অপলক চোখে দবিরের চোখের দিকে তাকাল বসির। শীতল গম্ভীর গলায় বলল, পোলা না, সে অইলো পোলার বাপ। নাম আব্দুল মান্নান মাওলানা।
লগে লগে যেন সাত আশমানের উপর থেকে দশদিক কাঁপিয়ে ভয়াবহ শব্দে ঠাঠা (বজ্রপাত) পড়ল। সেন্টুর দোকানের চাল ফুটা করে সেই ঠাঠা সরাসরি পড়ল দবিরের মাথায়। মুখোন হাঁ করা, চোখ দুইটা অপলক। দবিরের মনে হল সেন্টুর দোকানের বেঞ্চে বসে, হাত দুইখান রাখা আছে কনুইয়ের উপর, এই অবস্থায় মরে গেছে দবির। সে এখন জীবিত না, সে এখন মৃত। সে এখন লাশ।
.
আরে ও গাছিদাদা, খাড়ন খাড়ন।
ল্যাংড়া বসিরের দিকে আর ফিরাও তাকাল না দবির। সেন্টুর দোকান থেকে বের হয়ে হনহন করে হাঁটতে লাগল। মান্নান মাওলানার জন্য নূরজাহানের বিয়ার প্রস্তাব আনছে বসির এটা শোনার পর সে আর একটা কথাও বলে নাই বসিরের লগে। ঠাঠায় মরে যাওয়া। মানুষের মতন অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল বসিরের দিকে। চোখে পলক পড়ে নাই, চোখের মণি নড়ে নাই একটুও। দমও বুঝি বন্ধ ছিল।
তারপর একসময় নিজের মধ্যে ফিরল দবির। চোখে পলক ফেলল, বড় করে দম ফেলল। আর কোনও দিকে তাকাল না, হঠাত্র উঠে দাঁড়াল। দুই-তিনখান বড় কাইক (পা ফেলা অর্থে) ফেলে প্রথমে দোকান থেকে বের হল, বের হয়ে দিকপাশ দেখল না, বাজারের পুবমুখী বড় সড়কের দিকে একই ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল।
সেন্টু তখনও আপেল মেম্বারের রসগোল্লা পৌঁছে দিয়া ফেরে নাই। দোকানে সাঁ সাঁ করে জ্বলছে ম্যান্টেল ঝুলে পড়া হ্যাঁজাকবাতি। হ্যাঁজাকবাতির চারপাশে বিনবিন করে উড়ছে অজস্র পোকা, বাতির তাপ উত্তাপে পুড়ে মরছেও সমানে। বাতার লগে ঝুলতে থাকা হ্যাঁজাকবাতির ঠিক নীচে, পাটাতনের ওপর ধীরে ধীরে জমছে মরাপোকা।
দবিরকে এভাবে বের হয়ে যেতে দেখেই তাকে ডাকল বসির। দবির ডাক শুনল না, ফিরাও তাকাল না তার দিকে, এটা বসিরের জন্য নতুন কোনও ঘটনা না। ঘটকালির কাজে এই ধরনের অভিজ্ঞতা তার আছে। চিন্তার বাইরের পাত্র পাওয়া গেছে বা তার জন্য সমন্দ। আনছে বসির, আচমকা সেই পাত্রের কথা শুনে এরকম নির্বাক হয়ে যায় অনেক মা-বাপই। সেই ধাক্কা সামলাতে একটু সময়ও লাগে।
তা লাগুক। তাতে বসিরের কোনও অসুবিধা নাই। সে হচ্ছে কাউট্টা (কচ্ছপ)। একবার কামড় দিয়া ধরলে ছাড়াছাড়ির নাম নাই। শেষ তরি দেখে নিবে। আর নূরজাহানের লগে হুজুরের বিয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ার কিছু নাই। আগে আতাহারের বিয়াটা হবে তার দুই চার-ছয় মাস পর হুজুর একটা ভেক ধরবেন। আমার শইল ম্যাজম্যাজ করে, অজুর পানি আউন্নাইয়া দেওনের লেইগা একজন মানুষ লাগে, জায়নামাজ আউন্নাইয়া দেওনের লেইগা একজন মানুষ লাগে। রাইত্রে পায়ে ইট্টু তেল দিয়া দিব, বস তো আমার তেমন বেশি অয় নাই। এই বসে বউ একহান লাগে, বউ ছাড়া থাকন যায় না। নূরজাহানরে আমার পছন্দ অইছে। হ, ও আমারে অপমান করছে। শয়ে শয়ে মাইনষের সামনে আমার মোখে ছ্যাপ দিছে। ওই হগল আমি মনে রাখি নাই। অল্প বসি নাদান মাইয়া। আমার সংসারে আইলে ঠিক অইয়া যাইবো…
বাড়ির সবাই হুজুরের আসল উদ্দেশ্য বুঝবে। গ্রামের লোকেও বুঝবে। ওইসব বোঝাবুঝিতে হুজুরের কিছু যায় আসে না। তিনি তাঁর কাজটা করবেন। যেমন করে পারেন নূরজাহানকে বিয়া কইরা আনবেন। তারপর যে মুখে নূরজাহান তাঁকে থুতু দিয়েছিল সেই মুখ দিয়া যা যা করানো যায় সবই করাবেন। হুজুরের সেই প্রতিশোধ নূরজাহান ছাড়া দুনিয়ার কেউ বুঝতে পারবে না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। যাহ, এইরকম কাম কোনও মাইনষে করতে পারেনি?
হুজুর যে মানুষ না, হুজুর যে জানোয়ার এটা জেনে বুঝেও অনেকে বিশ্বাস করবে না।
বসির এসব বোঝে। বুঝেই কাজটা সে হাতে নিয়েছে। প্রথমদিন হুজুর যখন আতাহারের বিয়াশাদির কথা বলার পর নিজের বিয়ার কথাটা বললেন, তখনই কিছুটা অবাক হয়েছিল বসির। এই বয়সে এমন কামেলদার মানুষ আবার বিয়া করতে চাইছেন? যাঁর নাতি নাতকুড় বড় হয়ে গেছে সেই মানুষ চাইছেন আবার বিয়া করতে? তাও নূরজাহানের মতন নাতনির বয়সি একটা মেয়েকে?
বসিরের মতন ঘাঘুলোকের অবশ্য বুঝতে দেরি হয় নাই, কারণটা কী? দেশগ্রামে এত মেয়ে থাকতে নূরজাহানকেই কেন তিনি বিয়া করতে চাইছেন?
সেদিন আর কোনও কথা বলে নাই বসির। দিন কয়েক পর নিজেই গেছে হুজুরের কাছে। কাজটা করতে পারলে কতটাকা দিবেন হুজুর সেসব আলাপ করা দরকার। আর কিছু যদি অ্যাডভান্স দেন। অন্তত হাজার দুয়েক।
দু’হাজার দেন নাই হুজুর, দিছেন পাঁচশো। ওই নিয়াই কাজ শুরু করতে হবে। কাজ যত আগাবে ততই ধীরে ধীরে দুইশো-পাঁচশো করে পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে দশহাজার। তবে এর বাইরেও একটা বাণিজ্য আছে। দবির নূরজাহান আর হামিদা এই তিনজনের পিছনে যদি সমন্ধ বাবদ, অর্থাৎ তাদেরকে পটাপটির কাজে এক্সট্রা কিছু খরচাপাতি হয় সেই। খরচা হুজুর আলাদা দিয়া দিবেন। আজ এই যে দবিরের পিছনে রসগোল্লা চা আর সিগ্রেট খরচা করল বসির, এই পয়সা বসিরের পকেটের না, এই পয়সা হুজুরের। দুয়েকদিনের মধ্যেই হুজুরের বাড়িতে গিয়া, ঘটনা কতদূর আগাল, প্রস্তাব শুনে দবিরের কী অবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি বয়ান করার লগে খরচের টাকাটাও নিয়া নিবে বসির। লগে কিছু ফাউও নিবে। দিনরোজে ফইজুকে নিয়েছে নাওয়ের মাঝি হিসাবে, তার একটা মজুরি ধরবে। সেই মজুরির পুরোটাই দেবে না ফইজুকে। ফইজুর নামে চল্লিশ টাকা পেলে দিবে বিশটাকা। বাকি বিশ নিজের পকেটে।
