সেন্টু চলে যাওয়াতে বসির খুব খুশি। হে হে করা হাসিটা হেসে বলল, আমি অহন বহুত খুশি।
দবির তাকিয়ে ছিল বাইরের দিকে। চোখ ফিরিয়ে বসিরের দিকে তাকাল। ক্যা, খুশি ক্যা?
মালাউনের বাচ্চায় নাই দেইক্কা।
দবির অবাক। এতক্ষণ ধরে সেন্টুদাদা সেন্টুদাদা করল যে লোকটা, মাত্র চোখের আড়াল হয়েছে সেন্টু লড়ে লড়েই সে মালাউনের বাচ্চা হয়ে গেল? আজব কারবার!
তয় এইসব নিয়া কথা বলল না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আসল কথার বারোআনি এখনও শোনা হয় নাই দবিরের। আর দেরি করা যাবে না। এখন পুরা কথা শুনতেই হবে।
এই প্রথম বসিরকে একটু তাড়া দিল দবির। কও রে দাদা, কও। কোন বাড়ির পোলা? পোলার নাম কী? বাপদাদার নাম কী?
বসিরের মুখে আবার সেই হে হে। কইতাছি। এইডাইত্তো কওনের আসল টাইম। মালাউনের বাচ্চায় গেছে দেইক্কা এর লেইগাইত্তো খুশি অইলাম। হোনেন গাছিদাদা, আগেঐ কইছি পোলার অবস্থা বিরাট। বিলে ষোলো-সতেরো কানি জমিন আছে। বাইত্তে চৌচালা চাইর-পাঁচহান ঘর। আথালে গাই আছে দশ-বারোডা। বচ্ছরে ধান যা পায়, চাইর ভাগের একভাগেরও কম লাগে বাইত্তে। বাকি ধান বেইচ্চা টেকা পায় লাখ লাখ।
দবির চিন্তিত। এমুন পোলা মেদিনমণ্ডলের কোন বাড়ির? আমি তো বিচড়াইয়া পাইতাছি না।
পাইবেন, পাইবেন। আমি কইলেঐ পাইবেন।
তয় কও না ক্যা?
আপনের লগে ইট্টু রহস্য করতাছি। হে হে।
রাইত অইয়া যাইতাছে দাদা। বাইত যাওন লাগবো। অহন আর রহস্য কইরো না।
বসির তবু তার জায়গা থেকে নড়ল না। আগের মতনই রহস্যের গলায় বলল, বিদেশ থিকাও টেকা আহে পোলার। মাসে মাসে একলাখ-দেড়লাখ টেকা।
কও কী?
হ।
কোন দেশ থিকা?
জাপান জাপান। জাপানি টেকা।
দবির ভ্রু কুঁচকাল। পোলার ভাই বেরাদর কেঐ জাপান থাকে?
এইডা কইলেঐত্তো আপনে চিন্না হালাইবেন। হে হে।
দবিরের মনের ভিতর বড়সাইজের একটা ডাইয়া (ভেঁয়ো পিঁপড়ে) যেন হাঁটাচলা করছিল এতক্ষণ। এইমাত্র সেই বজ্জাত ভালরকম কামড় দিয়া ধরছে। নিজের অজান্তেই দবির যেন বলল, তুমি কি হুজুরের পোলার কথা কইতাছো? আতাহারের কথা কইতাছো? অর ছোডো ভাই থাকে জাপানে। অগোঐত্তো বিলে ষোলো-সতেরো কানি জমিন। বাইত্তে চাইর-পাঁচহান চৌচালা টিনের ঘর। আথালে দশ-বারোহান গাই! না, না। আতাহার পোলা ভাল না। মদপানি খায়। মোতাহারের বউর লগে বহুতদিনের খাতির। পোলাপান তিনডার বাপ মোতাহার না, বাপ অইলো আতাহার। এইডা তুমি কেমুন সমন্দ আনছো আমার মাইয়ার লেইগা?
দবিরের দিশাহারা মুখ দেখে একটুও বিচলিত হল না বসির। আগের মতনই হাসল। হে হে। আতাহারের যত দোষঐ থাকুক, অর মতন পোলায় আপনের লাহান গাছির মাইয়া বিয়া করবো না। ভাবির লগে ইটিস পিটিস করুক আর যাই করুক, তিনহানের জাগায় দশহান পোলাপান পয়দা করুক ভাইর বউর পেড়ে, তারবাদেও আতাহারের লাহান পোলার ম্যালা দাম। ওইরকম পোলা আপনের মাইয়ারে বিয়া করবো না। অর বিয়া আমি বিরাট ঘরে ঠিক করতাছি।
খুবই অপমানকর কথা, দবিরকে খুবই ছোট করা। তবু মন খারাপ করল না দবির, খুশিই হল। যাক আতাহারের মতন বজ্জাতের জন্য যে নূরজাহানের সমন্দ আনে নাই বসির!
তাইলে ওইরকম অবস্থার পাত্রহান কে মেদিনমণ্ডল গেরামে? আতাহার ছাড়া আর কাগো এইরকম অবস্থা?
সন্ধান পায় না দবির। ভিতরে গভীর এক অসহায়ত্ব।
কাতর অনুনয়ের গলায় দবির বলল, দোফরের পর থিকা তোমার লগে আছি দাদা। আমার বাইত্তে তোমারে দেইক্কাঐ বুজছিলাম নূরজাহানের সমন্দ লইয়া তুমি আইছো। এতাহানি সমায় কাইট্টা গেছে তাও কও নাই পোলাডা কে! খালি রহস্য করতাছো। আর রহস্য কইরো না দাদা। আমার অস্থির লাগতাছে। সমর কথা কও, হুইন্না বাইত যাই। তোমার ভাবিছাবের লগে কথাবার্তা কই। বুজলা না?
বসির তবু আগের মতনই। বুজছি গাছিদাদা, বুজছি। হে হে। তয় একহান শেষকথা আপনেরে আমি কই, যুদি ওই পোলার কাছে মাইয়া বিয়া দেন তয় মাইয়া তো আপনের রানির হালে থাকবোঐ, মাইয়ার লগে লগে আপনেও থাকবেন রাজার হালে। গরিব গাছি। দেইখা দেশগেরামের মাইনষে আপনেরে গনায় ধরবো না, মানুষঐ মনে করবো না, আপনের চলাফেরা করন লাগবো বিলাইয়ের লাহান হেইডা আর অইবো না। আপনে তহন। ছিনা টান কইরা হাঁটবেন। গাছিগিরি করনঐ লাগবো না। আপনের সংসার চলবো জামাইর টেকায়। মাইয়া আপনের গয়নার ভারে হাঁটতে পারবো না। হে হে।
দবির মনে মনে আবার বলল, হেইডাঐ য্যান অয় আল্লাহ। হেইডাঐ য্যান অয়। জামাই বাইত্তে গিয়া আমার নূরজাহান য্যান বিরাট সুখে শান্তিতে থাকে। বাপের সংসারে যা না। পাইছে জামাইর সংসারে গিয়া য্যান তাই পায়।
বসির বলল, আপনের রাজি অইয়া যাওন উচিত গাছিদাদা।
দবির অস্থির গলায় বলল, পোলার নামডাইত্তো কইতাছো না? নাম না জাইন্না রাজি অই কেমতে?
একথার ধার দিয়াও গেল না বসির। বলল, চাইলে বিলের এক-দেড় কানি জমিন আপনেরে লেইক্কা দিবো জামাই। বাইত্তে দরকার অইলে আরেকহান চৌচালা ঘর উড়াইয়া দিবো। বাইত্তে আরেকহান ঘর না থাকলে মাইয়া জামাই যহন নাইওর আইবো, থাকবো কোন ঘরে? একঘরে হৌর হরির লগে জামাই মাইয়া থাকবো কেমতে? আপনে রাজি অইয়া যান দাদা।
দবির ততক্ষণে সহ্যের একেবারে শেষ সীমায়। গলা চড়ল তার। এত প্যাচাইল না পাইরা পোলাডা কে হেইডা আগে কও। তুমি খালি আবল তাবল প্যাচাইল পাড়তাছো। আসল কথা কইতাছো না। এই হগল কথা পরে। আগে পোলার কথা কও।
