কের পার ঘেঁষে অনেকটা জায়গা পরিষ্কার। এই জায়গা থেকে মাটি কেটে তোলা হয়েছে। সরকারের একোয়ার করা জমি। খাইও (গভীরও বেশি। এই জায়গা দিয়া সাঁতরে যাওয়ার সুবিধা হল ঘাস বিচালি বলতে কিছু নাই জায়গাটায়। ধইনচা কাইশ্যা কিছু নাই। আরামছে সারানো যাচ্ছে। চকের ভিতর দিয়ে সাতরাতে হলে কখনও পড়ত ধইনচা খেত, কখনও কাইশ্যা। আর নয়তো অন্যান্য ঘাস কচুরি। কচুরি অবশ্য দুই-চারটা এদিকটায়ও আছে। তাতে কোনও অসুবিধা নাই। ওইটুকু কচুরিতে সাঁতার কাটতে কষ্ট নাই।
পানির কোমলতায়, পরিষ্কার আকাশ, চাঁদের আলো আর নদী থেকে উড়ে আসা হাওয়ায় সাঁতরাতে সাঁতরাতে দবির এখন নূরজাহানের কথা ভাবছে। মান্নান মাওলানা আর ল্যাংড়া বসিরের কথা ভাবছে। নূরজাহানের জন্য বসির মান্নান মাওলানার সমন্দ আনছে শোনার পর মনে হয়েছিল দোষটা বসিরের। এইরকম সমন্দ ঘটকা শালার পো শালায় আনতে পারে না। আমি গাছি মানুষ। গরিব। তয় না খাইয়া তো থাকি না। খালি একহান মাইয়া আমার। মাইয়া ডাঙ্গর অইতাছে, অর বিয়াশাদির চিন্তা আমার আছে। টেকাপয়সা কিছু মাইয়ার লেইগা জমাইছি। মাইয়ার বিয়া ঠিক অইলে দেশগেরামের মাইনষেও তো কিছু সাহাইয্য করবো! দেলরা বুজির বইনপো আছে এনামুল, সেয় দিবো কিছু। খাইগোবাড়ির মাইনষে দিব। বিয়া ভালয় ভালয় অইয়া যাইবো। আইটকা গেলে দশগন্ডা জমিনের অর্ধেক বেইচ্চা হালামু, দরকার অইলে বেবাকহানি বেইচ্চা হালামু। মাইয়াডা ছাড়া আমার আর আছে কে। অর বিয়াশাদি অইয়া গেলে সংসারে খালি আমি আর নূরজাহানের মায়। দুইজন মাইনষের দিন কাইট্টা যাইবো। এই অবস্তায় ঘটকা শালার পো শালায় এইডা কেমুন সমন্দ আনলো?
ল্যাংড়া বসিরকে নিয়া এরকম একটা ঘোরের মধ্যে পড়েছিল দবির। এই ঘোর এখন চট করেই কেটে গেল। না, এইডা ঘটকার দোষ না! অরে পাডাইছে হুজুরে! নূরজাহান তার মোখে ছ্যাপ দিছিলো, দেলরা বুজিরে ধইরা, এনামুলসাবরে ধইরা ওই ঘটনা মিটমাট করছে দবির। হুজুরে কইয়া দিছে, নাদান মাইয়া, ভুল কইরা হালাইছে, আমি অরে মাপ কইরা দিলাম। হায় হায় ওইডা তো শালার পো শালায় উপরে উপরে করছে! ভিতরে ভিতরে অর ক্ষার (রাগ) নূরজাহানের উপরে রইয়া গেছে! হেই ক্ষার মিটানের লেইগা শুয়োরের পোয় এই পথ ধরছে! বিয়া কইরা একবার যুদি নূরজাহানরে অর বাইত্তে নিতে পারে, জিন্দেগিভর মাইয়াডার ছ্যাপ দেওনের শোধ লইবো! আমার মাইয়ার জানডা কুত্তার পো কুত্তায় খাইয়া হালাইবো! হায় হায় এই আজরাইলের হাত থিকা মাইয়াডারে অহন কেমতে বাঁচামু আমি? হায় হায়! নূরজাহান আর নূরজাহানের মা’য় তো এই কথা হোনলে ডরে মইরা যাইবো! একবার হুজুরের হাত থিকা নূরজাহানরে আমরা বাঁচাইছি, এইবার বাঁচামু কেমতে? হায় হায়!
ভয়ে আতঙ্কে হাত-পা অচল হয়ে আসতে চায় দবিরের, শরীর নড়তে চায় না। পানিতে ডুবে মরে যাওয়া মানুষের লাশের মতন ভেসে থাকে সে। বাড়ি এখনও অনেক দূর। এতটা পথ যেতে পারবে তো দবির! নাকি তার আগেই পানিতে ডুবে মরে যাবে! রাতেরবেলা কেউ কিছু টের পাবে না, সকালবেলা মেদিনীমণ্ডল আর কুমারভোগের মাঝখানকার চকে ভাসতে দেখা যাবে তার লাশ। মাথায় বাধা নীল শার্টটা তখনও হয়তো বাধাই আছে। পানিতে ভিজে প্যাঁচটা আরও শক্ত হয়েছে।
