খানিক তাকিয়ে থেকেই মেয়েটাকে সে চিনতে পারল। নূরজাহান।
কিন্তু ছেলেটি কে আগে কখনও দেখেনি তো!
আলী আমজাদ আর আশপাশে তাকাল না, নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার মুখে মুখে এই এতটা দূর থেকেও অপূর্ব লাগছে মেয়েটাকে।
আলমগির বলল, কী দেকতাছেন কনটেকদার সাব?
আলী আমজাদ আগের মতোই নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু দেহি না। চিন্তা করতাছি।
কী চিন্তা করেন?
আলী আমজাদের কথা শুনে আতাহাররা চারজনই হেসে উঠল।
হাঁটতে হাঁটতে নূরজাহান আর সেই ছেলেটা তখন আলী আমজাদের ঘর বরাবর সড়কে এসে দাঁড়িয়েছে। কী কথায় নূরজাহান শিশুর মতো দুলে দুলে হাসছে। আলী আমজাদ মুগ্ধ হয়ে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
সুরুজ ঠাট্টার গলায় বলল, মনে যহন চাইছে, বিয়া তাইলে আর একখান কইরা হালান। অসুবিদা নাই। মোসলমানরা চাইরখান বিয়া করতে পারে।
আতাহার বলল, কারে করবেন চিন্তা করছেন?
আলী আমজাদ আঙুল তুলে নূরজাহানকে দেখাল। ঐ অরে।
আতাহাররা সড়কের দিকে তাকাল।
আলমগির ভুরু কুঁচকে বলল, নূরজাহানরে! কন কী? ও তো আপনের মাইয়ার লাহান।
আলী আমজাদ নিঃশব্দে হাসল। দুই নম্বর বউ মাইয়ার লাহান অওনঐ ভাল।
তারপর চিন্তিত গলায় বলল, নূরজাহানের লগে ছেমড়াডা কে?
নিখিল বলল, হালদার বাড়ির মজনু। ঢাকায় থাকে। খলিফাগিরি হিগতাছে।
আলী আমজাদ তারপর চকি থেকে নামল। তোমরা বহ, আমি ইট্টু ঘুইরাহি।
.
১.২০
বন্ধ ছাতি হাতে সড়কের মুখে দাঁড়িয়ে আছে হেকমত। শখানেক মাটিয়ালের কেউ কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কোদালের আগায় তুলে কায়দা করে ভরে দিচ্ছে মোড়ায়। তারপর হুমহাম শব্দে সেই মোড়া তুলে দিচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, লুঙ্গি কাছা মারা, মাজা বরাবর শক্ত গিটটু (গিট) দিয়ে বান্ধা গামছা, মাথায় নাড়ার তৈরি বিড়া, বিড়াখানার দুই দিকে আছে সরু শক্ত দড়ি, সেই দড়ি দুই কানের পাশ দিয়ে বান্ধা যাতে হাঁটাচলা করার সময়, মাটি ভর্তি যোড়া মাথায় তোলার সময় বিড়াখান সরে না যায়, পড়ে না। যায়, এমন মাটিয়ালের মাথায়। কেউ কেউ মাটি ভর্তি যোড়া মাথায় সড়কের নামা থেকে উঠছে উপরে, জায়গা মতো গোড়া উপুড় করে মাটি ফেলছে কেউ, কেউ খালি মোড়া নিয়ে নেমে আসছে নামার দিকে। সব মিলিয়ে এলাহি কারবার। হেকমতকে রাখা হয়েছে এই সবের তদারক করতে। কিন্তু আলী আমজাদ যতক্ষণ এখানে এসে থাকে ততক্ষণ হেকমত কিছুতেই কাজে মন দিতে পারে না। মিলেমিশে দাঁড়িয়ে থাকে মাটিয়ালদের মাঝখানে, নজর থাকে ছাপড়া ঘরটার দিকে। কখন আলী আমজাদ বের হবে, কখন ছাতি খোলার সুযোগ পাবে সে।
এখনও তেমন একটা ভাবের মধ্যেই ছিল হেকমত। মাটিয়ালদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের কাজকর্ম কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। চঞ্চল চোখে বার বার তাকাচ্ছিল ছাপড়া ঘরটার দিকে। ফলে আলী আমজাদকে বের হতে দেখে ব্যাকুল হয়ে গেল সে, ফটাস করে ছাতি মেলল, দিশাহারা ভঙ্গিতে ছুটে এল আলী আমজাদের সামনে। দুই হাতে অতিশয় বিনয়ে খোলা ছাতি ধরল তার মাথার উপর।
এখন প্রায় সন্ধ্যা। পশ্চিমে, বহুদূরের গ্রামপ্রান্তে সিন্দুইরা (সিঁদুরে) আমের মতো বোঁটা আলগা হতে শুরু করেছে সূর্যখানার। যে কোনও সময় টুপ করে বসে যাবে। তার আগে কোন ফাঁকে যেন বাড়ির আঙিনায় শুকাতে দেওয়া শাড়ি যেমন তুলে নেয় গিরস্থ। বউ তেমন করে তুলে নিয়েছে দিনভর ফেলে রাখা রোদ। ছায়া ছায়া মায়াবি একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারদিকে। উত্তরের হাওয়া আরও জোরে বইছে। বেপারি বাড়ির আথালে (গোহালে) হাম্বা স্বরে ডাকছে একটা আবাল (তরুণ ষাড়)। সারাদিন ইচ্ছা স্বাধীন চড়েছে চকেমাঠে। এখন বাড়ি ফিরে আথালের পরাধীনতা মানতে চাইছে না। পদ্মার নির্জন চরে শস্যদানা খুঁটতে গিয়েছিল যেসব পাখি এখন তাদের ফিরার পালা। মাথার অনেক উপর দিয়ে সাং সাং শব্দে উড়ে যাচ্ছে সেই সব দিনশেষের পাখি। ঠাকুর চদরি বাড়ির দেবদারু তেঁতুলের অন্ধকার থেকে, বাঁশঝাড়ের ডগা থেকে পা খসাতে শুরু করেছে বাদুড়েরা। আকাশ কালো করে এখনই ওড়াউড়ি শুরু করবে তারা। আর এসময় কী না রোদ আড়াল করবার জন্য একজন মানুষ ছাতি মেলে ধরেছে আরেকজনের মাথায়!
দৃশ্যটা দেখে খিলখিল করে হাসতে লাগল নূরজাহান।
নূরজাহানের পাশাপাশি ধীর পায়ে হাঁটছে মজনু। সড়কে এসে ওঠার পর থেকেই সে কেমন আনমনা। কোনও কারণ নাই তবু মন উদাস উদাস লাগছে। এই এক অদ্ভুত জিনিস মানুষের দেহে ঢুকিয়ে দিয়েছেন আল্লাহপাক, মন। কখন খারাপ হবে তা, কখন ভাল, কখন না ভাল না খারাপ, কখন উদাস বিষণ্ণ অনেক সময়ই মানুষ তা বুঝতে পারে না। এখন যেমন পারছে না মজনু।
নূরজাহানের বাবার কথায় নিজের বাবার কথা মনে পড়েছিল বলেই কী মন এমন খারাপ হয়েছে তার!
কে জানে!
নূরজাহানকে হাসতে দেখে তার মুখের দিকে তাকাল মজনু। কী অইছে রে? এমতে হাসছ ক্যা?
নূরজাহানের স্বভাব হচ্ছে তার হাসির সময় সেই বিষয় নিয়ে কেউ কথা বললে হাসি আরও বেড়ে যায়। এত জোরে হাসতে শুরু করে সে, হাসির চোটে চোখে পানি আসে।
