দবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দেখতে দেখতে কতদিন গেল গা। মাইয়া ডাঙ্গর অইয়া গেল। আইজ তোমার লাহান নামকরা ঘটকে আমার মাইয়ার খবর লইতাছে। দিন কেমনে চইলা যায়?
যে কথা শোনার জন্য বুকের ভিতর এত উত্তেজনা, এত অপেক্ষা সেই কথা শোনার আগে কেন যে এতসব কথা বসিরকে দবির বলল, কে জানে।
দবিরের কথা মন দিয়াই শুনছিল বসির। দবির থামার পর তার সেই হাসিটা হাসল। হে হে গাছিদাদা, দেহেন তো, কেমুন মানুষ আপনে? মাইয়ার জন্মের রাইতটা পুরাপুরি মনে। রাখছেন আর আসল কথাই মনে রাখেন নাই। সন তারিখ। সন তারিখ জানা থাকলে মাইয়ার আসল বসটা জানন যাইতো। তয় আমার মনে অয় চৌদ্দ-পোনরো বছর বস অইবো না নূরজাহানের।
দবির অবাক। তয় কত অইবো?
বেশি অইবো। ষোলো-সতেরো।
আরে না রে দাদা, এত অইবো না।
অইবো। মাইয়ার শইল চেহারা দেখলে বুজা যায়। আর ঘটকরা অইলো ঘাঘুমাল। আবিয়াতো পোলা মাইয়ার শইল মুখ দেখতে দেখতে চকু পাইক্কা যায় ঘটকগো। একপলক একজনরে দেইক্কাঐ কইয়া দিতে পারে বস কত অইবো।
তুমি এর মইদ্যে নূরজাহানরে দেখছো নি?
এবার একটু ফাঁপরে পড়ল বসির। আমতা গলায় বলল, না এর মইদ্যে দেহি নাই। তয় আরবচ্ছর দেখছিলাম। তহনঐ মাইয়ার বস পোনরো-ষোলো মনে অইছে আমার। এই এক বচ্ছরে আরও ডাঙ্গর অইছে না? হে হে।
সেন্টুর দোকানে দবির আর বসির ছাড়া কোনও গাহেক নাই। বিকালবেলা বাজারের দিকে তেমন লোকজন হয় না। মেঘবৃষ্টি না থাকলে, রোদ আর খটখটা শুকনা থাকলে দুই চারজন আড্ডাবাজ মানুষ বাজারের দিকে আসে। সেন্টুর দোকানে বসে মিষ্টি না খেলেও চা দুই-চারকাপ খায়। আজ সকাল থেকে এই বৃষ্টি এই একটুখানি রোদ, আকাশ এই পরিষ্কার এই মেঘলা। কখন হঠাই নামবে বৃষ্টি, হঠাই অন্ধকার হবে চারদিক কে জানে। এজন্য আড্ডাবাজ গিরস্তলোক বাড়ি থেকে বের হয় নাই। আপেল মেম্বারের বাড়িতে হয়তো কুটুম আসছে। এজন্য বাধ্য হয়ে মিষ্টি নিতে আসছে বাজারে। তবে দুইকুড়ি বড়সাইজের রসগোল্লা বেচে বিশ-পঁচিশ কাপ চায়ের লাভ তুলে ফেলবে সেন্টু। কারবারের দিক দিয়া খুবই সরস সে। ভজাকে নিয়া নানা প্রকারের শোকতাপ প্রকাশ করার পর, হিন্দু হয়ে দুইজন মুসলমানের সামনে আরেকজন মুসলমান মিষ্টির দোকানদার আকবরকে ‘শালার পো শালা’ বলে সমানে গালাগাল করে গেল। মুসলমান দুইজন চেতে যায় কি না ভাবলই, আকবরের উপর ঝাল যা ঝাড়ার ঝেড়ে যেই আপেল মেম্বারের দুইকুড়ি বড়সাইজের রসগোল্লার অর্ডার পেল লগে লগে ভুলে গেল দোকানে দুইজন গাহেক আছে। তারা দুইজন কথাবার্তা বলছে নিজেদের মধ্যে। কী বলছে না বলছে এত কাছে থেকেও সেকথা শুনছে না সেন্টু। নিজের ব্যাবসায় ডুবে গেছে। দোকানের পিছন দিককার বড় বড় কড়াইগুলির একটি থেকে লোহার হাতায় করে রসগোল্লা তুলে নতুন মাটির হাঁড়িতে গুনে গুনে রাখছে। হাতার চ্যাপটা মাথায় ছোট ছোট ছিদ্র। দুইটা-তিনটা করে রসগোল্লা তুলে লগে লগেই হাঁড়িতে রাখছে না সেন্টু, হাতার ছিদ্র দিয়া সিরা ঝরে পড়ার জন্য একটু সময় নিচ্ছে। বাইরে দিনের আলো একেবারেই ফুরাবার মুখে। সেন্টুর চা মিষ্টির দোকানে খাটাসের মতন ঘাপটি মেরে ঢুকতে চাচ্ছে শ্রাবণ সন্ধ্যার অন্ধকার।
বসির আচমকা বলল, তয় আপনের কী মনে অয় গাছিদাদা, আপনের মাইয়ার কি বিয়ার বস হয় নাই? চৌদ্দ-পোনরো আর নাইলে ষোলো-সতেরো, বস যেইডাঐ অউক, বিয়ার বস অইছে কি না হেইডা কন।
দবিরের বুকে আবার সেই আগের উত্তেজনা ফিরে এল। তয় মাইয়ার বিয়ার সম-ঐ আনছে ঘটকায়? এইডা আমি আগেঐ বুজছিলাম। সমন্দ না আনলে আতকা এমতে আমার বাইত্তে আইবো ক্যা? নিজের নাওয়ে কইরা বাজারে আইন্না আমারে চা মিষ্টি খাওয়াইবো ক্যা? সিকরেট খাওয়াইবো ক্যা? এত খাতিরের গোমড় কী?
মনের এসব কথা একদম প্রকাশ করল না দবির। হাসিমুখে বলল, হ বিয়ার বস মাইয়ার অইছে। আগিলা দিনে তো আরও কম বসেই মাইয়াগো বিয়াশাদি অইতো। অহন দিন বদলাইছে, মাইয়া ডাঙ্গর কইরা বিয়া দেয় গিরস্তে। নূরজাহান ডাঙ্গর অইছে। অরে বিয়া দেওন যায়।
বুকপকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল বসির। প্রথমে নিজে নিল না, প্যাকেট থেকে একটা সিগ্রেট খানিকটা টেনে বের করে দবিরের দিকে আগায়া দিল। নেন গাছিদাদা, ধরান এক শলা।
দবির সিগ্রেট নিয়া বলল, তুমি ধরাইবা না?
হ, এইত্তো ধরাইতাছি।
দবিরের সিগ্রেট আগে ধরায়া দিয়া নিজেরটা ধরাল বসির। বুকভরতি ধুমা টেনে বলল, আপনে বোজছেন গাছিদাদা কীর লেইগা এত প্যাচাইল আমি পাড়তাছি?
কথার লগে নাকমুখ দিয়া গলগল করে ধুমা বের হল বসিরের।
দবিরও সিগ্রেটে টান দিল। বসিরের কায়দায় নাকমুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, বুজুম না ক্যা? বুজছি। নূরজাহানের লেইগা সমন্দ আনছো।
হ ঠিকঐ বুজছেন। হে হে।
বুকের উত্তেজনা এখন আরও গম্ভীর হয়েছে দবিরের। তবুও সেই আগের তরিকায়ই আছে সে। বসিরকে কিছুতেই বুঝতে দিবে না তার মনের অবস্থা। যেন ব্যাপারটাতে তার কোনও আগ্রহই নাই। মেয়ের বিয়ার সমন্দ আনা না-আনা যেন কোনও ব্যাপারই না এমন নির্বিকার গলায় বলল, কোন গেরামের পোলা?
মুখটা ডিঙ্গিনৌকার মতন করে হাসল বসির। সেই হাসিতে শব্দও হল না, দাঁতও বের হল না। বলল, ধরেন আমগো আশেপাশের গেরামের পোলা।
