বুজলাম। গেরামের নাম কইতে অসুবিদা আছে?
না কীয়ের অসুবিদা?
তয় কও।
ধরেন মেদিনমণ্ডলেরঐ পোেলা।
দবির একটু বিরক্ত হল তয় বিরক্তটা প্রকাশ করল না। সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, ধরনের কী আছে? মেদিনমণ্ডলের পোলা অইলে কও, হ মেদিনমণ্ডলের পোলা।
হ মেদিনমোণ্ডলের পোলা।
কোন বাড়ির পোলা? বাপের নাম কী?
ওইডা পরে কই। আগে পোলার বিবরণ হোনেন।
কও, কও।
আরেক গেলাস চা খাইবেন নি?
অহন আর খামু না।
ক্যা?
আমি চা বেশি খাই না। চা খাইলে রাইত্রে ঘুম আহে না।
আইজ আইবো। হে হে।
কেমতে বুজলা?
যেই পোলার লেইগা আপনের মাইয়ার সমন্দ আনছি, হেই পোলার কথা হোনলে এক গেলাস ক্যা, দশ-বিশ গেলাস চা খাইলেও ঘুম আপনের অইবোই। কারণ হোনবেন? হে হে।
কও।
কারণডা অইলো বেক মা-বাপেঐ চায় তার মাইয়াডার ভাল ঘরে বিয়া অউক। টেকা পয়সা আছে, জাগাসম্পত্তি বাড়িঘর আছে, পোলার রুজিরোজগার ভাল। ওই পদের জামাইর কাছে মাইয়া সুখে শান্তিতে থাকবো। আপনের অইলো একহান মাত্র মাইয়া। ওই মাইয়াডার যুদি ভাল ঘরে, ধনী জামাইর লগে বিয়া অয় তয় তো আপনের ইহজিন্দেগিতে আর কোনও চিন্তা নাই। আপনে খালি খাইবেন আর ঘুমাইবেন। হে হে। দশবিশ গেলাস চা খাইলেও ঘুম নষ্ট অইবো না।
দবির মনে মনে বলল, ঐডাই য্যান অয় আল্লাহ, ঐডাই য্যান অয়।
সিগ্রেটে টান দিয়া বসির বলল, খাইবেননি আরেক গেলাস? দিতে কমু?
না রে দাদা। অহন না। খাইলে পরে খামু নে। তুমি খাও। তোমার তো চা’র নিশা।
না, তয় আমিও খামু না। ঘটক মানুষ, ঘনঘন চা খাই। কয়দিন ধইরা খুব বায়ু অয়। হে হে। রাইত্রে ঠাস ঠাস কইরা বায়ু ছাড়ি। আপনেগো বউ বকাবাজি করে। হে হে।
হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে আসছে। নূরজাহানের সমন্দের উত্তেজনায় সিগ্রেট একটু ঘনঘনই টান দিয়েছে দবির। তারটা প্রায় শেষ, বসিরেরটা এখনও দুইটান খাওয়া যাবে।
সিগ্রেটে শেষ টান দিল দবির। সেন্টুর দোকানের সামনে একটুখানি প্যাককাদা জমে আছে। সেই প্যাককাদার দিকে টোকা মেরে সিগ্রেটের পিছনটা ফেলে দিল। অতি আপনজনের কায়দায় বসিরকে বলল, চা কম খাওয়ার চেষ্টা কইরো। রসগোল্লা চা এই। হগল জিনিস যত খাইবা পেডের দশা তত খারাপ অইবো। বায়ু খুবই খারাপ রোগ। একবার অইলে রক্ষা নাই। হুজুরের পোলা মোতাহাররে দেখলা না, কেমতে মইরা গেল!
বসির হে হে করে হাসল। কথা মান্নান মাওলানার দিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে আমোদ। পেয়েছে।
সেন্টু ততক্ষণে হাতের কাজ শেষ করেছে। দুইকুড়ি বড়সাইজের রসগোল্লা হাঁড়িতে ভরে। হাঁড়ির মুখ বেঁধেছে পুরনা পেপার (খবরের কাগজ) দিয়া। ডাবল করে সুতলি দিয়েছে যেন শক্ত করে হাতে ঝুলানো যায়। কাজে এতটাই মগ্ন ছিল, এই এতক্ষণে একবারও তাকায় নাই বসির দবিরের দিকে। এত কাছাকাছি থেকেও শুনতে পায় নাই দুইজন মানুষ কী এত কথা বলছে।
এখন হাতের কাজ শেষ হয়েছে দেখে মানুষ দুইজনের দিকে পলকের জন্য তাকাল। তারপরই আরেক কাজে ব্যস্ত হল। দোকানের পিছন দিক থেকে পুরনো হ্যাঁজাক বাতিটা এনে প্রথমে খুবই সাবধানে, খুবই যত্নে বাতির কাঁচ ত্যানা দিয়া মুছল। ম্যান্টেলের একটা কোনা খুলে ঝুলছে, সাবধান না হলে পুরাটা খুলে যাবে। তা হলেই কয়েকটা টাকা গচ্চা। নতুন ম্যান্টেল কিনে লাগাতে হবে। তারচেয়ে পুরনাটা দিয়া যে কয়দিন কাজ চালানো যায়। কোনা ঝুললে কী হবে, আলো তো হয় ফকফকা।
কাচ মোছা শেষ করে আগের মতনই সাবধানি ভঙ্গিতে হ্যাঁজাক পাম্প করল সেন্টু। জোরে পাম্প করলেও খুলে পড়তে পারে ম্যান্টেল। বেশ খানিকটা সময় ধরেই কাজটা সে করল। তারপর ম্যাচ জ্বেলে হ্যাঁজাক ধরাল। হ্যাঁজাকের সোঁ সোঁ শব্দ আর সাদা আলোয় ভরে গেল দোকান।
তখনও কাজ শেষ হয় নাই। অতি সাবধানে হ্যাঁজাকটা তারপর তুলে ধরল সেন্টু। দোকানঘরের বাতার লগে কুকিচ বিস্কুটের মতন (এই বিস্কুটটা ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো দেখতে ছিল। গ্রাম অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় ছিল। এখন আর পাওয়া যায় না) বড়সাইজের লোহার একটা আংটা ঝুলছে, সেই আংটার লগে হ্যাঁজাক ঝুলিয়ে দিল সেন্টু। তারপর আনন্দের একটা শব্দ করল। অর্থাৎ কাজটা ভালভাবে শেষ করতে পেরেছে।
নিজের সিগ্রেট শেষ করে বসিরও তখন দবিরের কায়দায় ছুঁড়ে ফেলেছে দোকানের সামনে। ছ্যাত করে সামান্য একটা শব্দ করে নিভেছে সিগ্রেটের আগুন।
আপেল মেম্বারের মিষ্টির হাঁড়ি নিয়া দোকানের বাইরে পা দিয়েছে সেন্টু। দবির বসির দুইজনকেই বলল, আপনেরা ইট্টু বইয়েন।
বসির বলল, আপনে যাইতাছেন কই সেন্টুদাদা?
মেম্বরের মিষ্টি দিয়াহি।
কই দিয়াইবেন?
কালিরখিলের মাডে বইয়া মেম্বরে অহন চাডামি (আ) মারতাছে। ওহেনে গিয়া মিষ্টির পাতিল দিয়াইলে খুশি অইবো।
হেয় না কইলো দোকানে আইয়া লইয়া যাইবো?
হ কইছে। তার কওন হেয় কইছে, আমার কাম আমি করলে বহুত খুশি অইবো। বোজেন না, আমরা হিন্দুমানুষ। কত কিছু হিসাব কইরা চলতে অয়।
দুইজন মানুষের এসব কথার একটাও ভাল লাগছিল না দবিরের। সে আছে তার। উত্তেজনায়। এখনও পুরা কথা শোনা হয় নাই। আধাবিধি হয়ে আছে কথা। মেদিনমণ্ডলের কোন বাড়ির পোলার লেইগা সমন্দ আনছে ঘটকায়? জাগাসম্পত্তি বাড়িঘর আর রুজি রোজগারের কথা যেই হগল কইলো, ওইরকম পোলা কোন বাড়ির?
মনে মনে মেদিনমণ্ডলের প্রত্যেকটা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল দবির।
