এই ধরনের কাজের মজাটাই এখানে। বিয়াশাদির কাজে যত ভেজাইল্লা কাজ হাতে আসে পয়সাও আসে তত। যত ভেজাল তত পয়সা।
এইসব হিসাব করেই হুজুরের কাজটা নিয়া নামছে বসির। দুপুরের পর থেকে দিনের পুরা সময়টা ব্যয় করে খানিক আগে আসল কথাটা দবিরকে বলতে পেরেছে। বলার পর দবিরের অবস্থা যে এরকমই হবে সেটা বসির আগেই অনুমান করেছিল। তবে ওই নিয়ে কোনও কথা না বলে, বোবা মানুষের কায়দায় হঠাই হাঁটা দিবে দবির এতটা বোঝে নাই। দবিরকে হাঁটা দিতে দেখে এজন্যই অস্থির হল। ডাকাডাকি শুরু করল। কই মেলা দিলেন গাছিদাদা? আরে খাড়ন খাড়ন। আমি আপনেরে বাইত্তে দিয়ামু নে।
দবির ফিরাও তাকাল না। আগের মতনই বড় বড় কাইকে হাঁটতে লাগল।
বসির তার ল্যাংড়া পা টেনে যত দ্রুত সম্ভব সেন্টুর দোকান থেকে বের হল। আগের মতনই ডাকতে লাগল দবিরকে। আরে অইলো কী আপনের? বাইত যাইবেন কেমনে? খাড়ন আমি আইতাছি। আমিই বাইত্তে দিয়ামু নে?
না দবির আর দাঁড়াল না, দবির আর ফিরাও তাকাল না। পুবমুখী হাঁটছে তো হাঁটছেই। আকাশে চারভাগের একভাগ চাঁদ উঠেছে। চাঁদের তলা দিয়া ভেসে যাচ্ছে শ্রাবণ সন্ধ্যার মেঘ। কখনও একটুখানি ফুটছে জ্যোত্সা আবার আবছা অন্ধকারে ভরে যাচ্ছে চারদিক। আলোছায়ার এই খেলার ভিতর দিয়া বড় সড়কের দিকে উধাও হয়ে গেল দবির গাছি। অনেক ডাকাডাকি করেও তাকে ফিরাতে পারল না বসির। শেষমেশ আশা ছেড়ে দিল। খুবই বিরক্ত হয়ে একটা গাল দিল দবিরকে। যা শালার পো শালা, গোয়া মারা গিয়া। একদিকে হুজুরে লাগছে তর মাইয়ার পিছে আরেক দিকে লাগছি আমি। আমগো তো চিনছ না? বাপ ডাকাইয়া ছাড়ম নে। পায়ে ধইরা কাইন্দা কূল পাবি না নে! হুজুরের কাছেঐ মাইয়া বিয়া দেওনের লেইগা পাগল অইয়া যাবি নে! এই হগল কাম কেমতে করতে অয়। হেই বেয়ত (কায়দা) আমার জানা আছে।
এসময় কালিরখিলের দিক থেকে হেঁটে এল সেন্টু। দোকানে ঢুকতে গিয়া দেখে বসির দাঁড়িয়ে আছে বাইরে আর দবির গাছি নাই। তেমন অবাক সে হল না। হাসিমুখে বলল, কী অইছে ঘটক? বাইরে খাড়াইয়া রইছো ক্যা? গাছি কো?
হেয় গেছে গা। আমি খাড়ই রইছি তোমার টেকা দেওনের লেইগা। চা রসোগোল্লার দাম নিবা না?
ওইডা তো নিমুই। না নিলে খামু কী?
বসির পকেটে হাত দিল। তয় কও দেহি, কয় টেকা অইছে?
টাকার কথা বলার আগে সেন্টুর ইচ্ছা হল বসিরকে একটু ঘাঁটিয়ে দেখে গাছিকে এত খাতির করে চা মিষ্টি সিগ্রেট খাওয়াবার অর্থ কী? গাছির মেয়ে নূরজাহান ডাঙ্গর হয়েছে। নূরজাহানের বিয়ার সমন্ধ আনছেনি বসির? আইন্না থাকলে পোলাড়া কে? বাড়ি কোন গেরামে? মাইয়া দেখতে গাছির বাইত্তে কবে আইবো তারা?
কথাগুলি বলল না সেন্টু। অতি উৎসাহ খারাপ জিনিস। খারাপ জিনিস মনে চাইপা রাখাই ভাল।
সেন্টু হাসিমুখে বলল, দুই টেকা কইরা চাইরহান রসোগোল্লা অইলো আট টেকা আর দুই কাপ চা দুই টেকা। বেশি না ঘটক, বিল অইছে দশ টেকা।
সেন্টুর হাতে দশ টাকার একটা নোট দিল ল্যাংড়া বসির।
.
মাওয়ার বাজার থেকে পুবদিকে হেঁটে এলে, কুমারভোগের মুখে একটা কবরস্থান।
কবরস্থানের ওখান থেকে সোজা উত্তরে চলে গেছে সড়ক। এদিকটায় এখনও শেষ হয় নাই মাটি ফেলার কাজ। বেশ অনেকটা জায়গা ভাঙন। সেখানে থইথই করছে বর্ষার পানি। এইমাত্র একেবারেই পরিষ্কার হয়েছে আকাশ। চাঁদের তলা দিয়া কবুতরের মতন উড়াউড়ি করছিল শ্রাবণের মেঘ। সাদা আর ছাই বর্ণের মিশেল দেওয়া মেঘ। ঘোরকালো মেঘ হলে চাঁদ একেবারেই ঢাকা পড়ত। অন্ধকারে ডুবে যেত ত্রিভুবন। সাদা আর ছাই বর্ণের মিশেল দেওয়া মেঘ অতটা কাবু করতে পারে নাই চাঁদের আলো। এই ফুটফুট করে জ্যোৎস্না, এই একটুখানি অন্ধকার। চাঁদ আর মেঘের সেই খেলাটা শেষ হয়েছে। এখন আকাশ গিরস্তবাড়ির হোরা (ঝাড় দেওয়া) উঠানের মতন সাফসুতরা। গন্ধরাজ ফুলের মতন জ্যোত্সা চারদিকে। ভাঙনের দিককার পানিতে জ্যোৎস্না পড়ে ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। দক্ষিণের পদ্মা থেকে হু হু করে আসছে মায়া মমতার মতন হাওয়া।
সেন্টুর দোকান থেকে বের হয়ে সোজা এদিকটায় হেঁটে আসছে দবির। পিছনে ল্যাংড়া বসির আবালের মতন ডাকাডাকি করছিল, দবির ফিরাও তাকায় নাই। যে সমন্ধ নূরজাহানের জন্য বসির আনছে, ওইকথা শোনার পর সেই মানুষের ডাক আর শোনা যায় না, সেই মানুষের দিকে আর ফিরা তাকানো যায় না।
এরকম সমন্ধ বসির আনল কী করে? মান্নান মাওলানা হবে নূরজাহানের জামাই? কয় কী? নূরজাহানের বাপ দবিরের বাপের বয়সি লোক মান্নান মাওলানা। আর নূরজাহান অইলো চৌদ্দ-পোনরো বচ্ছরের মাইয়া! ঘটকার পোয় এইডা কইলো কী?
বসিরের মুখে বারোপদের কথা শুনতে শুনতে দবির যখন অস্থির, শেষমেশ বসির যখন মান্নান মাওলানার কথা বলল, দবিরের মাথায় সেন্টুর দোকানের চাল ঘেঁদা কইরা ঠাঠা পড়ল। ঠাঠায় দবির কিছুক্ষণের জন্য মারাও গেল। মাথা অচল অইলো দবিরের, চিন্তা ভাবনা অচল অইলো। ভোন্দার মতন (হতভম্বের মতো) অনেকক্ষণ চাইয়া রইল ঘটকার মিহি। তারবাদে আথকাই বাইর অইলো সেন্টুর দোকান থিকা। বড় বড় কাইক দেওনের পর এই ভাঙ্গনমিহি আইয়া, আশমানের চান আর গাঙ্গের হাওয়া, দবির ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে ফিরল। মাথা পরিষ্কার হল তার, চিন্তা চেতনা আগের জায়গায় ফিরা আসলো।
